বাঙালি সব সময় ভোজনরসিক। তাই তো যে কোনো উৎসব বা অনুষ্ঠানের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকে পেটপুজো। পেট ঠান্ডা তো সব ঠান্ডা। আর বড় অনুষ্ঠান মানেই কাচ্চি। বাঙালির খাদ্য-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে মোগল এ খাবার। তা পুরান ঢাকায় গেলেই বুঝতে পারবেন। কোনো বাড়িতে নিমন্ত্রণ আর কাচ্চি নেই, তা তো হবেই না। ঢাকায় কাচ্চির খ্যাতি আসে মোগলদের সুবাদে। কাচ্চি কীভাবে আসে, তা নিয়ে রয়েছে অনেক জল্পনা-কল্পনা আর গল্প। ইতিহাসের পাতায় ভারতবর্ষে কাচ্চির আগমনের পেছনে যেসব গল্প রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে মোগলসম্রাজ্ঞী মমতাজ মহলের গল্পটিই সবচেয়ে পরিচিত। শোনা যায়, একবার সম্রাজ্ঞী ব্যারাকে গিয়ে সৈন্যদের শোচনীয় অবস্থা দেখতে পান। তাদের দুর্বল ও ভগ্ন স্বাস্থ্য মমতাজকে চিন্তিত করে তোলে। তিনি সৈন্যদের জন্য নিয়োজিত বাবুর্চিকে ডেকে চাল ও মাংস দিয়ে এমন একটি খাবার প্রস্তুতের নির্দেশ দিলেন, যা তাদের স্বাস্থ্যের উন্নতি ঘটাবে। নির্দেশ অনুসারে একটি বিশাল হাঁড়িতে চাল, মাংস এবং হরেক রকমের মসলা দিয়ে অল্প আঁচে ও দমে কয়েক ঘণ্টা রান্না করে তৈরি হয় একটি বিশেষ খাবার- কাচ্চি বিরিয়ানি। রান্নার পদ্ধতি এবং কাঁচা মাংসের ব্যবহারে উল্লেখ্য ঘটনা দুটি বিরিয়ানি বা পাক্কি বিরিয়ানির চেয়ে কাচ্চি বিরিয়ানির আগমনের গল্পই বলা চলে। পরবর্তী সময়ে মোগল সুবেদারদের সঙ্গে আসা রাঁধুনিদের মাধ্যমে ঢাকা শহরে খুব অল্প সময়ে এই বিরিয়ানির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে।

কালে কালে বয়ে গেছে কত দিন, কত বছর, কত যুগ। আধুনিক এই সময়ে হরেক রকম খাবারের সঙ্গে বাঙালির পরিচয় হলেও তুর্কি-মোগল আমলের কাচ্চি বিরিয়ানি এখনও রাজত্ব করছে সমানে। পুরোনো দিনের সেই মনভোলানো কাচ্চি এখনও যারা বাংলাদেশের মানুষকে খাইয়ে যাচ্ছেন, তাদের একজন হাজি মোহাম্মদ ফজলুর রহমান। তার পরিবার ৮৭ বছর ধরে কাচ্চি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। এখনও যারা 'আসল স্বাদের' কাচ্চি বিরিয়ানি তৈরি করার ধারা বজায় রেখেছেন, তাদের অন্যতম হলেন বাংলাদেশের হাজি ফজলুর রহমান। তিনি তার বাবা ইসমাইল মিয়ার কাছে শিখেছিলেন কীভাবে আসল কাচ্চি বিরিয়ানি বানাতে হয়। ১৯৩৪ সালে ব্যবসা শুরু করেছিলেন ইসমাইল। এখন হাজি ফজলুর রহমান ঢাকার মোহাম্মদপুর এলাকার বছিলায় নিজস্ব ক্যাটারিং ব্যবসা চালান। যার তৈরি বিরিয়ানিতে মজেছেন বাংলাদেশের আমজনতার মতোই প্রধানমন্ত্রী, রাষ্ট্রপতি এবং বিদেশি অভ্যাগতরাও।

কাচ্চি বিরিয়ানি খাইয়ে তৃপ্ত করা ফজলুর রহমান ফজলুল হক পুরস্কার, মহাত্মা গান্ধী পুরস্কারসহ একাধিক সম্মান পেয়েছেন। তার ক্যাটারিং ব্যবসার নাম দিয়েছেন 'মাস্টারশেফ হাজি মহম্মদ ফজলুর রহমান ক্যাটারিং'। ফজলুর রহমানের বাবা ইসমাইল মিয়া মূলত কাচ্চি রান্নার জন্য বিখ্যাত ছিলেন। আট দশকের বেশি সময় আগে তিনি জনপ্রিয় এই খাবার নিয়ে কাজ শুরু করেন। তৎকালীন নবাববাড়ির শেফ থাকা অবস্থায় পরিচিতি পান। পরে হোটেল পূর্বাণীতেও কাজ করেন। ইসমাইল মিয়া মারা যাওয়ার আগে ফজলুর রহমানকেও দক্ষ করে গড়ে তোলেন। এখন ফজলুর রহমান তার দুই ছেলে মোহাম্মদ শফিকুর রহমান ও মোহাম্মদ আশিকুর রহমানকে দিয়েছেন ক্যাটারিং সার্ভিসের দায়িত্ব।

বর্তমানে তারা দু'জনই পুরো ব্যবসার দেখভাল করছেন। শফিকুর রহমান বলেন, আমাদের প্রতিষ্ঠান থেকে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার লোকের খাবার ক্যাটারিং করার অভিজ্ঞতা রয়েছে, যার জন্য রয়েছে প্রশিক্ষিত কর্মী। তারা সব সময় চেষ্টা করে যাচ্ছেন মানসম্মত খাবার তৈরি করতে। করোনাকালে ব্যবসায় একটু খারাপ সময় গেলেও আমরা চেষ্টা করছি আবারও ঘুরে দাঁড়াতে। তাই তো বেশ কিছু নতুন উদ্যোগ হাতে নেওয়া হয়েছে; যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য সর্বনিম্ন ১৬ জনের অর্ডার গ্রহণ। অনলাইনে অর্ডার গ্রহণ এবং নিজস্ব ডেলিভারি সুবিধা। তাদের 'মাস্টারশেফ হাজি ফজলুর রহমান ক্যাটারিং' নামে একটি ফেসবুক পেজ রয়েছে। গ্রাহকরা চাইলে সেখান থেকে তাদের পছন্দমতো যে কোনো খাবার অর্ডার করতে পারেন। া

মন্তব্য করুন