কালের খেয়া

কালের খেয়া

তুমুল গাঢ সমাচার

মহামারী, সাহিত্য ও করোনার কাল

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০২০     আপডেট: ১৭ জুলাই ২০২০

বিনায়ক সেন

পর্ব ::৫৪

পূর্বে প্রকাশিতের পর

৭. মহামারী ও আধুনিক সাহিত্যের ধারা :এলিয়ট ও ইয়েটস্‌

১৯২২ সাল। আধুনিক ইংরেজি সাহিত্যের জন্মবছর এটি। একই বছরে প্রকাশিত হয় টি. এস. এলিয়টের 'দ্য ওয়েস্ট ল্যান্ড', জেমস জয়েসের 'ইউলিসিস্‌' উপন্যাস, আর ভার্জিনিয়া উলফ্‌-এর 'মিসেস ডেলাওয়ে'। এর তিন বছর আগে ইয়েটস্‌ লিখেছিলেন তার বিখ্যাত কবিতা 'দ্য সেকেন্ড কামিং'। এই সবগুলোর পেছনে কাজ করেছে একটাই 'ইউনিফাইং থিম' বা প্ররোচনা- মহামারীর অশুভ ছায়া। ২০১৮ সালের ঠিক একশ' বছর আগে বিশ্বজুড়ে যে মহামারী সংঘটিত হয়েছিল, তার নাম ছিল স্প্যানিশ ফ্লু। তা নিয়ে ২০১৮ সালে কোনো কোনো সংবাদপত্রে ছোট্ট নিবন্ধ বেরিয়েছে, কিন্তু বড় আকারে কোনো আলোচনা চোখে পড়েনি। অথচ এই স্প্যানিশ ফ্লুতে মারা গিয়েছিল সে সময় বিশ্বের ৫ থেকে ১০ কোটি মানুষ; আক্রান্ত হয়েছিল পৃথিবীর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষ। বস্তুত ১৩৪৬-৪৮ সালের 'ব্ল্যাক ডেথ'-এর পরে স্প্যানিশ ফ্লুর মতো ধ্বংসাত্মক তাণ্ডবলীলা নিয়ে আর কোনো মহামারী আত্মপ্রকাশ করেনি। এই ফ্লুতে যত লোকের প্রাণহানি হয়েছে, সমগ্র প্রথম ও দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ মিলিয়েও এত লোকের মৃত্যু ঘটেনি। তাহলে এই মহামারী নিয়ে এত নিস্তব্ধতা কেন? একটা কারণ হতে পারে- আর সেটা ওয়াল্টার বেঞ্জামিন বলেছিলেন, যার সহজীকৃত মর্মার্থ হলো-‘Silences about public horrors can permit human societies to cope with collective recovery and to progress’|  জীবনানন্দও বলেছিলেন বুঝি এই মর্মে- 'কে হায় হৃদয় খুঁড়ে বেদনা জাগাতে ভালবাসে!' হয়তো-বা তা-ই। কিন্তু সমসাময়িক এলিয়ট, উলফ্‌ বা ইয়েটসের পক্ষে এই অদৃষ্টপূর্ব মহামারীকে ভুলে যাওয়া কঠিন ছিল।

এলিয়ট আর তার স্ত্রী ভিভিয়ান এলিয়ট দুজনেই ১৯১৮ সালের ডিসেম্বর মাসে স্প্যানিশ ফ্লুতে আক্রান্ত হয়েছিলেন। যখন এই রোগ থেকে আরোগ্য লাভ করছিলেন তারা, তখনই তিনি 'ওয়েস্ট ল্যান্ড' শেষ করার কাজে হাত দেন। মহামারী যে প্রবলভাবে আক্রান্ত করেছিল দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সাহিত্য ও শিল্পের ধারাকে সেটা শুধু সম্প্রতি সাহিত্য-সমালোচনায় দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছে। যেন দান্তের ইনফার্নোর মতো মড়ক লেগেছে লন্ডন শহরে, সেভাবেই কবি এলিয়টের চোখের সামনে মৃত্যুর মিছিল ভেসে উঠছে :

‘Unreal City,
Under the brown fog of a winter dawn,
A crowd flowed over London Bridge, so many,
I had not thought death had undone- so many.
Sighs, short and infrequent, were exhaled,
And each man fixed his eyes before his feet.
Flowed up the hill and down King William Street.’

সবাই জানেন যে, এলিয়ট ওয়েস্ট ল্যান্ড কাব্যগ্রন্থে ধাঁধার মতো করে বলেছিলেন :

‘April is the cruelest month, breeding
Lilacs out of the dead land, mixing
Memory and desire, stirring
Dull roots with spring rain.’

এপ্রিল কেন 'সবচেয়ে নিষ্ঠুর' মাস হতে যাবে? যে-জমি উর্বরা সেখানে এপ্রিল মাসে বসন্ত সমাগত হয়, পশ্চিমের দেশগুলোয় বরফ গলতে শুরু করে, আর বরফের নিচ থেকে মাথা তুলতে শুরু করে হরিৎ তৃণ-গুল্ম, নানা বর্ণের ফুল, আসে নতুন ফসলের মৌসুম। কিন্তু বন্ধ্যাজমিতে (ওয়েস্ট ল্যান্ড তো অপুষ্পক জমি) এপ্রিল মাস মিছেমিছি বসন্তের আশা জোগায়- সেখানে নতুন করে কিছুই জেগে ওঠে না- না-পুষ্প না-পত্রালি না-মৌমাছির গুঞ্জন না-প্রজাপতির আলোড়ন। সেদিক থেকে এপ্রিল যেন আমাদের অপূর্ণতাকে না-পূরণ হওয়া সম্ভাবনাগুলোকে নিয়ে কর্কশ ঠাট্টা করছে। এ রকম পরিস্থিতিতে কোনো কিছু আশা করাই অন্যায় বা আশা করলে তা হবে ভুল কিছুর জন্য আশা করা। বহু পরে তিনি এ কারণেই কি বলবেন 'ফোর কোয়াট্রেটস' কাব্যগ্রন্থে -  ‘Hope would be hope for the wrong thing’?  তার পরও একসময় মহামারী শেষ হয়, মৃত্যুর স্রোতের ভেতর থেকে জীবনের হাত জাগতে দেখা যায়, ওয়েস্ট ল্যান্ড কবিতার শেষে হিমালয়ের চূড়ায় জড়ো হয় মেঘদল, শোনা যায় বজ্রপাত - বৃষ্টির শব্দ, আর নতুন জীবনের পদধ্বনি।

[ক্রমশ]