কিছু আলো নীল

কিছু আলো নীল


দুঃসময়ে মানুষের পাশে

ইমরানের মেইড ইন বাংলাদেশ

আলোক যাত্রী

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২০      

শয়ন দেবনাথ

ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেল প্রতিবন্ধীদের জন্য নানা খাদ্যসামগ্রী তুলে দিচ্ছেন পিপিই পরা এক ব্যক্তি। মুখে মাস্ক, চোখে গগলস পরা মানুষটির উদ্যোগে চলছে এই কার্যক্রম। ব্যক্তিটি যেন চেনা হয়েও অচেনা। নাম ইমরান, পুরো নাম ইমরান হোসাইন। পাশ্চাত্যের সংগীতযন্ত্র ইউকেলেলে বাজিয়ে শিকড় সন্ধানী গান গাওয়া মানুষটিকে চেনেন না, এমন মানুষের সংখ্যা নেহায়েতই অল্প হয়তো। বছর তিনেক আগে 'মধু হই হই' গানে কক্সবাজারে শিশুশিল্পী জাহিদসহ একঝাঁক মেধাবী শিশুশিল্পীকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয় করিয়ে দিয়ে ভাইরাল হওয়া তরুণ লোকসংগীত শিল্পী ইমরান হোসাইনের কথাই বলছি।

করোনাভাইরাসের প্রকোপে যখন অসহায় পুরো জাতি, তখন গানপাগল এই তরুণ হাজির হয়েছেন ভিন্নভাবে। শুধু সংগীতই নয়, করেছেন সমাজসেবাও। করোনার এই দুঃসময়ে শুরু থেকেই কাজ করে আসছে ইমরানের সংগঠন 'মেইড ইন বাংলাদেশ'। কথা হলো ইমরানের সঙ্গে। জানালেন তার বর্তমান কর্মকাণ্ড নিয়ে, 'আমি গান করি ভালোবেসে, অর্থের জন্য নয়। কাজেই এই অর্থ আমি অভাবে দিন কাটানো মানুষগুলোর জন্য ব্যয় করার মধ্য দিয়েই নিজের আনন্দ খুঁজে নিতে চাই।' করোনার এই প্রস্তর কঠিন সময়ে ইমরান ইতোমধ্যেই শতাধিকের বেশি অবহেলিত প্রতিভার পাশে দাঁড়িয়েছেন। দেশের নানা প্রান্তে উপহার সামগ্রী নিয়ে পৌঁছে যাচ্ছেন সশরীরে। করোনাকালীন দিনগুলোয় ভুলে যাননি অভাবে সময় কাটানো দেশের খুদে শিল্পীদের কথা। নিজের সংগঠনের মাধ্যমে দূর পল্লিগ্রামে না খেয়ে কাটানো অসহায় এই শিল্পীদের পাঠিয়ে দিচ্ছেন খাদ্যসামগ্রী। 'মেইড ইন বাংলাদেশ' দলের সদস্যরা এসব উপহার সামগ্রী নিয়ে হাজির হচ্ছেন দেশের বিভিন্ন গ্রামের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা অবহেলিত এসব প্রতিভাবানের কাছে।

আলোচনার ফাঁকেই জানালেন, 'আমার নিজের শখের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো দেশের লাখো মানুষের জীবন। গান নিয়ে যাদের জীবন, সুযোগের অভাবে নিজেদের বিকশিত করতে পারছে না যারা, এই সময়ে তাদের পাশে না দাঁড়ানোটা হবে সত্যিকারের অপরাধ।' তাই তো নিজের প্রিয় বাদ্যযন্ত্র ইউকেলেলে তুলেছেন নিলামে, যার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ পৌঁছে যাবে দুর্দশাগ্রস্ত রিকশাওয়ালা, প্রতিবন্ধী ও প্রান্তিক কৃষকের সহায়তার জন্য।

শুধু সামাজিক কাজে নিজেকে ব্যস্ত রাখেননি ইমরান। মধু হই হই খ্যাত জাহিদ, সায়েম, জিল্লুর, চাঁদ, বারেক, ফারুক, রাশেদ, তশিবা, শাহাদাতসহ হাজারো খুদে প্রতিভা খুঁজে বের করতে ইমরান শুরু করেছেন 'ট্যালেন্ট হান্ট বাই ইমরান মেইড ইন বাংলাদেশ' নামে নতুন এক প্রকল্প। ফেসবুকে 'ও ছেরি ও ছেরি তোরে এককালে ভালোবাসতাম' গেয়ে আলোড়ন তোলা চাঁদ এখন গান করে একটি ব্যান্ডে। নোয়াখালী থেকে ইমরান তুলে এনেছেন রাশেদ নামে এক শিশুকে। নৌকা চালাতে চালাতে গান করত সে। এরকমই আরও খুদে প্রতিভার খোঁজেই তার এই ট্যালেন্ট হান্ট। এই প্রকল্পের গল্পটা বরং এতটুকুই থাক। প্রকল্পের শুরুটা কিছুদিনের হলেও এর পেছনের গল্পটা কিন্তু বিশাল। ইমরানের সঙ্গে আমরা অন্য কোনো দিন হাজির হবো এমন হাজারো প্রতিভার গল্প শুনতে।

ইমরানের স্বপ্ন, নদীর পাড়ে একদিন একটি আনন্দ গ্রাম প্রতিষ্ঠা করবেন। সেখানে থাকবে ১০০ হতদরিদ্র পরিবার। বিশ্বাস করেন, সমাজের সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা বন্ধুদের সহযোগিতা পেলেই এ স্বপ্ন পূরণ হয়ে যাবে একদিন। আনন্দ আসবেই- এ নীতিতেই চলছে সংগীতের পাশাপাশি সামাজিক ও মানবিক মেলবন্ধনে ইমরানের অন্যরকম এক পথচলা।