কালের খেয়া

কালের খেয়া

মনে পড়ে আমাকে?

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২০     আপডেট: ১০ জুলাই ২০২০

ইরাজ আহমেদ

এই শহরে আমি প্রথম ট্যাঙ্ক দেখি, কামানের নল দেখি, যুদ্ধ দেখি, স্বাধীনতা দেখি। কৈশোরে শীতের ভোরে নীলচে কুয়াশা ভেদ করে ছুটে আসা রেসের ঘোড়া দেখি, গড়ে উঠতে দেখি পথঘাট, অচেনা দৈত্যের মতো উঁচু ভবন আর ঝকঝকে দোকানপাট।

বেলবটম প্যান্ট আর কোমরে চওড়া বেল্ট বেঁধে সিনেমার টিকিটের লাইনে মারামারি করে আমার কিশোর বয়স, ভুল কিশোরীর কাছে প্রেমপত্র লেখে, মাউথ অর্গান বাজায় সন্ধ্যারাতে, হাতে তৈরি পাউরুটির কারখানার কাছে গিয়ে বসে থাকে সে সুঘ্রাণ বুক ভরে টেনে নেবে বলে, স্কুল ফাঁকি দিয়ে সারাদিন পথে পথে ঘুরে বেড়ায়, কারও হাত থেকে খসেপড়া রুমাল তুলে রাখে ভালোবাসার চিহ্ন ভেবে।

এক আশ্চর্য জ্বরের মতো আমার কৈশোর এই শহরের সমস্ত শরীর জড়িয়ে রেখেছিল একদিন অথবা শহরটাই জড়িয়ে আঁকড়ে ধরেছিল আমাকে; সরু গলি, রাতবাতি, সামরিক অভ্যুত্থান, ছাদের সিঁড়িতে কোনো কিশোরীর নরম নির্জন, ভালোবাসার বুকখালি করা অনুভূতি আমাকে তোলপাড় করে জাগিয়ে তুলেছিল একদিন।

এই ঢাকা শহরটা তখনও বাড়তে বাড়তে ভূমি জরিপের দাগ ধরে এতদূর চলে যায়নি। বেড়ে ওঠেনি মুখে, গায়ে কৃত্রিমতা মেখে। জন্মেছি এই শহরেই। মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অপরিচ্ছন্ন দেয়াল, ওয়ার্ড, কেবিন চিনতে পারবে আমাকে এখনও? যতবার গেছি জায়গাটায় ততবারই মনে হয়েছে এই হাসপাতালের সাদা সাদা দেয়াল, বিশাল ঘর, ওষুধের গন্ধমাখা করিডোর আসলে এক একটা চরিত্র। কত গল্প, কত ঘটনার তুলকালাম চলেছে এখানে। তবু মনে হয়েছে এরা চেনে আমাকে! আলাদা করে চিনে রেখেছে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে জন্ম নেওয়া একটি শিশুকে। কেন মনে হয়েছে এ রকম? উত্তরটা ঠিক জানা নেই। বলা যায়, এ এক অদ্ভুত অনুভূতি। মনে হয়, কবে হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে মায়ের কোলে চেপে বাড়ি ফিরেছিলাম, কী বার ছিল, সকাল না দুপুর- সব তথ্য হাসপাতালটা জানিয়ে দিচ্ছে আমাকে।

তোমার কি আমার কথা মনে পড়ে হে কৈশোর? ঢাকার চামেলিবাগ এলাকার ছোট টিনের চালাওয়ালা বাড়ি। স্মৃতি একঝলকে জানিয়ে যায়, তারজালে ঘেরা একটা মিটসেফ আর বারান্দার কথা। বাকিটা ধূসর, অস্পষ্ট। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে চামেলিবাগের সরু গলিটার ভেতরে বাড়িঘরগুলো জড়াজড়ি করে থাকত। দু-একটা পাকা বাড়ি ছাড়া আর সবই ছিল টিনের। পেছনেই রাজারবাগ পুলিশ লাইন। বিশাল এক পুকুর সেখানে। লোকে বলত, সেই অতল জলরাশির তলায় শেকল আছে। মানুষকে বেঁধে রেখে দেয়। পুকুরের পাড় দিয়ে হেঁটে গেলে আস্তাবল থেকে ভেসে আসত ঘোড়ার গায়ের গন্ধ। শোনা যেত সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা বিশাল আকৃতির ঘোড়াদের অস্থির পা ঠোকার আওয়াজ। বিকেলের রোদ ঝলসে উঠত সেইসব ঘোড়ার ঝকঝকে শরীরে। কৈশোরের গল্প শহরের এ রাস্তা ও রাস্তা টপকে বেড়ে ওঠে। তেমনই তো বেড়ে ওঠার কথা একটা প্রায় নির্জন শহরের সঙ্গে সঙ্গে। চামেলিবাগ থেকে নয়াপল্টন। ছাদ বদল ঘটল। আমিও স্কুলের দরজায়।

বিশাল স্কুলবাড়ি ছিল ইউনিভার্সিটি ল্যাবরেটরি স্কুলের। প্রেসক্লাব, কার্জন হল, হাইকোর্টের পাশ দিয়ে রিকশা চলার আলাদা পথ ছিল তখন। সাদা অ্যাশফল্টের তৈরি সেই পথ দিয়ে রিকশা চেপে স্কুলে যেতাম। কার্জন হলটাকে মনে হতো রাজবাড়ি। বর্ষাকালে ভেতরের বাগান থেকে ভেসে আসত সুন্দর বনজ গন্ধ, শীতে ফুটে উঠত দুর্দান্ত সব ফুল। নয়াপল্টন থেকে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় স্কুলে যেতে রিকশা ভাড়া লাগত তখন পঁচাত্তর পয়সা। বড় বড় গাছ, ফাঁকা জায়গা আর কলাভবনের গায়ে উজ্জ্বল রোদ স্কুলে না যেতে চাওয়া আমার কিশোরবেলাকে ভীষণ আকর্ষণ করত। স্কুল আমার ছোটবেলায় ভালো লাগেনি কখনোই। তবে তখনকার বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল গেটের পাশে ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেডের একটা ছোট্ট বইয়ের দোকান ছিল। দোকানটা টানত আমাকে। মাঝে মাঝে বাবার হাত ধরে গিয়েছি কাগজ আর নতুন বইয়ের গন্ধমাখা সেই দোকানে। সেই সময়ে স্কুলের পাশেই ফুলার রোড ছিল আরও নির্জনতামাখা। ছিমছাম ছিল নিউমার্কেট। ছুটির দিনে শহরের মানুষ কেনাকাটা আর বেড়াতে যেত নিউমার্কেটে। নিউমার্কেটের বই আর খেলনার দোকানগুলো আমার কাছে ছিল এক রূপকথার রাজ্য।

তখন নিরিবিলি সেই শহরের হাওয়ায় একটু একটু করে গাঢ় হয়ে উঠছিল বারুদের গন্ধ। শহরে মিছিল দেখতাম, সারিবাঁধা মানুষ একসঙ্গে হেঁটে যেতে যেতে আকাশে হাত তুলছে স্বাধীনতার দাবিতে। ক্রোধে ফেটে পড়ছে। এই শহরে তখন চৈত্রদিনের রাজত্ব। সে চৈত্র দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা দেশে। রাজনীতির দোলাচল অতিক্রম করে জন্ম হতে চলেছিল একটি স্বাধীন দেশের।

যুদ্ধ, মৃত্যু, বয়ে যাওয়া রক্তের ধারার ভেতর দিয়ে জন্ম হলো একটা স্বাধীন দেশের। পতাকা পাল্টে গেলে আমিও বদলে গেলাম। এই শহরে বড় হয়ে উঠতে উঠতে অনেক কিছু চোখের সামনে থেকে বেমালুম হাওয়া হয়ে গেল। সেই রেসের ঘোড়ারা গেল, হেয়ার রোডের মোড়ে কাটা পড়ল 'ক্যানন বল' নামে দুর্লভ বৃক্ষটি, সাবাড় হলো পুরোনো রেডিও অফিসের সামনে কৃষ্ণচূড়ার সারি। কিছু চেনা দৃশ্য পাল্টে গিয়ে অচেনা কিছু দৃশ্য পরিচিত হয়ে উঠছিল এক কিশোরের চোখের সামনে।

কিন্তু স্বাধীন দেশে আবারও ট্যাঙ্ক নামল পথে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো সপরিবারে। বিপ্লবে, প্রতিবিপ্লবে শহর ছেড়ে পালাল অনেক শালিক পাখি। তখন স্কুলে ওপরের ক্লাসের দিকে উঠতে শুরু করেছি। সত্তরের দশকের ঘড়ির কাঁটা তার সব অস্থিরতা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। চুরি করে সিগারেট খাই, বেলবটম প্যান্ট, উঁচু কলারের শার্ট আর কোমরে চওড়া বেল্ট বেঁধে দাঁড়াতে শুরু করেছি গলির মোড়ে। এক টাকা পঁচাত্তর পয়সা খরচ করে কোকা-কোলার কাচের বোতল কেনার সামর্থ্য জমা হয় পকেটে। কোনো ঘুপচি রেস্তোরাঁয় বসে ফস করে সিগারেট ধরানোর সাহসটাও তখন বুকের ভেতরে ঘুরপাক খায়। বন্ধুর সংখ্যাও বাড়তে থাকে হুড়মুড় করে। পাড়ার ক্লাবে তখন চুটিয়ে ফুটবল খেলি। শীত এলে পাড়ার বড়দের সঙ্গে ব্যাডমিন্টন খেলার জন্য চাঁদা তুলতে পাড়া মাথায় করি। ক্রিকেট খেলার বল কিনতে বাসে উঠে চলে যাই স্টেডিয়ামের দোতলায় 'হিমালয়' নামে দোকানটাতে। তখন শান্তিনগর মোড় থেকে স্টেডিয়ামে যেতে ইতিহাস হয়ে যাওয়া 'মুড়ির টিন' বাসের ভাড়া ছিল ত্রিশ পয়সা। টেরই পাইনি সময়টা তখন স্কুলব্যাগ কাঁধে বাড়ি ফেরা কিশোরের জীবনকে একটু একটু করে পাল্টে দিচ্ছে।

অনেক কিছুই পাল্টে গিয়েছিল সেই সুদূর কৈশোরে। দোকানের সাইনবোর্ড থেকে শুরু করে পিঁপড়া মারার ওষুধ ছিটানোর লাল রঙের যন্ত্রের মতো ইপিআরটিসি বাসের নাম। বদলে গিয়েছিল রাস্তার নাম, মানুষ আর আমার জীবন। নানান ধরনের বই পড়তে শুরু করেছি তখন। রবিনহুড, গালিভারস ট্রাভেলস আর ট্রেজার আইল্যান্ডের ফাঁক গলে হাতে চলে এলো শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবদাস আর সেই বয়সে নিষিদ্ধ সেবা প্রকাশনীর মাসুদ রানা। এক ধাক্কায় মনে হলো বড় হয়ে গেলাম। দেবদাস পড়ে প্রেমে পড়তে ইচ্ছে করত, মাসুদ রানা পড়ে হতে চাইতাম দুর্ধর্ষ কোনো স্পাই। মাসুদ রানা সিরিজের বই শার্টের তলায় গুঁজে বাড়ি নিয়ে আসতাম। বন্ধুদের সঙ্গে অদলবদল হতো নিষিদ্ধ সেই বই। রূপকথা আর অ্যাডভেঞ্চারের বইয়ের পাশাপাশি সেই বইগুলো অন্য এক পৃথিবীর গল্প জানিয়ে দিয়েছিল আমাকে। পাড়ার মোড়ে বইয়ের লাইব্রেরিতে আট আনা ভাড়ায় মাসুদ রানা পড়তাম দোকানের বইয়ের আলমারির পেছনে লুকিয়ে বসে। কৈশোরে রুশ সাহিত্য পড়তে শুরু করি শান্তিনগর বাজারের সামনে একটা লাইব্রেরিতে। নিচে দোকানঘর, দোতলায় লাইব্রেরি। বসে বই পড়া যেত। তিন-চারটা কাচের আলমারিতে ঠাসা বই। একদিন বই দেখতে দেখতে পেয়ে গেলাম 'পাথরের ছোরা' নামে একটি রুশ কিশোর উপন্যাস। লেখকের নাম ভুলে গিয়েছি; কিন্তু সেই বইটার কথা আজও মনে পড়ে। রুশ সাহিত্য সম্পর্কে মনে কৌতূহল তৈরি করে দিয়েছিল উপন্যাসটি। লাইব্রেরিটার নাম ছিল, 'শান্তিনগর কৃষ্টি ও কল্যাণ সংসদ'। পাথরের ছোরা আর কখনোই কোথাও খুঁজে পাইনি।

স্কুলের ক্লাসে প্রমোশনের সাপলুডু খেলে ক্রমশ আরও ওপরে উঠতে থাকি। অষ্টম শ্রেণির ছাত্রত্ব নিয়ে ধূমপানের শুরু। পালিয়ে সিনেমা দেখার শুরুও তখনই। রেস্তোরাঁয় আড্ডা দিই দলবেঁধে, বেপাড়ার সঙ্গে মারপিটে জড়াই। উড়ূক্কু হওয়ার ইতিহাস লেখা হয়ে যায় চোখেমুখে। তখনও শহরটা উত্তরে পুরোনো বিমানবন্দরের পর কিছুটা এগিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ত। দক্ষিণে দূষণের শিকার না-হওয়া বুড়িগঙ্গা নদী টলমল করে। রিকশা আর গাড়ির জটাজাল দখল করেনি শহরটাকে। সেই শহরের পাড়াগুলো ছিল বড় একটা সংসার। আমার শৈশব এবং যৌবনের অনেকটাই কেটেছে সিদ্ধেশ্বরী এলাকায়। নিরিবিলি এবং বিশাল একটা এলাকা। একতলা দোতলা ঘরবাড়ি, গাছপালা আর তীব্র আকাঙ্ক্ষার বৃত্তের বাইরে ছিল সেখানকার মানুষের জীবন। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাজারের ব্যাগ হাতে তারা বাজারে যেত, চুল কাটার দোকানে অনেকটা সময় নিয়ে খবরের কাগজ পড়ত কেউ কেউ, কারও বাড়ির বারান্দায় বসতো তাস খেলার আয়োজন, রেডিওতে গান ভেসে আসত; বন্ধুরা মিলে বিজয় দিবস আর একুশে ফেব্রুয়ারিতে রাত জেগে হাতে লিখে দেয়াল পত্রিকা বের করতাম। পত্রিকাটা ঝুলিয়ে দেওয়া হতো গলির মুখে একটা বাড়ির দেয়ালে। আমরা নিজেরাই ভিড় করে নিজেদের লেখা পড়তাম। দেয়াল পত্রিকায় গল্প লেখার প্রতিযোগিতা হতো। পাড়ার কোনো একজন বড় ভাই সব পড়ে সেরা গল্প নির্বাচন করতেন। পুরস্কার হিসেবে পাওয়া যেত গলির মোড়ে বেকারির ছোট্ট কেক।

তখন পাড়ায় প্রতিবেশীদের বাড়ির দরজা খোলাই থাকত। সেসব বাড়িতে অবাধ যাতায়াত ছিল আমার। কত গল্প, সংসার নাটকের কত দৃশ্য যে তখন অভিনীত হতো চোখের সামনে! তবুও সেই নিবিড় নৈকট্যের জীবন রঙিন করে রেখেছিল আমার কৈশোরকে। বার্ষিক পরীক্ষার সন্ত্রাস শেষ হলে প্রতিদিন সকালে গলির ভেতরে বসতো জমজমাট ক্রিকেট খেলার আসর। বিচিত্র সাইজের ইট সাজিয়ে তৈরি করা উইকেট, টেনিস বল আর নড়বড়ে ব্যাট কখনোই আনন্দ দিতে কার্পণ্য করেনি। কখনও পাড়ার বড়রাও আমাদের ক্রিকেট খেলায় ঢুকে পড়তেন। দু'দলে ভাগ হয়ে খেলা জমজমাট। কোনো বাড়ির জানালায় অথবা বারান্দায় কারও উৎসুক উপস্থিতি সেই ক্রিকেট খেলার উত্তেজনাকে বাড়িয়ে দিত তখন। ফুরিয়ে যাওয়া সেই শীতের সকালের আনন্দময় কোলাহল আমি আজও শুনতে পাই। মনে হয়, দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসা টেনিস বলটা এখনও শব্দ তুলছে একই ভাবে।

কৈশোরকাল স্বপ্নের খাতায় নাম লিখিয়ে নিয়ে ঘুড়ির মতো পার হতে চায় অনেকটা আকাশ। সেই সময়টার সঙ্গে আমার দেখা হয়েছিল, চেনা হয়েছিল এই শহরেই। জীবনের কাছে চাওয়ার ফর্দটা কৈশোর আমার হাতে ধরিয়ে দেয়নি কখনোই। সে চিনিয়ে দিয়েছিল স্বপ্ন দেখার পথ। বই পড়ে, ছবি দেখে আর ভেবে ভেবেও সেই সময়টা কাটিয়েছি আমি। সেই বয়সে অনেক ভেবে একটা গল্প লিখে ফেলি। সেটা ছাপাও হয় তখনকার 'কিশোর বাংলা' পত্রিকায়। তখন আমি অষ্টম শ্রেণির ছাত্র।

কোনোদিন বন্ধুরা দলবেঁধে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূরে ঘুরতে যেতাম। কোথায় কোন উঁচু ভবন তৈরি হচ্ছে, কোন সিনেমা হলে নতুন সিনেমা এলো- এসব দেখাই ছিল সেই ভ্রমণ যাত্রার উদ্দেশ্য। কোনো কোনো বৃষ্টির দিনে সেই বিখ্যাত 'মুড়ির টিন' বাসে চেপে চলে যেতাম সদরঘাটে। গাদাগাদি করে যাত্রী উঠত সেই লোকাল বাসগুলোতে। মাঝে মাঝে মনে হতো নিঃশ্বাস ফেলারও জায়গা নেই। শহরের অনেক পথ ঘুরে বাস গিয়ে থামত বাংলাবাজারের মোড়ে। সেখান থেকে আরও খানিকটা হেঁটে গেলে বুড়িগঙ্গা নদী তখন বর্ষায় সুন্দর হয়ে থাকত। বৃষ্টিতে ভিজে তীরে দাঁড়িয়ে কখনও নদী দেখতাম। কখনও আবার ঘুরে বেড়াতাম পুরোনো শহরের সরু সরু গলিপথ ধরে। পকেটে তেমন টাকা থাকত না; কিন্তু মুক্তির আনন্দ থাকত। কিছু একটা ঘটিয়ে ফেলার উত্তেজনা থাকত। ওই সময়টাতেই শহরে ঘুরে ঘুরে অনেক জায়গা চেনা হয়েছিল আমার। কখনও দুপুরের রোদে পথে ঘুরে ঘুরে টের পাওয়ার চেষ্টা করতাম চারপাশের হৃদস্পন্দন।

সেই কিশোর বয়সেই স্টেডিয়ামে ঢুকে ফুটবল খেলা দেখার নেশাটা চেপে বসেছিল মাথায়। বিশাল গ্যালারি, সবুজ মাঠ আর হাজার হাজার মানুষের সমস্বরে চিৎকার কেমন একটা ঘোর তৈরি করেছিল মনের মধ্যে। প্রায়ই খেলা দেখতে যেতাম। ঢাকা স্টেডিয়াম তখন শহরের উত্তেজনার একটা প্রধান কেন্দ্র। ফুটবল খেলা দেখতে গিয়ে বিপদেও পড়েছি। ব্যাপক মারামারি, টিয়ারগ্যাস আর ইটপাটকেলের ঝড়ে পড়ে জীবন বিপন্ন হওয়ার অবস্থাও হয়েছে। তবু স্টেডিয়াম আমাকে টানত। ফ্ল্যাডলাইটের আলোয় মোহময় মনে হতো মাঠটাকে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বৃষ্টিতে ভিজে, রোদে পুড়ে সেই খেলা দেখার অভিজ্ঞতা আমার কিশোর বয়সকে প্রাণবান করে তুলেছিল।

আসলে কৈশোর দেশলাইয়ের কাঠির মতো সংক্ষিপ্ত জীবন নিয়ে আসে। শৈশবের অস্পষ্টতা আর তারুণ্যের তীব্রতার মাঝখানে এলোমেলো হাঁটতে থাকা একটা সময়। জ্বলে উঠে আবার পলকেই নির্বাপিত। আমার জীবনের বহু রোমাঞ্চকর গল্প এই কৈশোরকালের কাছে বাঁধা পড়ে আছে, যেগুলোর সূত্র পরবর্তী সময়ে মুছে দিয়েছে তারুণ্যের তীব্রতা। অনেক অনেক ইচ্ছার নৌকা যেন ঘাটে একসঙ্গে বাঁধা থাকত তখন। সব নৌকা যে গন্তব্যে পৌঁছেছে এমন নয়। তবুও সে জীবনের স্বাদ-গন্ধ আজও হঠাৎ হঠাৎ এলোমেলো করে দেয় ভাবনাকে। ওই বয়সের কত গল্প তো এখানে লেখার সীমানার বাইরেও রয়ে গেল। অনেক গল্প থাকে যেগুলোর অনেক শব্দ এক জায়গায় জড়ো হয়েও প্রকাশ করতে পারে না। ছোট্ট একটা গল্পের মতো সেই সময়টা বুকের ভেতরে বয়ে চলে। ভাবি আমি আলোলাগা, ভালোলাগা এই শহরটার কথাও। আমরা পাশাপাশি হাত ধরে চলতে চলতে এতদূর এলাম। কত কী পাল্টে গেলা! তবু শৈশবের ঘ্রাণ আমার হাত ছাড়ে না।