কালের খেয়া

কালের খেয়া


জাদুবাস্তবতার বাক্স

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২০     আপডেট: ১০ জুলাই ২০২০      

শারমিন শামস্‌

শীতের দিনে বেড়ালটা ঘুমোতে যেত পাশের বাড়ির চুলোতে। বুঝুন তাহলে! কত বড় বজ্জাত বেড়ালই না আমি পালতাম। ওকে এনেছিলাম ইশকুল থেকে। ওই যে বড় বড় মাঠওয়ালা শহরের সেরা গার্লস ইশকুল, ওটাতেই পড়তাম। আসলে পড়তাম যতটা না, তার চেয়ে বেশি খেলতাম বটে। যত না খেলতাম মানুষ শিশুদের সাথে, তার চেয়ে বেশি বেড়ালের সাথে, কুকুরের সাথে, এমনকি হাঁস-মুরগির সাথে। এমনকি বাসার ঠিক সামনে যে সরু রাস্তাটা, ঠিক তার উল্টো দিকে কেমন এক রহস্যঘেরা বাড়ি, ঠিক যেন মার্কেজের জাদুবাস্তবতায় ঠাসা, বুড়ি আর তার ছেলে থাকে, আর থাকে এক আস্ত বানর। তো কোনো এক লোভে পড়া বিকেলে আমি ওই বাড়ির দিকে সম্মোহিতের মতো হেঁটে যাই। মনে হলো ছেলেটার নাকি লোকটার ঘাড়ে বসে ওই লালচে বানরটা আমায় ডাকছে। গেলাম তো। গিয়ে ঘণ্টাখানেক বানরের সাথে খেলেটেলে ফিরলুমও। সাথে জুটলো দুটো গ্লুকোজ বিস্কুট আর কলা। বানরও কলা খেলো সাথে বসে। বুড়ি আদর করলো। লোকটা বললো, বানরের নাম ঝুমি। ঝুমির খুব অহংকার।

ছেলেবেলাটা এ রকম বোকা বোকা ছিল। ভাগ্যিস সেটা সেই নব্বই দশকের ছেলেবেলা ছিল! আজ যদি অমন বানর দেখতে ছুটতুম কাউকে না জানিয়ে, ঠিক ফিরে আসতাম রক্তাক্ত হয়ে। আজ ভাবলেও বুক হিম হয়ে আসে।

বিকেলগুলো কমলাটে ধূসর হতো প্রায়ই। কমলার আঁচ আসতো পড়ন্ত সূর্যের শরীর থেকে। পশ্চিম থেকে গরম হাওয়া ছাড়তো সে। একা হেঁটে এ পাড়া থেকে সে পাড়া, এ মাঠ থেকে সে মাঠ, এ পুকুর পাড় ধরে সে পুকুরের পাড়, আর পুকুর পাড়ে রাশি রাশি শামুকের খোল, ঝিনুকের ভাঙা নলচে। কুড়োতে কুড়োতে ফ্রকের কোঁচড় উপচে পড়তো। কিছু ফেলে ছড়িয়ে বাসা পর্যন্ত আসা। সিঁড়ির নিচে ওই যে অন্ধকার মতন ছোট্ট মেশিনঘর, ওটাই আমার আস্তানা। ওর নিচে যাবতীয় গুপ্তধন লুকিয়ে উঠে আসতাম দোতলায়। মাগরেবের আগে ফিরলেই হলো। এ সময়টায় মা ভারি ব্যস্ত থাকে। বিকেলের নাশতা, ঠান্ডা জলে গা ধোয়া, দূরদর্শনে উত্তম-সুচিত্রার সিনেমা, নানান কাজের ফাঁকে চুলে বিনুনি বাঁধতে বাঁধতে মা একবার এসে দেখে যায় আমাকে। আমি গভীর মনোযোগে আঁকড়ে ধরি দুধের গেলাস। মা একবার বেসিনটাও পরখ করে, সফেদ বেসিনে গেলাস উপুড় করে দুধ বিসর্জনের ছিঁটেফোঁটা প্রমাণ যদি মেলে!

ও ঘর থেকে আপাদের সম্মিলিত গলা সাধার আওয়াজ আসে। দুধ গিলে আমাকেও যোগ দিতে হয়, তানপুরার তার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, সুর বসিয়ে। মফস্বলে সন্ধ্যা নেমে আসে- পিয়া কি নজরিয়া জাদু ভরে, রাস্তা দিয়ে কে হেঁটে যায়? ওই ছেলেটা? একটুখানি দাঁড়িয়েছে তবে? আমি কি এখন ভূপালি ধরবো? অথবা এসব ক্লাসিক্যাল রেখেটেখে- যদি এবার একটা রবীন্দ্রনাথের গানই ধরি, কত কত দিন গাইনে... আহা ভুলে যাবো তো, রোজ রোজ গাওয়া উচিত কিনা বটে!

যদি তারে নাই চিনি গো সেকি/সেকি আমায় নেবে চিনে/এই নব ফাল্‌গুনের দিনে/জানি নে জানি নে... মন ভালো নেই আজ। কালও ছিল নাকো। পরশুও খুব। মন খারাপের ব্যামো। কাকে বলি? তানপুরাকে?

ভোরের আগে গলা সাধা- ভোরগুলো খুব মৃত্যুগন্ধি, ওই বয়সে মৃত্যু কেমন ভূতের মতো, অন্ধকারে ঢাকা। ভোরগুলো খুব ছেড়ে যাবার...।

রাজশাহীতে শীত পড়তো খুব। লেপের নিচে মোজা পরে ঘুমোতাম। আম্মা চুলায় চড়াতো সবজির স্যুপ। আমি তখন রুশ দেশের উপকথায় কুড়ূলের জাউ পড়ছি। ভাবতাম আম্মা বুঝি কুড়ুল দিয়ে জাউ রাঁধছে। আমরা অবশ্য অত গরিব ছিলাম না বটে! বসার ঘরে দেয়ালজোড়া বইয়ের আলমিরা ছিল। তাতে ফি মাসে নতুন নতুন বই এসে ঢুকতো। আলমিরার নিচের তাকে শিশু পত্রিকা, কিশোর জগৎ, কিশোর তারকালোক। ক'দিন পরে হাজির ছোটদের কাগজ। আমি একটা কবিতা লিখলাম। পাঠিয়ে দিলাম ছোটদের কাগজ বরাবরে। ওমা, পরের মাসে সেই কবিতা ছাপা হয়ে বেরুলো। লজ্জায় আমি লাল! তো এত লজ্জা লাগছে কেন? এর আগে ইত্তেফাকের কচিকাঁচার আসরে, দৈনিক বাংলায় কবিতা ছেপেছিল আমার। তবে? হয়েছে কী, ছোটদের কাগজের এক তরুণ প্রুফরিডার আমায় একটা প্রেমপত্র লিখেছে। ঠিকানা পেয়ে পত্রমিতালির ইচ্ছে জেগেছে তার। তো সেই চিঠি নিয়ে আম্মা লুকিয়ে রেখেছে ফ্রিজের ওপরে। আমিও টুলে উঠে টুক করে পেড়ে নিয়ে বারান্দার দরজার পেছনে দাঁড়িয়ে পড়ে ফেলেছি। আহা! সেকি চিঠি। ঝকঝকে হাতের লেখা। আমি পড়েটড়ে একদম লাল! নিজেকে খুব কবি কবি লাগছিল বটে। কবিতা পড়ে ভক্তের চিঠি এসেছে ডাকে! যেনতেন ব্যাপার নয় কিন্তু!

আম্মার একটা হলদেটে কাঠের ছোট্ট বাক্স ছিল। তাতে মলিন হয়ে আসা সোনালি রঙের আংটা। সম্ভবত নানার বাক্স ছিল ওটা। নানা ছিলেন ব্রিটিশ কালের ডাক্তার। ঘোড়ায় চড়ে রোগী দেখতে যেতেন। একটা ডিসপেনসারি ছিল তার, সেখানে হরেক রঙের ওষুধ। আম্মা নাকি সাইট্রিক এসিড চুরি করে খেতো, টক খাবার নেশা উঠলে। আম্মার মুখে জলপাইগুড়ির কাঠের বাড়ি, নানার ঘোড়ার গল্প শুনে শুনে আমার কেবল মনে হতো- মেঘের ভেতর দিয়ে একটা সাদা ঘোড়ায় চেপে এক বুড়ো ডাক্তার চলেছে আকাশ ভেদ করে, আর তার রোগী দেখার ডাক্তারি বাক্স এঁটে রয়েছে ঘোড়ার কোমরের পাশ দিয়ে।

তো সেই হলুদ বাক্সে সংসার খরচের খুচরো টাকা রাখতো আম্মা। কলেজে উঠে সেই বাক্স থেকে রোজ অন্তত দশ টাকা সরিয়ে ফেললেই আমার দিন কেটে যেত দিব্যি। ইশকুলে থাকতে অবশ্য সাহসে কুলোয়নি। সেকালে আম্মার সামনে নুলো ভিখিরির মতো হাত পেতে তিন টাকা চার টাকা প্রার্থনা করতে হতো। রাস্তায় তখন হজমিওয়ালা, হাওয়াই মিঠাইওয়ালা, দুধমালাই আইসক্রিমওয়ালাদের বড় দাপট। তাদের চেহারাও বেশ তাগড়াই। এমনকি গোঁফও আছে কাবুলিওয়ালার মতো। আজ ভাবি, আসলেই কি গোঁফওয়ালা মিঠাইওয়ালা দেখেছি? নাকি সে আমার শিশুমনের কল্পনাতেই ছিল! অথচ স্পষ্ট মনে আছে, আব্বা আমাকে দেখিয়ে বলতো, 'আমার পাঁচ বছরের মিনি, একদণ্ড কথা না বলিয়া থাকিতে পারে না।' রবীন্দ্রনাথের কাবুলিওয়ালা থেকে কোট করতো আব্বা। আমি তার মিনি। হরদম কথা বলি। কোটি কোটি প্রশ্ন করি। আর আব্বার আইনের বই, ফাইলপত্রের কোনাকাঞ্চিতে এঁকে রাখি ফুল পাখি লতাপাতা। আব্বা কিছু বলে না। হাসে। আম্মা চ্যাঁচায়। তো আমি বড় আপার বায়োলজি বইতেও আঁকি। সেখানে ড্রইং করাই থাকে- ফুল, ব্যাঙ, পাখি, মানুষ। আমি সেইসব ছবি রঙ করে রঙিন করে তুলি। বড় আপার বড় ইচ্ছা ডাক্তারি পড়বে। সে দিনরাত পড়ে, আমি তার টেবিলের নিচে পুতুলের সংসার সাজায়ে বসে খেলি। মাঝে মাঝে সে বিরক্ত হয়ে আম্মাকে ডাকে। অথবা ভূতের ভয় দেখায়। ভয় দেখানোতে আমার বড় বোনেরা ওস্তাদ। একবার শাড়ি পরে কিম্ভূত এক মহিলা সেজে বাড়ির দরোজার বাইরে দাঁড়িয়ে রইল সেজ আপা। আমি দরজা খুলতেই বলে, 'শোন, তুই কিন্তু এই বাড়ির বাচ্চা নস। আমার বাচ্চা। চল তোকে এবার নিয়ে যাবো।' গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে আমি প্রায় বেহুঁশ। আম্মা এসে সেজ আপাকে পিটুনি। এই কুড়িয়ে পাওয়ার গল্প কয়ে কয়ে আমার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলতো আপারা। কী নিষ্ঠুর ছিল তারা!

বুধবারে ম্যাকগাইভার হতো। ঠিক ন'টায়। তার আগেই খেয়েদেয়ে রেডি। টুং টুং করে মিউজিকটা শুরু হতেই আমাদের হৃদয় দোল খেতে শুরু করতো। আমাদের রিচার্ড গিয়ার এন্ডারসন লাফিয়ে লাফিয়ে চলেছেন, দাঁত দিয়ে তার কেটে, স্টূ্ক্র দিয়ে এঁটে দিচ্ছে কোথায় আর বের হয়ে আসছেন বন্দিশিবির থেকে। মাথাই খারাপ হয়ে যাবে ঠিক। ম্যাকগাইভারকে নিয়ে কবিতা লিখে ফেলল আমার বন্ধু জয়া। সেই কবিতা ইশকুলের দেয়াল পত্রিকায় আসবে। পুরো পত্রিকা হাতে লিখতে হবে আমাকে, সে সময় রটেছিল- আমার হাতের লেখা বেশ ভালো। তো ফাটা কপাল নিয়ে সারা দিনরাত ইশকুলের দোতলার বারান্দায় উপুড় হয়ে দেয়াল পত্রিকায় লেখা তুলি। আর বন্ধুরা সে সময় মাঠে হৈ হৈ করে খেলে। আমি ফোঁস ফোঁস করে শ্বাস ছাড়ি। বাংলা আপা এসে এক ফাঁকে দেখে যায়, আমাকে আর একটা পেয়ারা দিয়ে যায়। আমি ঝাল নুনের আশায় সেই পেয়ারা রেখে দিই ব্যাগে। ছুটির সময় ঝালমুড়িওয়ালার কাছ থেকে নুন চেয়ে সেই পেয়ারা চিবুতে চিবুতে বাড়ির দিকে যাই।

বাড়ির পথটা ভারি আনন্দের। এ পথ থেকে সে পথ, এ বাড়ির পাশ কাটিয়ে সে বাড়ি, ছোট মাঠ, একটা দুটো পুকুরঘাট, ছোট ডোবা-নালা, পার্ক। প্রতিদিনই কেউ না কেউ জুটে যাচ্ছে সাথে। আমার একটা বায়নোকুলার আছে। আমরা চার বন্ধু একটা গোয়েন্দার দল করেছি। বায়নোকুলার দিয়ে ক্রিমিনাল খুঁজি। ক্রিমিনালরা পুরোনো বাড়িতে থাকে। একটা দিনও তাদের দেখা পাই না। অথচ তিন গোয়েন্দা রোজ রোজ ক্রিমিনালের দেখা পেয়ে যাচ্ছে। ওদের মতো আমাদের স্যালভেজ ইয়ার্ডের হেডকোয়ার্টার নাই। আমরা ইশকুলের পিছনের মাঠে রাখা পুরোনো ভাঙা ভোক্সওয়াগন গাড়ির আশপাশে ঘুরঘুর করি। গাড়িগুলোর বয়স অন্তত একশ' বছর। সাদা শরীর হলদে হয়ে গেছে। সামনে থেকে দেখলে মনে হয় দাঁত খিঁচিয়ে তাকিয়ে আছে।

পিছনের মাঠে আমরা চোর চোর খেলি। সামনের মাঠে গোল্লাছুট। হলঘরে টেবিল টেনিস আছে। ওপাশের দোতলার বিল্ডিংয়ে লাইব্রেরি। লাইব্রেরিয়ান স্যারকে এক পুরোনো পাথরের মূর্তির মতো লাগে। ঠাঁয় বসে আছে চেয়ারে। বই খুঁজলে উঠে এসে সাহায্য করেন। বাকি সময় তাকিয়ে থাকেন সামনে খোলা কোনো বইয়ের দিকে। ইশকুলের লাইব্রেরিতে আমার পোষায় না। আমি হপ্তায় তিন দিন শিশু পাঠাগারে যাই। সাধারণ গ্রন্থাগারে যাই। সেই শিশু পাঠাগারের সামনে বিরাট সবুজ মাঠ। পুরো দালানের ভেতরে সোঁদা গন্ধ, হলদে হয়ে আসা বইয়ের পাতা, সেখানে বসে বসেই পড়ে ফেললুম- সুখী রাজপুত্র, মালাকাইটের ঝাঁপি, নিশির ডাক। এদিকে বৃহস্পতিবারে বাবার হাত ধরে যাই নিউমার্কেটে। বই বিচিত্রার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেই দোকানি কাকা নতুন বইয়ের তাকের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে দুটো তিনটে বই এনে সামনে ছড়িয়ে মেলে দেন। জাফর ইকবালের 'নিঃসঙ্গ গ্রহচারী' হাতে নিয়ে, সদ্য বাজারে আসা পোলার আইসক্রিমে কামড় দিয়ে পৃথিবীর বুকে শ্রেষ্ঠ বিকেল কাটিয়ে বাবার সাথে বাড়ি ফিরি। তখন কৈশোর চলছে। শৈশবে পোলার আসেনি। বেকারিতে পাউরুটি কিনতে ঢুকতো আব্বা। সাদা ঠোঙায় টক মিষ্টি দশখানা চকলেট তখন আমার অধিকার। বাসায় এসে কিপটের মতো সেই চকলেট চুষে চুষে খাওয়া। অবশ্য আমার চকলেটে ভাগীদার কেউ নাই। আপারা মস্ত বড়, চকলেট খায় না। ওরা তখন বিকেলে চুল বেঁধে বারান্দায় দাঁড়িয়ে হাসাহাসি করে। রাস্তা দিয়ে যে ছেলে ছোকড়া যায়, ওরা তাদের টিজ করে। ছেলেগুলো কোনোমতে পালিয়ে বাঁচে। দোতলার তিন ধিঙ্গি মেয়ে আর তিনতলার রানু মিনুরা ছয় বোন। সব পাড়ার ছেলেগুলোর যম। এর মধ্যে আমার সেই বজ্জাত বেড়াল পড়ে যায় ড্রেনের পানিতে। আমি কেঁদেই আকুল। আম্মা কিছুতেই ড্রেন থেকে ওকে তুলে আনতে দেবে না আমাকে। অতএব বড় আপা পথচলতি এক তরুণকে ডাকলেন- 'এ্যাই ছেলে'।

ছেলে তখন আকুল নয়নে দাঁড়িয়ে পড়েছে। পাশে দাঁড়ানো মেজ আপা সেজ আপা। এদের কারো একজনের প্রণয়প্রার্থী সে। তো বড় আপা তাকে আদেশ দিল সেই দোতলার বারান্দা থেকেই- 'বেড়াল ছানাটাকে তুলে দাও তো হে!'

বেচারা তরুণ, প্রেমে কাবু, সেই নোংরা ঘেঁটে বের করল ছানাটাকে, বাড়ি বয়ে দিয়েও গেল। বিনিময়ে শুকনো ধন্যবাদ মাত্র, তাও আম্মার তরফ থেকে! কপাল কাকে বলে!

আমি এসব প্রেমের কোনো কারণ বুঝিনে তখন। তবে প্রেমের গান শুনি। অবসকিউর শুনি, সাইফ বলে এক গায়ক সারাদিন গলা ফাটিয়ে গায়- কখনো জানতে চেও না, কী আমার সুখ কী আমার বেদনা।

সাইফের জন্য আমার হালকা হালকা প্রেম প্রেম ভাব হয়। কিন্তু কোথায় পাবো তারে? একমাত্র অডিও ক্যাসেটের কাভারে অন্ধকারে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তার আবছা মুখের ছবিটুকু ছাড়া আর কিছুই তো নেই। তথ্য ও ছবির অভাবে প্রেম তাই কেঁচে যায়। বহুকাল বাদে, ইন্টারনেটের যুগে একবার সাইফ লিখে সার্চ দিয়েছিলুম গুগলে। গাদা গাদা ছবি পেয়েছি। হায়, তখন কৈশোর ভেগে গেছে কই, আর গুগলে সাইফের সেই হেলান দিয়ে দাঁড়ানো ছবির সাথে বুড়িয়ে যাওয়া সাইফের ছবিও পাওয়া যাচ্ছে। আমার সদ্য তারুণ্য তখন বুড়ো ভালোবাসে না। প্রেম পুরোপুরি তিরোহিত হলো হৃদয়ের গোপন কুঠুরি থেকে।

ইশকুলে যাই। পড়ালেখায় কোনোমতে চলছি খুঁড়িয়ে। ক্লাসে আমাদের যে দলটা, শিক্ষকদের চোখে 'ওটা শয়তানের দল'। কাঁচুমাচু মুখে ক্লাসে বসে থাকি। পড়া ধরে বুলু আপা। উদাস তাকাই। হুঙ্কার দেন, 'এত উড়োস ক্যান?'

ক্যান যে উড়ি, কোথায় উড়ি, কেই-বা জানে তা? ধমকের রেশ মনে জমে থাকে। ছুটি হলেই ফুড়ূৎ। রূম্পার সাথে ওর বাসায় যাই। বই বিনিময় চলে। আমি দিলুম যক্ষের ধন, ম্যাক্সিম গোর্কির মা; রূম্পা দিল কত নদী সরোবর। তন্বীর তিনটে আর্চিস আছে। বহুক্ষণ পিছে ঘোরার পর একটা দিয়েছে, তাও দু'দিন সময়। ফেরত দিতে হবে তাই গোগ্রাসে গিলি। একদিন আমিও চাকরি করব আর আর্চিস কিনবো, টিনটিন কিনবো। ছোটদের আনন্দবাজারে টিনটিন ধারাবাহিক বেরুতো। সেটা পড়তাম। এর বাইরে টিনটিন কেনার সাধ্য নেই। টিনটিন পেতে হলে ঢাকা যেতে হবে। সেখানে নীলক্ষেতে টিনটিন আছেন।

ঢাকা মানে আজিমপুর। খালার সরকারি কোয়ার্টার, কলোনি। জানালায় দাঁড়ালে সবুজ একটা পুকুর। উল্টোদিকের বাড়িতে টিংকু আপা। টিংকু আপা খালাতো ভাইয়ের প্রেমিকা। দু'বাড়ি থেকে বাপ-মা অফিসে বেরিয়ে গেলেই টিংকু আপা জানালায় একখানা গোলাপি ওড়না ঝুলিয়ে দেয়। সেটাই সংকেত। সেই সংকেত দেখে ভাইয়া ল্যান্ডফোনে ফোন দেয় টিংকু আপাকে। দু'জনে নিচু স্বরে কত কথা কয়!

মিরপুর রোডে রিকশা চলে। আমাদের বাসা পান্থপথে। বেইলি রোডের ভিকারুননিসা থেকে রিকশা চেপে ফিরি হাবিবার সাথে। সকালে যাইও একসাথে। হাবিবা বড় লক্ষ্মী মেয়ে। ঠিক সময়ে হাজির হয় ডাকতে। তখন আমার চুলে চিরুনি করা হয়নি। দুধে ওটস ভিজিয়ে কেবল খেতে বসেছি। হাবিবা রক্তচক্ষু নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। জুতো হাতে রিকশায় উঠি। রিকশা চলে, আমি জুতো পরি, চুল বাঁধি। হাবিবা আগুন চোখে দেখে বটে, তবে হাত দিয়ে আলতো করে ধরে রাখে আমাকে যেন পড়ে না যাই!

ছায়ানটে রবীন্দ্রসঙ্গীতের ক্লাসে শাড়ি পরার নিয়ম জারি হয়। আম্মা একটা কালো ব্লাউজ বানিয়ে দিলো। সেই ব্লাউজের নিচ দিয়ে আমার গোলাপি ব্রা বেরিয়ে রইলো আর পুরো ক্লাস হাসলো মিটিমিটি। তবু কেউ কয় না আমাকে। আমিও সেই গোলাপি আভাসুদ্ধ ব্রা ব্লাউজ আর প্রায় খুলে আসা শাড়িসমেত পুরো ধানমন্ডি চষে বেড়ালাম, লেকের ধারে বসে কী কী সব খেলাম। আর মাগরেবের আগে দিব্যি বাড়ি ফিরেও এলাম।

বাংলামটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র। শুক্রবারে বই নিয়ে সায়ীদ স্যারের ক্লাস। বাকি দিন বিকেলে আড্ডা। সাথে কেন্দ্রের ঝালমুড়ি। কখনো কখনো চা। এ ওকে গুঁতোই, বিল দে বিল দে। সব্বার পকেট ফাঁকা। আম্মার সেই ঐতিহাসিক হলুদ বাক্স থেকে রোজ আট টাকা চুরি করি। কেন্দ্রে যাওয়ার ভাড়া। ফেরার পথে বন্ধুদের সাথে হেঁটে ফিরি। বাড়ি ফিরলেই মন কেমন। এমটিভিতে সারাদিন মিষ্টি মিষ্টি প্রেমের গান হয়। টিভি দেখি, দেখতেই থাকি। আম্মা এসে চ্যাঁচায়। পড়তে বসি না দেখে রেগে অস্থির হয়। তাকে খুশি করতে ইংরেজি গদ্য পদ্যের বই খুলে বসি। সারি সারি পিঁপড়ের হরফের মতো লেখাগুলো আমার কিছুই ভাল্লাগে না।

একটা হালকা গোলাপি সালোয়ার-কামিজ বানাতে দিই রাজ্জাক ভাইকে। রাজ্জাক ভাই এতদিন আমার স্কার্ট আর মিডি বানিয়েছে। গোলাপি কাপড়ের টুকরো হাতে নিয়ে বলে, 'কামিজের সাথে ওড়না করবেন না আপা?'

আরে তাই তো! ফের ছোটো চাঁদনি চকে। মিহিন একটা গোলাপি ওড়না, শিফনের, কিনে ফিরি, তার চারধারে লেস লাগিয়ে দেন রাজ্জাক ভাই। যেদিন প্রথম ওই সালোয়ার কামিজ ওড়না গায়ে চড়াই, নিজেকে সুরাইয়া মনে হয়। আবুল হাসানের সুরাইয়া খানম। আয়নায় নিজেকে বতিচেল্লির মেডেসি তরুণী লাগে।

সেই আমার তরুণী হয়ে ওঠা। কৈশোরের বাক্স থেকে বেরিয়ে তারুণ্যের দিকে যাওয়া। তখন বাসায় কম্পিউটার লেগেছে। ডায়াল আপ ইন্টারনেট। কোঁ কোঁ করে শব্দ তুলে কানেক্ট করতে হয়। সেখানে গুগল মামা থাকেন। প্যালটকে নতুন নতুন বন্ধু হয়, তারা সারারাত গান গায়। গান গেয়ে গেয়ে প্রেমে পড়ে।

বাসার সামনে দীর্ঘ কোমল পান্থপথ। রাতে সবাই ঘুমোলে পরে আমার ঘরের ঝুল বারান্দায় দাঁড়িয়ে বরই গাছের আড়ালে চাঁদ দেখা যায়। শোঁ শোঁ করে বাতাস বয়। একটা দুটো ট্রাক যায়। টুং টুং করে রিকশা যায়। একা একা হেঁটে যায় কোনো লোক। বিষণ্ণ আর চিন্তাগ্রস্ত। শহর তখন বড়লোক হয়ে উঠছে। বড়লোকের অনেক চিন্তা, অনেক বিষাদ অনেক বেদনা। সোডিয়াম বাতির হলদে আলোয় দাঁড়িয়ে আমি সেই শহরের বেড়ে ওঠা দেখি। ঝকঝকে পান্থপথ দেখি। আমার শরীরের তারুণ্যযাত্রা আর হৃদয়ের আদিম রক্তপাত দেখি! া