মাহমুদ কামাল, পেশায় একজন শিক্ষক। বর্তমানে কিশোরগঞ্জ জেলার কটিয়াদী উপজেলার আচমিতা ইউনিয়নের পাইকশা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কর্মরত। বাবা ছিলেন একজন কৃষক। স্কুলজীবনে বাবার সঙ্গে মাঝেমধ্যে জমিতে কৃষিকাজ করেছেন। কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে আর কৃষিজমিতে যাননি। ২০০৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন। তারপর কিছুদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমেও কাজ করেছেন। কিন্তু শিকড়ের টানে চলে আসেন নিজ বাড়িতে। সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করে পেশা হিসেবে শিক্ষকতাকেই বেছে নেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি পৈতৃক জমি যতটুকু আছে, সেগুলো অন্যের মাধ্যমে চাষাবাদ করতেন।

করোনাভাইরাস সংক্রমণ মহামারি আকার ধারণ করলে গত বছর, অর্থাৎ ২০২০ সালের মার্চ মাসে দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যায়। অলস সময় কীভাবে কাটাবেন- ভাবতে শুরু করেন মাহমুদ। ভাবতে ভাবতে কৃষিকাজে মনোনিবেশ করাটাকেই শ্রেয় বলে মনে করলেন। কিন্তু দীর্ঘ ২২ বছর যে এই কাজের সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না। নেই আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি। তাতে কী? কৃষকের সন্তান, কৃষিকে ভয় পেলে তো আর চলে না। বাবা-চাচাদের পুরোনো পদ্ধতিতেই শুরু করেন চাষাবাদ। হালের কাজ থেকে শুরু করে রোপণ, নিড়ানি, কর্তন, মাড়াই, পাট জাগ, পাট ধোয়া, শুকানো- এভাবে প্রায় সব কাজে মনোনিবেশ করে নিজেকে একজন প্রকৃত কৃষকের আদলে গড়ে তুললেন। এরই মধ্যে ধান-পাটসহ কয়েকটি ফসল ঘরে তুলেছেন। পুকুরে করেছেন মাছ চাষ। জমিতে কৃষিকাজ, পুকুরে মাছ চাষ করতে গিয়ে সমাজের কিছু লোকের সমালোচনার পাত্র যে হননি, তা কিন্তু নয়। এসব কাজ করতে গিয়ে তাচ্ছিল্যের স্বরে নানা কটুকথাও শুনতে হয়েছে তাকে। নিজের কাজ নিজে করলে দোষের কিছু নেই। কারণ, পরিশ্রমই যে সৌভাগ্যের প্রসূতি।

শিক্ষক মাহমুদ কামালের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তিনি গত বোরো মৌসুমে ২৮০ শতক জমিতে ধান চাষ করে প্রায় ১৬০ মণ ধান পেয়েছেন, যার বর্তমান বাজারমূল্য এক লাখ ৭৬ হাজার টাকা। এই কাজে খরচ হয়েছে ৫৬ হাজার টাকা। ৭০ শতক পুকুরে মাছ চাষ করে এক বছরে এক লাখ টাকা আয় করেছেন। ৫০ শতক জমিতে পাট চাষ করে ১৬ মণ পাট পেয়েছেন, যার বর্তমান বাজারমূল্য ৬৪ হাজার টাকা। আর তাতে উৎপাদন খরচ হয়েছে মাত্র ১২ হাজার টাকা।

গত দেড় বছরে নিজে জমিতে চাষ করে কৃষি থেকে লাভ করেছেন দুই লাখ ৭২ হাজার টাকা।

লকডাউনের নিস্তরঙ্গ জীবনে কৃষিকাজে নিজেকে সম্পৃক্ত করে পেয়েছেন জীবনের গতি। জাতীয় উৎপাদনে ভূমিকা রাখতে পেরে এবং আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে নিজেকে কৃষি বিজয়ীর মতোই মনে করছেন। তার এই কৃষিকাজে পাশে থেকে তার স্ত্রী সালমা রহমান সার্বিক সহযোগিতা করেছেন। 'সব সাধকের বড় সাধক আমার দেশের চাষা'- এই সাধকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে তিনি সমাজকে, সমাজের মানুষকে দেখিয়ে দিয়েছেন- নিবিষ্ট চিত্তে কৃষির সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকে যে কোনো যোগ্যতার মানুষ এখান থেকে জীবন চালানোর মতো আর্থিক স্বাচ্ছন্দ্য ফিরিয়ে আনতে পারেন।

তার এই সফলতায় এলাকার শিক্ষিত বেকার যুবসমাজ কৃষিকাজের প্রতি আকৃষ্ট হয়েছেন এবং কৃষিকাজ যে কোনো ছোট কাজ নয়, তা তারা বুঝতে পেরেছেন। কৃষি যদি শিক্ষিত যুবসমাজের হাতে পড়ে, তাহলে কৃষিতে অতিবিপ্লব অবশ্যম্ভাবী।

মন্তব্য করুন