মাত্র ছয় জোড়া মাছ নিয়ে কিছুটা শখের বশে এবং কিছুটা বাণিজ্যিক চিন্তা থেকে শুরু করেছিলেন রঙিন মাছ চাষ। ২০০৪ সালে শুরু করা ৬০০ টাকার সেই উদ্যোগ আজ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অ্যাকুরিয়ামের শৌখিন মাছ দেশীয় পদ্ধতিতে পুকুরে চাষাবাদ করে আলোচনার জন্ম দেওয়া সাইফুল্লাহ গাজীকে নিয়ে লিখেছেন সমকালের সাতক্ষীরা ও কলারোয়া প্রতিনিধি কে এম আনিছুর রহমান

একেক মানুষের একেক রকম শখ। শখের বশেই আমরা করি হাজার ধরনের কাজ। কিন্তু কখনও কখনও শখের কাজটিই যদি হয়ে ওঠে কারও জীবিকা নির্বাহের প্রধান কাজ, তবে তা আলাদা হয়েই ধরা দেয়। এমন একজন শৌখিন মানুষের কথাই বলব আজ। তার নাম সাইফুল্লাহ গাজী। সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার ব্রজবাক্স গ্রামের বাসিন্দা সাইফুল্লাহ পেশায় এজন মাছচাষি। তবে তিনি কিন্তু যেনতেন মাছ চাষ করেন না; চাষ করেন শখের বশে ঘরে পোষা অ্যাকুরিয়ামের রঙিন মাছ।

দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেকে এমন মাছের চাষ করলেও সাইফুল্লাহ সবার থেকে আলাদা। কারণ, তিনি পুকুরে স্বাভাবিক মাছের মতোই চাষ করছেন এসব শৌখিন মাছ। মাত্র ৬০০ টাকা পুঁজি নিয়ে শুরু করা রঙিন মাছ চাষের এই ব্যবসা আজ কোটি টাকারও বেশি মূলধনে পৌঁছেছে। ফলে উপার্জনের পাশাপাশি এই কাজ সাইফুল্লাহকে এনে দিয়েছে দেশব্যাপী পরিচিতি। তাকে সবাই চেনেন এখন 'রঙিন মাছের কারিগর' হিসেবে।

সরেজমিনে সাইফুল্লাহ গাজীর মাছ চাষ দেখতে গিয়ে চোখে পড়ল পুকুরে ভাসছে নানা রঙের মাছ। লাল, নীল, কমলা, কালো, বাদামি, হলুদ রঙের মাছের ছড়াছড়ি। গোল্ড ফিশ, কমেট, কই কার্ভ, ওরেন্টা গোল্ড, সিল্ক্কি কই, মলি, গাপটি, অ্যাঞ্জেল প্রভৃতি বর্ণিল মাছ দেখে আসলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। প্রতিদিন সকালে পুকুরের পাড়ে গিয়ে খাবারের পাত্রে বিশেষ এক ধরনের শব্দ করেন সাইফুল্লাহ। তার ভাষায় এটা হলো 'মাছদের খাবারের দাওয়াত'! তার এই শব্দে মুহূর্তে পুকুরের পাড়ে হাজারো রঙিন মাছের ভিড় জমে যায়। প্রায় প্রতি সকালেই নিজ হাতে মাছদের এভাবে খাবার খাওয়াতে ভালোবাসেন তিনি। তার ডাকে সাড়া দিয়ে খলবল শব্দে রঙিন ঢেউ তুলে মাছগুলোর খাবার খেতে ভিড় জমানোর দৃশ্য দেখতে উপস্থিত হয় অনেকেই।

এমন কাজের অনুপ্রেরণার কথা জানতে চাইলাম সাইফুল্লাহ গাজীর কাছে। সদাহাস্য সাইফুল্লাহ বললেন, 'আমাদের সাত ভাইবোনের মধ্যে আমি হলাম বড় ছেলে। সংসারের আর্থিক অনটনের দরুন বেশিদূর লেখাপড়া করা সম্ভব হয়নি। পরিবারকে আর্থিকভাবে সাহায্য করতে হবে, এমন সংকল্প থেকে ১৯৯৭ সালে কিছুটা জেদের বশবর্তী হয়ে কাজের সন্ধানে ভারতে গিয়েছিলাম। সেখানে এক টেক্সটাইল মিলে কাজ করতাম। এলাকাটি গ্রামীণ এলাকা ছিল। সেখানে বেশ কয়েকটি পুকুরে দেখেছিলাম স্থানীয় এক লোক নানা রঙের মাছ চাষ করেন। তার সঙ্গে কথা বলে জেনেছিলাম, তিনি অনেকটা নিজের উদ্ভাবিত পদ্ধতিতেই অ্যাকুরিয়ামের মাছ চাষ করে থাকেন। গ্রামের ছেলে বলেই হয়তো তাকে দেখে এই কাজ করতে ইচ্ছা হলো আমার। প্রায় আড়াই বছর পর ১৯৯৯ সালে দেশে ফিরে আসি। দেশে এসে রঙিন মাছের চাষ করব বলে বাড়িতে আলাপ করি। কিন্তু বাবাসহ পরিবারের কেউই রাজি হয়নি।

ফলে আবারও কাজের সন্ধানে ঢাকায় আসি। ঢাকার মিরপুরে এক গার্মেন্টে কাজ নিই। কিন্তু বেতন ছিল সামান্যই। তখন মিরপুর ১৩ নম্বরে একটি অ্যাকুরিয়ামের দোকান দেখতাম। ভারত থেকে নিয়ে আসা অভিজ্ঞতা আর মিরপুরের দোকানটি দেখে অ্যাকুরিয়াম মাছ চাষের প্রতি আবারও আগ্রহ তৈরি হয়। তবে ইচ্ছা থাকলেও ছিল মূলধনের অভাব। এক মাসের বেতন পেয়ে নিজের খরচ ও বাড়িতে টাকা পাঠিয়ে হাতে ছিল ৬২০ টাকা। সেই টাকায় পরেশ নামের এক বন্ধুর কাছ থেকে কয়েকটি মাছ নিয়ে বাড়িতে রওনা হই। সেটা ছিল ২০০৪ সাল। বাড়িতে অ্যাকুরিয়ামের মাছগুলো এনে মাটিতে রিং স্লাব বসিয়ে পালন করতে থাকি। একসময় মাছগুলো ডিম দেয়। কিন্তু পুরুষ মাছের অভাবে ডিমগুলো থেকে বাচ্চা উৎপন্ন হচ্ছিল না। প্রথমে ১০ রকমের মাছ আনলেও ৯ ধরনের মাছই বাঁচানো যেত না। তবে পাঁচ বছরের অক্লান্ত সাধনায় ৯ ধরনের মাছ প্রস্তুত করতে সক্ষম হয়েছি। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। ৬২০ টাকার মূলধন এখন দেড় কোটি টাকায় পৌঁছেছে। ২০টি পুকুর ও ৮৮টি হাউসে ২৬ প্রজাতির মাছ চাষ হচ্ছে। আর আমার এখানে কাজ করছেন ৫০ জনের মতো মানুষ।'

২০১৪ সাল থেকে পুকুর লিজ নিয়ে রঙিন মাছ চাষ শুরু করেছেন তিনি। বিশেষ পদ্ধতিতে উৎপাদন করা মিল্ক্কি কই কার্প, কিচিং গোরামি, কই কার্প, কমিটিসহ ২৫ থেকে ২৬ প্রজাতির মাছ উৎপাদন করছেন বর্তমানে। এই মাছগুলো রাজধানী ঢাকার কাঁটাবন, খুলনা, রাজশাহী, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে চলে যাচ্ছে প্রতিদিন। প্রতিটি মাছ সর্বনিম্ন ১০ টাকা আর সর্বোচ্চ ১২০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। এই ব্যবসাকে ঘিরে তিনি তার বড় ছেলের নামে 'রেজা অ্যাকুরিয়াম ফিশ' নামে একটি আলাদা প্রতিষ্ঠান শুরু করেছেন।

সাইফুল্লাহর ভাষ্যমতে, এই রঙিন মাছ চাষ এখন কেবল সাতক্ষীরা অঞ্চলেই সীমাবদ্ধ নয়। ফেনী, ময়মনসিংহ ও ফরিদপুরেও বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে। এ ছাড়া অনেকে বিকল্প কর্মসংস্থান হিসেবে বাসার ছাদেও রঙিন মাছের চাষ করে তা বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত করছেন।

বিশেষ পদ্ধতিতে মাছের রং পরিবর্তন করে নতুন এক ধরনের মাছের জাতও তৈরি করেছেন তিনি। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সাইফুল্লাহ বললেন, 'রং বদলিয়ে সিল্ক্কি নামে একটি মাছ তৈরি করছি। অনেকটা জরির মতোই দেখতে। সে জন্যই নাম দিয়েছি সিল্ক্কি। রং পরিবর্তন করা এ মাছের চাহিদাও রয়েছে। তবে প্রযুক্তির অভাবে পরিপূর্ণ চাষ করতে পারছি না। এ জন্য চাই সরকারি সহযোগিতা। তাহলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশেও রপ্তানি করা যেত এই মাছ।'

সাইফুল্লাহর এই কাজে তাকে পূর্ণ সমর্থন এবং সঙ্গ দিয়ে যাচ্ছেন স্ত্রী জেসমিন সুলতানা। কথা হয় তার সঙ্গেও। কথায় কথায় জেসমিন বললেন, '২০০৪ সালে মাত্র ছয় জোড়া পোনা মাছ দিয়ে আমার স্বামী এই মাছের চাষ শুরু করেন। প্রাথমিকভাবে সবাই কিছুটা নিরুৎসাহিত করছিল তাকে। কিন্তু তার কাজে আমার পূর্ণ সমর্থন ছিল এবং প্রথম থেকেই মাছ চাষে তাকে সহযোগিতা করে আসছি। ব্যবসা বাড়াতে তখন আমাদের হাতে টাকা ছিল না। পরে ঢাকা আহ্‌ছানিয়া মিশন থেকে ৫০ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে চাষ সম্প্রসারণ শুরু করি। এখন আমার স্বামী একজন সফল উদ্যোক্তা। তার মতো সারাদেশে রঙিন মাছ চাষের প্রায় দুই হাজার ৬০০ উদ্যোক্তা রয়েছেন বর্তমানে। দুই ছেলেকে নিয়ে সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছায় বেশ সুখে আছি।'

ইচ্ছাশক্তিতে বলিয়ান হয়ে কেউ যদি নিজ স্বপ্ন আর পছন্দের কাজে লেগে থাকতে পারে, তবে সাফল্য অবধারিত। যার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত দেশীয় পদ্ধতিতে অ্যাকুরিয়ামের রঙিন মাছ চাষ করে সাফল্যের দেখা পাওয়া সাইফুল্লাহ গাজী। শৌখিন এই মাছগুলোর দেশীয় চাহিদা মিটিয়ে ভবিষ্যতে স্বপ্ন দেখেন, তার হ্যাচারিতে উৎপাদিত মাছ বিদেশে রপ্তানি করার।

মন্তব্য করুন