কিছু আলো নীল

কিছু আলো নীল


করোনা ভ্যাকসিন

আমরা করব জয়

প্র চ্ছ দ

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২০      

জাহিদুর রহমান

মহামারি করোনার থাবায় থমকে যাওয়া বিশ্বজুড়ে একটাই প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসছে সবার মনে, কবে এর ভ্যাকসিন আসবে বাজারে? বিশ্বের নামকরা ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানসহ গবেষণা সংস্থাগুলো কাজ করছে ভ্যাকসিন আবিস্কারে। আশার খবর হলো, দেশীয় প্রতিষ্ঠান গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড সম্প্রতি করোনা ভ্যাকসিন তৈরিতে নিজেদের সাফল্যের খবর জানায়। বর্তমানে প্রাণীর দেহে ট্রায়াল চললেও তাদের বিশ্বাস দ্রুতই বাজারে আসবে এই ভ্যাকসিন। করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে এবারের আয়োজন...

'We cannot afford to lose people'- এ কথা বলতে গিয়ে ড. আসিফ মাহমুদ আবেগে কান্না ধরে রাখতে পারেননি। সংবাদ সম্মেলনে দ্রুত মাইক্রোফোন সরিয়ে চোখের পানি আড়াল করার চেষ্টা করেন। গলায় কথা আটকে যাওয়া অবস্থায় আবেগ সংবরণের ব্যর্থতা বলে দিচ্ছিল করোনাভাইরাসে স্বজন হারানো মানুষের কান্নায় মিশে আছে এমনই বুকচাপা কষ্ট!

করোনায় হারানোর বেদনা এত গভীরে দাগ ফেলে যাচ্ছে, যা অনেকেই সামলে নিতে পারছেন না। ড. আসিফরা হয়তো আর কিছুই হারাতে চান না। এ জন্যই করোনার ভ্যাকসিনের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন আপ্রাণ। করোনা মহামারি থেকে দেশের মানুষকে রক্ষা করতে আশাজাগানিয়া খবর দিয়েছে গ্লোব ফার্মাসিউটিক্যালস গ্রুপ অব কোম্পানিজ লিমিটেডের সহযোগী প্রতিষ্ঠান 'গ্লোব বায়োটেক লিমিটেড'। প্রথম বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠান হিসেবে তারা করোনার টিকা (ভ্যাকসিন) আবিস্কারের দাবি করেছে। প্রতিষ্ঠানটি প্রাথমিকভাবে প্রাণীর দেহে এই টিকা প্রয়োগ করে সফলতা পেয়েছে। তবে এখনই মানবদেহে পরীক্ষা চালানো যাচ্ছে না। মানবদেহে প্রয়োগের আগে বিধিবিধান মেনে বড় পরিসরে প্রাণীর দেহে টিকার প্রয়োগ করতে হবে। সে কাজও ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে তারা সেটা করবেন। সেখানে সফল হলে তারা মানবদেহে টিকা প্রয়োগের অনুমতি পাবেন। যদি করোনার প্রতিষেধক তৈরিতে সাফল্য আসে তবে মহামারির ভ্যাকসিন আবিস্কারে আমাদের সাফল্যে যোগ হবে অমূল্য এক পালক।

একজন আসিফ মাহমুদ

গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ করোনার প্রতিষেধক নিয়ে কাজ শুরু করে ৮ মার্চ থেকে। এই বিভাগের অ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার অ্যান্ড ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত আছেন ড. আসিফ মাহমুদ। টিকা আবিস্কার করা গবেষক দলের সদস্যও তিনি। আসিফ মাহমুদের জন্ম গাজীপুর জেলার শ্রীপুর উপজেলার প্রহলাদপুর ইউনিয়নের ফাউগান গ্রামের বাগমার বাড়িতে। দাদাবাড়িতে জন্মের কয়েক বছর পর সরকারি চাকরি করা বাবা আব্দুল বাতেন বদলি হয়ে পরিবার নিয়ে চলে যান চট্টগ্রামে। সেখানে আসিফ মাহমুদের প্রায় সাত বছর কাটে। তারপর নারায়ণগঞ্জ, সেখানে কাটে প্রায় তিন বছর। পরে নারায়ণগঞ্জ থেকে চলে আসেন ঢাকায়। মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হন। সেখান থেকে এসএসসি সম্পন্ন করেন। নটর ডেম কলেজ থেকে এইচএসসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাইক্রোবায়োলজি বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। এরপর বৃত্তি নিয়ে চলে যান জাপানে। সেখানে তিনি আবারও স্নাতকোত্তর করেন অ্যাপ্লাইড বায়োলজিক্যাল সায়েন্সে। মেটাবলিক ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ওপর করেন পিএইচডি। দেশে ফেরার বাধ্যবাধকতা থাকায় পিএইচডি শেষে ২০১৩ সালের এপ্রিলে দেশে ফেরেন তিনি। দেশে ফিরে যোগ দেন বেসরকারি প্রাইম এশিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক হিসেবে প্রায় তিন বছর শিক্ষকতা করেন। শিক্ষকতা করা অবস্থায় গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আরএনডি) বিভাগের সার্কুলার দেখে আগ্রহী হন। ২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জ্যেষ্ঠ বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা হিসেবে সেখানে যোগ দেন। এখন তিনি প্রতিষ্ঠানটির রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগের অ্যাসিসট্যান্ট ম্যানেজার অ্যান্ড ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত।

যেভাবে স্বপ্নযাত্রা

সমকালের সঙ্গে আলাপে ড. আসিফ মাহমুদ তুলে ধরলেন টিকা আবিস্কারের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত নানা বিষয়। শোনালেন আশার কথা, সম্ভাবনার কথা, প্রতিবদ্ধকতার কথাও। স্বপ্নবাজ এই বিজ্ঞানীর সঙ্গে যতক্ষণ কথা হয়েছে, একবারও তার মধ্যে হতাশার ছাপ ছিল না। ড. আসিফ মাহমুদের আশাজাগানিয়া দীপ্ত উচ্চারণ, গবেষক দলের মধ্যে সহযোগিতাই হলো তাদের শক্তির মূল উৎস। দীর্ঘ পরিশ্রম, প্রচুর পরিকল্পনা এবং কাজ সবে শুরু হয়েছে বললেন তিনি। অনেক কিছু করা এখনও বাকি। সবাই খুব পরিশ্রম করছেন। পৃথিবীর অন্যরা যদি পারে আমরাও পারব। তিনি বলেন, আমাদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হারুনুর রশিদ এই প্রকল্পটি বাস্তবায়নে আমাদের সঙ্গেই আছেন। আমরা একটা নতুন প্রকল্প নিয়ে কাজ করছিলাম, কিন্তু এ বছরের মার্চের ৮ তারিখে জানতে পারলাম যে দেশে একজন করোনাভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছেন। তাই আমরা আগের প্রকল্পগুলোর কাজ আপাতত বন্ধ রেখে সব ফোকাস করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ব্যবহার করার সিদ্ধান্ত নিই। কারণ, যেভাবে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে তাতে ভ্যাকসিন না হলে দেশের মানুষের ভ্যাকসিন পেতে অনেক সময় লেগে যাবে। এজন্য কিটের প্রকল্পটির গতি সামান্য কমিয়ে ভ্যাকসিন প্রকল্পে গুরুত্ব বেশি দিলাম। সেই ধারাবাহিকতায় মার্চ মাসের ৮ তারিখে শুরু হওয়া গবেষণাটির একটি প্রাথমিক অ্যানিমেল ট্রায়ালের ডাটা হাতে পাওয়ার পর ২ জুলাই আমরা সংবাদ সম্মেলন করি।

ভ্যাকসিন তৈরির নেতৃত্বে যারা

আমাদের কোম্পানির সিইও (চিফ এক্সিকিউটিভ অফিসার) ড. কাকন নাগ এবং সিওও (চিফ অপারেটিং অফিসার) ড. নাজনীন সুলতানার নেতৃত্বে কাজ চলছে। তারা যেহেতু কানাডার নাগরিক, প্রতিবছর একটা সময় সেখানে যেতে হয়। ৩১ মার্চ ফেরার কথা থাকলেও করোনার কারণে ফ্লাইট বন্ধ হয়ে যায়। সেজন্য তারা এখনও আসতে পারেননি। তারা সেখান থেকেই নেতৃত্ব দিতে থাকেন অনলাইনে। প্রতিদিন সকালে আমাদের করণীয় সম্পর্কে সিইওর কাছ থেকে দিকনির্দেশনা পেতাম। আবার সন্ধ্যায় কাজের অগ্রগতি সম্পর্কে জানাতাম। যেহেতু আমাদের সিইও এইচআইভির ভ্যাকসিন প্রকল্পের সঙ্গে জড়িত ছিলেন, এজন্য আমাদের সব ধরনের দিকনির্দেশনাই আমরা তার কাছ থেকে পাই।

পরবর্তী পদক্ষেপ

প্রাথমিকভাবে করোনার ভ্যাকসিনে সফল হয়েছি। প্রাণী পর্যায়ে এটা সফল হয়েছে। পাঁচটি খরগোশের ওপর এই ভ্যাকসিন পরীক্ষা করা হয়েছে। আশা করি মানবদেহেও সফলভাবে কাজ করবে এই ভ্যাকসিন। অনেকগুলো ধাপ আছে। অনেকটা এগিয়েছি। একসঙ্গে সব মিলিয়ে কাজ করব। আশা করছি মাস ছয়েকের মধ্যে একটা ফলাফল পেয়ে যাবো।

ভ্যাকসিন তৈরিতে প্রতিবন্ধকতা

আমাদের দেশের কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স, রমেটেরিয়ালগুলোর সহজলভ্যতা- এগুলোতে আমাদের প্রধান সময়টা লেগে গেছে। এটা রিসার্চ করার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু এসব বিবেচনায় রেখেই আমরা কাজ করছি। আন্তর্জাতিক রেগুলেটরি গাইডলাইন অনুসরণ করেই আমরা এই ভ্যাকসিন তৈরি করব। আর এতগুলো ধাপ পার করে যে পণ্যটি আসবে তাতে সবার আস্থা থাকবে বলেই আমাদের বিশ্বাস। রেগুলেটরি গাইডলাইন ফলো করে মার্কেটে আসার কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকবে। সেগুলো আমরা যদি সমাধান করতে পারি, তাহলে সময় মতোই দেশের মানুষ ভ্যাকসিন পাবে।

দাম নাগালে থাকবে তো?

এ বিষয়ে গ্লোব বায়োটেক লিমিটেডের কোয়ালিটি অ্যান্ড রেগুলেটরি অপারেশন্সের ম্যানেজার ও ইনচার্জ এবং টিকা আবিস্কারের গবেষক দলের সদস্য মোহাম্মদ মহিউদ্দিন বলেন, গরিব মানুষের কেনার সক্ষমতা থাকবে। সংবাদ সম্মেলনে আমাদের চেয়ারম্যান তো বলেছেন, সব জায়গায় আমরা প্রফিট (লাভ) করব না। সবার নাগালের মধ্যে আমরা টিকার দাম নির্ধারণ করব। যাতে একজন অতিদরিদ্র মানুষও এই টিকা কিনতে পারে।