কালের খেয়া

কালের খেয়া

শ্রদ্ধাঞ্জলি

হুমায়ূন আহমেদের সুখ-দুঃখের স্রোতে

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২০     আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২০

বদরুন নাহার

হুমায়ূন আহমেদের সুখ-দুঃখের স্রোতে

হুমায়ূন আহমেদ [১৩ নভেম্বর, ১৯৪৮-১৯ জুলাই, ২০১২]

১৯ জুলাই নন্দিত কথাশিল্পী হুমায়ূন আহমেদের সপ্তম মৃত্যুবার্ষিকী। তার অন্যতম উপন্যাস 'সবাই গেছে বনে'র বিশ্নেষণ...

হুমায়ূন আহমেদের 'সবাই গেছে বনে' উপন্যাসটি হাতে নিয়ে পাঠের আগে হুমায়ূন আহমেদের পাঠকরা ভাবতে পারেন, হয়তো হিমুর মতো কেউ-বা ধানমন্ডি থানার ওসি জ্যোৎস্না রাতে বনে গেছে কিংবা হিমুর হাত ধরে রুপার বনে ঘুরে বেড়ানোর স্বপ্ন বইজুড়ে কীভাবে বারবার ভেস্তে যায়। কিন্তু এ উপন্যাসের নাম দেখে যারা আগেই ভেবে নিতে চাইবেন, তারা বড় রকমের একটা ধাক্কা খাবেন- তা নিশ্চিত। আবার উপন্যাসে পড়তে পড়তে কোথায়ও বনে যাওয়ার সেই রবীন্দ্রসংগীতের মতো মায়াময়, স্নিগ্ধ আর বিষণ্ণ আলোর চারপাশে গোল হয়ে বসে বসে জ্যোৎস্না উদযাপনের আখ্যান খুঁজে পাবেন না। বরং ক্রমাগত আনিস, সফিক, রাহেলা আর রুনকির জীবনের প্রতিটি দিনের সুখ-দুঃখের স্রোতে ভারাক্রান্ত হয়ে এক সময় পাঠক নিজেই বনে যাওয়ার জন্য হন্যে হয়ে থাকবেন। তখন একেবারে শেষ প্যারাতে গিয়ে পড়বেন-

'একদিন এই দুঃসহ শীত শেষ হবে। আসবে রোদ-উজ্জ্বল সামার। ছুটি কাটানোর জন্য আমেরিকানরা গাড়ি নিয়ে নেমে আসবে হাইওয়েতে। মন্টানা, সল্ট লেক, ইয়েলো স্টোন পার্ক। কতকিছু আছে দেখবার। সামারের রাতগুলো এরা বনের ধারে তাঁবু খাটিয়ে কাটাবেন। প্রচণ্ড জ্যোৎস্না হবে রাতে। যুবক-যুবতীদের বড্ড বনে যেতে ইচ্ছা করবে।'

পাঠ শেষে আপনি কী বুঝবেন, তা আপনার বিষয়। কিন্তু আমার মনে হয়েছে, হুমায়ূন আহমেদ এতক্ষণ আমাদের বনের মধ্য দিয়েই ঘোরালেন। বনের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে আমরা আনিসের চোখে, সফিকের কাজে, রাহেলার পরিবর্তিত জীবনে প্রচ জ্যোৎস্না খুঁজে বেড়িয়েছি। কিন্তু আমেরিকার ফার্গো টাউনে এলেই যেন জ্যোৎস্নার বড় অভাব। 'সবাই গেছে বনে' উপন্যাসের গভীরতা অন্য জায়গায়। স্বদেশ ছেড়ে থাকা বিষয়টি মানুষের জীবনে কত প্রকার শূন্যতা এনে দিতে পারে! দেশের ছায়া খুঁজে ফেরে কেউ কেউ সুদূর আমেরিকায়। লেখকের কলমে সে কথা কত সহজে উঠে আসে- 'নিউইয়র্ক বা শিকাগো থেকে যেসব বাঙালি এখানে আসে তারা চোখ কপালে তুলে বলে, আরে এ তো আমাদের কুমিল্লা শহর। ভিড় নেই হইচই নেই। বাহ্‌ চমৎকার তো!'

আখ্যান নির্মাণে হুমায়ূন আহমেদ কেমন যেন মায়ার খেলায় মেতে ওঠেন! তার উপন্যাসের চরিত্রদের স্বভাব-বৈশিষ্ট্যকে ধরে রেখে সে আবেগ-অনুভূতি প্রকাশে কোনো পার্থক্য থাকে না। যে আবেগ তিনি সুখী নীলগঞ্জে দেখান, সেই একই শ্রেণির মানুষের প্রকাশভঙ্গি সুদূর আমেরিকার মতো প্রবাসেও তেমনই থাকে। পাঠক সহজেই খুঁজে পান- এটা হুমায়ূন আহমেদের চরিত্র। এই যে পাঠকের মনে এভাবে ছায়া ফেলার বিষয়টি; এটিই একজন লেখকের সার্থকতা। একজন লেখক নিজস্ব শৈলী নির্মাণ করতে পারলে তবেই পাঠানুভূতিতে এই বোধ হওয়া সম্ভব।

আশির দশকে লেখা এ উপন্যাসে বাঙালির প্রবাস জীবনের নিঃসঙ্গতা, জীবনযুদ্ধ আর স্নেহ-মমতার সংমিশ্রণ ঘটিয়েছেন ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ। সে সময় প্রবাসীদের নিয়ে আমাদের সাহিত্যে খুব বেশি লেখা হয়ে ওঠেনি। সে ক্ষেত্রে এ উপন্যাসের যেমন গুরুত্ব রয়েছে, তেমনি আমাদের শিক্ষিত নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির অর্থনৈতিক মুক্তির সঙ্গে মানসিক অবস্থানের এক দ্বৈত মনোভঙ্গির দ্বন্দ্ব স্পষ্ট উপন্যাসটিতে। হুমায়ূন আহমেদ সাধারণত যে সংলাপনির্ভর আঙ্গিকে উপন্যাস লেখেন, সেই ভঙ্গিতেই এ উপন্যাস লেখা। খুব বেশি মনোজাগতিক বিশ্নেষণ না করে, দার্শনিক ব্যাখ্যা প্রদান ছাড়াই মানুষের কথোপকথনের মাধ্যমে যে অবস্থানটি তুলে এনেছেন, তার সমাজতাত্ত্বিক গুরুত্ব কোনো অংশে কম নয়। তত্ত্বীয় ভঙ্গিমায় না গিয়ে মানুষের সাধারণ কথাবার্তার ভেতর দিয়েই তিনি জীবনদর্শনের বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন। একে আমরা জীবনঘনিষ্ঠ আখ্যান বলতে পারি। সাধারণত জীবনঘনিষ্ঠ এবং সাব-অলটার্ন সাহিত্যতত্ত্ব হিসেবে আমরা নিম্নবর্গীয় মানুষের আলেখ্যকে ব্যাখ্যা করি। কিন্তু শহুরে মধ্যবিত্তের এ অবস্থানকে কেন বাংলাদেশিদের কণ্ঠস্বর হিসেবে মেনে নেব না? এ দেশের মানুষের মধ্যে এই শ্রেণির মানুষের সংখ্যাকে অস্বীকার করার কোনো জায়গা নেই। রাহেলা এবং আমিন সাহেবের জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনো কাল্পনিক বিষয় নয়। যে আমিন সাহেব প্রথম জীবনে পিএইচডি করে ইমিগ্রেশনের জন্য অপেক্ষা করে, দেশে আসতে পারে না, এমনকি নতুন গাড়ি কেনার বিষয়টি, প্রথম সন্তান জন্মের কারণে তার বহুদিন দেশে ফেরা হয় না। যার স্ত্রী রাহেলাও একটি চাকরি পেল, যা অতি সামান্য। রিসার্চ ল্যাবে সূর্যমুখী ফুলের চারা বাছার কাজ। এভাবে তারা আমেরিকার মতো তথাকথিত উন্নত বিশ্বের পুঁজি ও নগরায়ণে অভ্যস্ত হয়ে গেল। তখন দেশে ফিরে তাদের ভালো না লাগারই কথা। রাতের বাংলাদেশ অন্ধকার, ঘরবাড়ি ঝকঝকে নয়- এসব বিষয়ই মুখ্য নয়। সেই সঙ্গে আমেরিকার অভ্যন্তরীণ জনসাধারণের সামাজিক নিরাপত্তা পাওয়ার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ এবং গতানুগতিকভাবে মানুষ নিজের দেশ ছেড়ে অন্য দেশের দ্বিতীয় বা তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক হয়ে বসবাস করতে থাকে। তার পেছনে তো দু'দেশের অর্থনৈতিক অবস্থানটাও ভূমিকা রাখে। অথচ কোথায় যেন অপূর্ণতা থেকে যায়! আর তা যে তাদের মানসিক সংস্কৃতির বিষয়- ঔপন্যাসিকের একটা বার্তাও বটে। কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ পাঠককে কোনো জ্ঞানদানের গিনিপিগ ভাবেন না। তাই তার এ বার্তা কোনো অমোঘ বাণী হয়ে ফুটে ওঠেনি। তা পরিস্ম্ফুটিত হয় মানুষের জীবনের হাসি-কান্না, হেঁয়ালিপনার ভেতর থেকেই। সে বিষয়টা পাঠককে অনুভব করে নিতে হয়। অনেক সময় মানুষের অনুভূতিই মানুষকে প্রকৃত জ্ঞানের সন্ধান দিতে পারে। খটোমটো বা গবেষণা গ্রন্থের অনেক বিষয় মানুষ প্রয়োজনে অনুসন্ধান করে জানে এবং জেনেও ভুলে যায়। অথচ সফিকের মতো একটি ছেলের পাগলামি চাইলেও ভুলতে পারে না। কারণ জীবনে বহু বিষয়ে পরাজিত সফিকের চরিত্রের মধ্যে একটা সরলতা, দেশপ্রেম এবং মানুষকে সুখী করার প্রবণতাগুলো ঔপন্যাসিক এমন সুন্দর আন্তরিকতায় গড়ে তুলেছেন যে, তা পাঠকের মনে গেঁথে যাবে- আহা বেচারা! এই দুঃখবোধ মানুষের মধ্যে প্রাকৃতিকভাবেই দীর্ঘস্থায়ী হয়। অক্ষরের তত্ত্বের চেয়ে মানুষের ভাষা মানুষকে অনেক সময়ই বেশি আকৃষ্ট করে। এসব দীর্ঘশ্বাসময় সহানুভূতি বাঙালির মন-মানসে দীর্ঘদিন ধরে চাষবাস হয়ে এসেছে। এগুলোই এ দেশের মানুষের নিজস্ব সম্পদ। অন্যদিকে রুনকি চরিত্রটিতে তিনি এমন এক সংমিশ্রণ ঘটান, যেখানে আমেরিকায় জন্ম নেওয়া মেয়ের বৈশিষ্ট্য আর বাঙালি বাবা-মার কাছে বেড়ে ওঠা বিষয়টির এক দ্বি-রূপের প্রকাশ ঘটে। রুনকি বাবা-মাকে ছেড়ে টমের সঙ্গে লিভ টুগেদার করছে, কনসিভ পর্যন্ত করে ফেলছে। আমেরিকায় জন্ম নেওয়া এবং বেড়ে ওঠা যে কোনো মেয়ের জন্য এটা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু লেখক রুনকির ভেতর দুটো সংস্কৃতির মিশ্রণ ঘটিয়েছেন। সফিক এলে সে বাংলাদেশি রান্না রাঁধতে চেষ্টা করে এবং উপন্যাসে আমরা যখন দেখতে পাই যে রুনকি সফিককে বলছে, 'রান্না কেমন হয়েছে সফিক ভাই? মা'র মতো হয়েছে?' এ কথা একটা কোনো আমেরিকান মেয়ের নয়। এটা বাংলাদেশি মেয়ের তৃপ্তি পাওয়ার বিষয়। অন্যদিকে রুনকির প্রেমিক টম প্রসঙ্গে যখন আমরা উপন্যাসে পড়ি- 'টমের বাড়ি পছন্দ হয়ে গেল। রাজপ্রাসাদের মতো বাড়ি, পছন্দ না হয়ে উপায় আছে?' এই ভাষাকে আমরা হুমায়ূন আহমেদীয় ভাষা বলতে পারি। আমাদের দেশের খুব কম লেখকের ক্ষেত্রে এভাবে ঘোষণা করা যায় যে, এটা তার ভাষা। এটা একজন লেখকের সাফল্য। অনেক আলোচকের মতে, হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসে প্রধান দুর্বলতা কেন্দ্রীয় চরিত্রের অভাব এবং চরিত্রপাতের বিকাশহীনতা। 'সবাই গেছে বনে' উপন্যাসের ক্ষেত্রে কেউ যদি কেন্দ্রীয় চরিত্র অনুসন্ধান করেন তবে ব্যক্তি-চরিত্রের মধ্যে তেমন কোনো চরিত্র খুঁজে পাবেন না। আমার মনে হয়েছে, এ উপন্যাসের প্রধান চরিত্র বাঙালি মন, যা খুঁজে পাবেন সফিকের ভেতর; আনিস, সবার ভেতর যে আত্মিক যোগাযোগ, এই উপন্যাসের ভেতর দিয়ে যে জীবনের হাঁসফাঁস যন্ত্রণা, তা সবই এই বাঙালি মন। এখানে এই মনই কেন্দ্রীয় চরিত্রের ভূমিকায় আছে। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের 'চিলেকোঠার সেপাই' উপন্যাসে প্রধান চরিত্র হিসেবে যেমন আমরা দেখতে পাই সময়কে। অন্যদিকে মালিশা নামে যে চরিত্রটি আমরা দেখতে পেলাম, তাকে হুমায়ূন আহমেদ বাঙালি বানাননি। সে আমেরিকান ছিল এবং তার চরিত্র বিশ্নেষণ করলে আমরা তাকে আমেরিকানই পাব। অবাস্তব চরিত্রের নির্মাণ তিনি করেননি। মালিশার মা ধনী। সে নিজের মেয়েকে নিজের নিরাপত্তার খাতিরে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে। মালিশা অপেক্ষায় আছে- কবে মা মারা যাবে, সে অনেক টাকার মালিক হবে। এ রকম মেয়েকে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার সংস্কৃতি আমাদের দেশে এখনও গড়ে ওঠেনি। অন্যদিকে মালিশা টাকা পেলে খরচ করবে কী করে প্রসঙ্গে মালিশার বক্তব্য উল্লেখ্য, 'প্রথমে প্লাস্টিক সার্জারি করাব। আমার বুক দুটি বড়ই ছোট। সিলিকন ব্যাগ দিয়ে বড় করব। আমাকে দেখে অবশ্য বোঝা যায় না, আমার বুক এত ছোট। আমি অন্য ধরনের ব্রা ব্যবহার করি। ফোম ব্রা।'

এই যে মালিশা এভাবে বলছে, এটা একজন আমেরিকান মেয়ের ভাষ্যই হতে পারে, বাঙালি মেয়ের নয় এবং আমরা উপন্যাসে দেখতে পাই মালিশা মিলিয়নেয়ার হয়ে শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যা করে। সেই সমাজে মানুষ এমনই মানসিক অবস্থানে বাস করছে। উপন্যাসে নানা জায়গায় যে বিষয়টি এসেছে তা হলো, তখনও আমেরিকায় বাংলাদেশ আলাদা দেশ হিসেবে মানুষ খুব একটা চেনে না। বাংলাদেশ বলতে তারা প্রথমত ইন্ডিয়াকে বোঝে। আমেরিকান অনেকেই বাংলাদেশ বলতে শুধু নেগেটিভ কিছু প্রসঙ্গ আনলে আনিস, সফিক যেমন বেশ অস্বস্তিতে পড়ে। সফিক তার পাগলামি বৈশিষ্ট্যে তা ভুল প্রমাণের চেষ্টা করে। আনিস ধীর-স্থিরভাবে যুক্তি বা প্রাসঙ্গিক তুলনামূলক বিশ্নেষণের মাধ্যমে বিষয়টি মোকাবেলা করতে চায়। তারা বিদেশিদের এ কথার কিছুটা রাগের প্রকাশও ঘটায়। উপন্যাস থেকে বিষয়টি উল্লেখ্য, 'আগে সত্যি কি-না। ডাস্টবিনের পাশে ছোট ছেলেমেয়েরা বসে থাকে কখন কেউ এসে খাবার ফেলবে সেই আশায়। বলো সত্যি নয়? নাকি তোমার স্বীকার করতে লজ্জা লাগছে?

আনিস ইতস্তত করে বলল, সত্যি নয়। বড় বড় অভাব হয়েছে। সে তো পৃথিবীর সব দেশেই হয়েছে। ইউরোপে হয়নি? আমেরিকাতেও তো ডিপ্রেশন হয়েছে।

তৃতীয় বিশ্বের ছোট একটি দেশের অধিবাসীদের নানা রকম প্রবাস যন্ত্রণায় পড়তে হয়। তা সে দেশে বসেও, যে দেশে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি দেশের অভিবাসীর সমাবেশ ঘটেছে, সেই আমেরিকাতে। আসলে আনিস, সফিক, রাহেলা, আমিন সাহেব এবং নিশানাথ বাবু- সবাই যেন নিজ নিজ মাতৃক্রোড় ছেড়ে বনে গেছে, যেখানে তাদের স্বস্তি নেই। আবার জ্যোৎস্নার সন্ধানে বনে না গিয়ে তাদের উপায়ও নেই। উপন্যাসে নিশানাথ বাবুর রুনকি কী ভুল করছে প্রসঙ্গে যে উত্তর দিয়েছিলেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 'নিশানাথ বাবু গাঢ়স্বরে বললেন, খিদিরপুরের এক কলেজে অঙ্ক পড়াতাম, বুঝলি রুনকি। কী নিদারুণ অভাব গেছে আমার। আর এখন পাস বই দেখলে তুই চমকে উঠবি। আমি যদি খিদিরপুরে পড়ে থাকতাম সেটা ভুল হতো। আবার আমেরিকা আসাটাও ভুল হয়েছে। তাহলে ঠিক কোনটা?

রুনকি চুপ করে থাকে।'

এই প্রশ্নের জবাব মানুষ সহসা দিতে পারে না। বিশ্বের সব মানুষ পুঁজিবাদের শিকলে প্রতিনিয়ত বন্দি হয়।

উপন্যাসের গভীরে এ বিষয়টি লুকিয়ে আছে। হাসি-ঠাট্টা, সুখ-দুঃখ আর পাগলামির ভেতর দিয়ে ঔপন্যাসিক হুমায়ূন আহমেদ কি আমাদের সে সত্যের মুখোমুখি করেন না, যে প্রশ্নের সমাধান এখনও পৃথিবীতে হয়নি? তিনি কোনো বৈপ্লবিক চরিত্রকে তৈরি করেননি। বিপ্লব ঘটানোর আহ্বান এ উপন্যাসে করা হয়নি, কিন্তু প্রতিটি মানুষের ব্যক্তিগত আক্ষেপগুলোকে নিয়ে আসা হয়েছে। সামষ্টিক মানুষ তাদের জীবন থেকে যখন এই সত্যগুলো উপলব্ধি করবে তখনই প্রকৃত বিপ্লব সম্ভব। রুনকির বন্ধু টমের আক্ষেপ যে, লাল রংটার ব্যবহারই এখন পর্যন্ত শেখা হলো না! এই যে বিষয়টি নিয়ে কত কত সাহিত্য সৃষ্টি হয়েছে, কত ব্যাখ্যা তৈরি হতে পারে, কিন্তু হুমায়ূন আহমেদ তার নিজস্ব ভঙ্গিতে বিপ্লবের কথা এনেছেন। পাঠককে তা বুঝে নিতে হবে। এ প্রসঙ্গে একটি সাক্ষাৎকারে হুমায়ূন আহমেদ বলেছেন- 'কেউ তো কারও মতো হতে পারে না। একজন হুমায়ূন আহমেদ, হুমায়ূন আহমেদই থাকেন। একজন হুমায়ূন আহমেদ কখনও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় হবেন না।'

নিজের সম্পর্কে হুমায়ূন আহমেদের এ বক্তব্য খুবই সত্যি। মেধাবী মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলেমেয়েরা উচ্চশিক্ষার আশায় আমেরিকার মতো দেশে পাড়ি জমায় এবং সে দেশের আর্থ-সামাজিক জীবনে আকৃষ্ট হয়ে এক দোটানা জীবনে প্রবেশ করে। তিনি এ সত্যকে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন তার সাহিত্যের মধ্য দিয়ে। বিষয়টি আমরা খুঁজে দেখলেই মিলিয়ে নিতে পারব। নদী যখন মৃত, জীবন যখন অন্য স্রোতের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছে, তখন সেই সময়ের সাহিত্যে আমরা পদ্মা নদীর মাঝির কথা খুঁজে পেতে পারি না। তখন আমরা শঙ্খনীল কারাগার, নন্দিত নরকে, আশাবরী, দেবী, সবাই গেছে বনে'র মতো জীবনকেই খুঁজে পাব- সময়কে সাহিত্যের আকার দিয়ে হুমায়ূন আহমেদ সে কথা প্রমাণ করে গেছেন। লেখক হিসেবে তিনি যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, তা তার কলমেরই স্বীকৃতি।