কিছু আলো নীল

কিছু আলো নীল


প্রাণ-প্রকৃতি

উপকারী গণিয়ারী

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২০      

চয়ন বিকাশ ভদ্র

উপকারী গণিয়ারী

গণিয়ারী, ছবি :: লেখক

গণিয়ারী সবুজ পাতাময় বৃক্ষ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Premna integrifolia, এটি Lamiaceae পরিবারের উদ্ভিদ। বাংলায় এর অন্য নাম হচ্ছে ভূতভৈরবী, আনগান্ত। সংস্কৃতে একে বলে গণিকারিকা, অগ্নিমন্থ। প্রাচীনকালে ঋষিরা তপোবনে গণিয়ারী গাছের ডালের সঙ্গে আরেক ডালের ঘর্ষণে আগুন তৈরি করতেন বলে এই উদ্ভিদের নাম 'অগ্নিমন্থ' হয়েছে। এই উদ্ভিদটি ইংরেজিতে Headache Tree, Spinous Fire-brand Teak, Bastard Guelder, Coastal Premna, Creek Premna ইত্যাদি নামে পরিচিত। ভারত, বাংলাদেশসহ উষ্ণ নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে Premna'র ৪০টি প্রজাতি দেখা যায়। অস্ট্রেলিয়া, আফ্রিকা, এশিয়াজুড়ে রয়েছে এই গাছের বিস্তৃতি।

গণিয়ারী গাছের বাকল বেশ পাতলা এবং ঈষৎ পীতবর্ণ। তবে কাঠের রং হয়ে থাকে ফিকে ধূসর। এই গাছের পাতা ৩-৪ ইঞ্চি লম্বা হয়। কিন্তু প্রস্থের দিক থেকে বেশ প্রসারিত হয়। উভয় মিলে পাতা ডিম্বাকৃতি রূপ লাভ করে। তবে এই পাতার শেষভাগের বর্ধিত অংশ একটু সুচালো হয়ে থাকে। এই গাছ ৭ মিটার পর্যন্ত হয়। এর পাতা সহজ, বিপরীত প্রান্তিক; পেঁচালো ৪-১৪ মি.মি. ও সরু হয়ে থাকে। এদের ফুল উভয় লিঙ্গ হয়। ফুলের রং সবুজাভ সাদা বর্ণের। পাতায় বিশেষ ধরনের গন্ধ আছে। মূলের ছালে বেশ মিষ্টি গন্ধ থাকলেও এর স্বাদ তিক্ত।

গণিয়ারীর পুষ্পদণ্ডে গুচ্ছাকারে ফুল জন্মে। ফুলগুলো আকারে ছোট ও লোমযুক্ত। ফুলের রং ফিকে পীতাভ সবুজ। জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসে সাধারণত ফুল হয়ে থাকে। শ্রাবণ মাসের দিকে ফল ধরে এবং ভাদ্র মাসে ফল পাকে। এর পাতা বিভিন্ন রান্নায় সুগন্ধ আনে। গণিয়ারী গাছের পাতায় এক ধরনের সুঘ্রাণ থাকে, যে কারণে এটি কখনও কখনও ডালের সঙ্গে যোগ করা হয়। মাছ পচে গেলেও এর পাতা দিয়ে রান্না করলে মাছের দুর্গন্ধ দূর হয়ে যায়।

শিকড় বাঁটা পাকস্থলীর ক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়, সাধারণ জ্বর নিবারণ করে এবং আমবাত নিরাময়ে সাহায্য করে। এর পাতার রস কৃমিনাশক এবং পেটফাঁপা নিবারক। গোলমরিচের সঙ্গে এর পাতা বেঁটে খেলে সর্দি-জ্বর নিরাময় হয়। কোলেস্টেরল বেড়ে গেলে এই গাছের ছালের গুঁড়া দেড় গ্রাম মাত্রায় গরম পানিসহ খেলে রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা কমে যায়। গণিয়ারী কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে। শরীরের কোমল স্থানে আঘাতে ফুলে গেলে গণিয়ারী পাতা বেঁটে লাগালে সেরে যায়। কিডনির দোষে প্রস্রাবের স্বল্পতায় ও হাত-পা ফোলায় ৩-৪ চামচ পাতার রস অল্প গরম করে খেলে কয়েক দিনের মধ্যেই কিডনির সমস্যা কেটে যায় এবং প্রস্রাব স্বাভাবিক হয়ে হাত-পায়ের ফোলাও কমে যায়।

সন্তান জন্মের পর যাবতীয় জটিলতা নিরসনে প্রসূতিদের কাছে এটি একটি সমাদৃত টনিক। এতে জরায়ু, ব্লাডার, পিঠব্যথা, স্তন স্টম্ফীতি, দুগ্ধস্বল্পতা, রক্তস্বল্পতা, প্রদরসহ আরও অনেক শারীরিক অসুবিধা দূর হয়।