কালের খেয়া

কালের খেয়া

অরুণ সেন

গবেষকের ভিন্ন প্রতিকৃতি

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২০     আপডেট: ১০ জুলাই ২০২০

আবুল হাসনাত

অরুণ সেন দীর্ঘদিন থেকে অসুস্থ ছিলেন ঠিকই; কিন্তু তাঁর মৃত্যু আমাদের কাছে প্রত্যাশিত ছিল না। ভেবেছিলাম সদাপ্রফুল্ল ও পরিহাসপ্রিয় অরুণ সেন খুব দ্রুত সেরে উঠবেন। তাঁর হৃদয়ে সর্বদা বিরাজ করেছে বাংলাদেশ; বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক ভুবন ও সাহিত্য। তাঁর মৃত্যুতে আমরা বাংলাদেশের একজন সখা ও সুহৃদ হারালাম। সমগ্র বাংলাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে তাঁর অসংখ্য বন্ধু ও গুণগ্রাহী; আত্মজনের মতো সকলে আজ ব্যথিত। অরুণ সেন জন্মগ্রহণ করেছিলেন মালদায় ১৯৩৬ সালে, বেড়ে উঠেছিলেন কলকাতায়, কিন্তু যখন আত্মজীবনী লিখলেন, সেখানে নিজেকে বাঙাল বলতে দ্বিধা করেননি। কলকাতার নাগরিক বৈদগ্ধ্যের সকল ছাপ ধারণ ও সেখানকার মননজীবী নাগরিক বন্ধুবৃত্তের প্রবল উপস্থিতি সত্ত্বেও নিজেকে এই যে বাঙাল বলে অভিহিত করেছিলেন, তাতে প্রমাণিত হয় তিনি বাংলাদেশ, এই ভূখণ্ডের মানুষ এবং তাদের জীবনাচরণকে কতই না মর্যাদা দিয়েছেন।

আমার সঙ্গে অরুণ সেনের সখ্য গড়ে ওঠে আমার পরম বন্ধু হায়াৎ মামুদের সৌজন্যে; তিনিই পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর সঙ্গে। একুশে ফেব্রুয়ারি উদ্‌যাপনের অনুষ্ঠানমালা পর্যবেক্ষণ করবেন বলে ঢাকায় প্রথম এসেছিলেন ১৯৮৭ সালে; উঠেছিলেন হায়াৎ মামুদের গেন্ডারিয়ার বাড়িতে। হায়াৎ মামুদের বাড়িটি তখন তাঁর কলকাতার বন্ধুদের জন্য অতিথি ভবনে পরিণত হয়েছিল। হায়াৎ মামুদ লিবেদিয়েফকে নিয়ে ডক্টরেট করেন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আশির দশকের প্রারম্ভে। দীর্ঘদিন ছিলেন কলকাতায়। কলকাতায় অবস্থানকালে হায়াতের সঙ্গে সেখানকার মননজগতের বহু মানুষের সখ্য হয়েছিল। এই সখ্যের সূত্রেই তিনি পশ্চিমবাংলার বিদ্বৎসমাজের বহু মানুষকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন ঢাকায় আসতে। এই আমন্ত্রণ রক্ষার জন্য তাঁরা কখনো আকস্মিকই চলে আসতেন ঢাকায়। হায়াতের একান্নবর্তী পরিবারে প্রায় সকলেই প্রসন্নচিত্তে অভ্যাগতদের আপ্যায়ন ও যত্নআত্তি করতেন। এই একান্নবর্তী সংসারে কর্ত্রী ছিলেন হায়াতের পিসিমা। তিনি সকলকে সন্তানতুল্যজ্ঞান করে আদর-যত্ন করতেন- এ চোখে না দেখলে বিশ্বাসই করা যায় না।

অরুণ সেন ঢাকায় প্রথম সাক্ষাতে স্বভাবমাধুর্য ও সাহিত্যে অনুরাগের জন্য হৃদয় হরণ করেন অনেকের। তখন তাঁর বিষ্ণু দে-কে নিয়ে গবেষণাতুল্য বেশ কয়েকটি বই বেরিয়ে গেছে এবং 'প্রতিক্ষণ' পত্রিকার পরিমণ্ডলে স্বপ্না দেব, দেবেশ রায়, পূর্ণেন্দু পত্রী, আফসার আমেদ প্রমুখের সঙ্গে তিনি এই পত্রিকার সম্পাদক সহযোগী। অনেকেই জানেন, 'প্রতিক্ষণ' পত্রিকা সাহিত্যিকবৃত্তে যে রুচি গড়ে তুলেছিল তা এখনো অনেকের হৃদয়-মনে প্রবলভাবে স্থায়ী আসন অর্জন করে আছে। অরুণ সেন তখন এই পত্রিকার সূত্রে ছিলেন না কারোর অচেনা।

তিনি ছিলেন কবিতার আগ্রহী পাঠক। সে জন্য অনেক কবির হয়ে ওঠেন আপনজন। বিশেষত মোহাম্মদ রফিকের কবিতার ভিন্নস্বর ও বিষয়বৈচিত্র্য এবং লৌকিক সাধনা তাঁকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করেছিল।

সন্‌জীদা খাতুন ও ওয়াহিদুল হকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় এবং সখ্য নবীন মাত্রা অর্জন করেছিল। সন্‌জীদা খাতুন কলকাতা গেলেই তাঁদের দেখা-সাক্ষাৎ হতো। একবার কালিন্দীর বাড়িতে সন্‌জীদা খাতুনের কণ্ঠে বর্ষার গান শুনতে এসেছিলেন শঙ্খ ঘোষ, দেবেশ রায়, স্বপ্না দেব ও কাকলি রায়সহ অনেকে। অরুণ সেন তাঁদের অভিন্নহৃদয় বন্ধু হয়ে উঠেছিলেন। তিনি তাঁর কলকাতার লেকটাউন রোড সংলগ্ন কালিন্দী হাউজিংয়ে একটি সুসজ্জিত সুগৃহ গড়ে তোলেন। এই বাড়িটি বাংলাদেশের অনেকেরই আশ্রয়স্থল হয়ে ওঠে। আড্ডা ও তাঁর সান্নিধ্যে অনেকের মননজগৎ সমৃদ্ধ হয়েছে। সন্‌জীদা খাতুন ও ওয়াহিদুল হক ঘরানার সকলেই তাঁর সাহচর্য পেয়েছেন। এমনকি নবীন রবীন্দ্রসংগীতশিল্পীরাও, বয়সের ব্যবধান সত্ত্বেও তাঁর বন্ধুতা পেয়ে প্রীতি বোধ করেন। এই বন্ধুত্বের সূত্রেই নবীন গানের শিল্পীদের নিয়ে চলে যান 'যৌবন মন্দির' কোনারকে, সেখানে মন্দির-গাত্রে উৎকীর্ণ শিল্পনৈপুণ্য জীবন ও যৌবনের বিভা ছড়াচ্ছে। 'কোনারক যৌবন-মন্দির' নামে তাঁর একটি গ্রন্থ আছে; যেখানে তিনি এই মন্দিরগাত্রের শিল্প ও শিল্পের উদ্দীপনা বিভাব নিয়ে আলোচনা করেছেন। পরিশিষ্টে মারীসিটনের একটি লেখা সংযোজন করেছেন। যেখানে মারীসিটন উল্লেখ করেছেন, এই মিথুনমূর্তিতে উৎকীর্ণ হয়ে আছে জীবনের সৌন্দর্য ও জীবনকে শিল্পিত অনুষঙ্গে দেখবার গভীরতা। এই প্রত্যক্ষণ ও কামচর্চা কেবল ভারতীয়দের পক্ষেই সম্ভব হয়েছিল বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।

আশির দশকে ওই ঢাকা ভ্রমণের পরে অরুণ সেন এদেশে এসেছেন ১৮ বার। ঘুরে বেড়িয়েছেন চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরে- এই কথা প্রসন্নচিত্তে তিনি উল্লেখ করেছেন তাঁর আত্মস্মৃতিমূলক গ্রন্থ 'কলকাতার বাঙাল :উভচর স্মৃতি' গ্রন্থে। বাংলাদেশে অরুণ সেনের হাত সর্বদা প্রসারিত ছিল নতুন বন্ধু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায়। এই বন্ধুদের সামাজিক ও সাহিত্য ভাবনা তাঁকে উজ্জীবিত করত। এদেশের বিরুদ্ধ রাজনৈতিক পরিবেশে শত বাধা ও বিপত্তির মুখে কেমন করে এদেশের তরুণ সমাজ দেশচেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে বাঙালিত্বের সাধনা করছে ও শিল্প-সাহিত্যকে করে চলেছে দীপিত, বলীয়ান ও নবীন তরঙ্গ তুলছে ভাবনার জগতে- এ তাঁর আগ্রহের বিষয় ছিল। যদিও গ্রামেগঞ্জে ও বৃহৎ শহরে সাম্প্রদায়িকতার উত্থানে তিনি বিপন্ন বোধ করেছেন; তবুও বাংলাদেশের তরুণদের সাংস্কৃতিক চর্চায় তাঁর আস্থা ছিল। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছিল, সাংস্কৃতিক চর্চার মধ্য দিয়ে এ অঞ্চলের তরুণ সম্প্রদায় রাজনৈতিক ও সামাজিক সংকট নিরসন করবে।

এই অঞ্চলের কয়েকজন রবীন্দ্রসংগীতশিল্পীর তিনি অনুরাগী ছিলেন। তাঁদের কণ্ঠলাবণ্য ও গায়নশৈলীতে যথাযথ রাবীন্দ্রিক গায়কি তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। ছায়ানট ও রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের দেশব্যাপী কার্যক্রমে তিনি বিমোহিত হয়েছিলেন। প্রায় কুড়ি বছর আগে রাজশাহীতে যখন রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদের বার্ষিক অধিবেশন হয়েছিল, তখন তিনি তাতে যোগ দিয়েছিলেন। ঢাকা যাওয়া-আসার একপর্যায়ে তিনি বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার আন্দোলন সম্পর্কে গভীরভাবে আলোড়িত হন। তাঁর ধারণা জন্মেছিল, বাংলাদেশের নাট্য-আন্দোলন নানা দিক থেকে প্রাণবন্ত ও সজীব। নাট্যজনেরা পশ্চিমবঙ্গের নাট্যকার ও নাটকের সঙ্গে সংশ্নিষ্ট সকলের চেয়ে অনেক বেশি আন্তরিক। এ নিয়ে অনেক তর্ক হয়েছে তাঁর সঙ্গে; কিন্তু কিছুতেই ওঁর বিশ্বাস-আস্থা থেকে টলাতে আমি পারিনি। ঢাকা ও কলকাতায় তিনি ঢাকা থিয়েটার প্রযোজিত নাটক দেখে মুগ্ধ হন। বিশেষত সেলিম আল দীনের নাট্যভাবনা তাঁর হৃদয়-মনকে আন্দোলিত করেছিল। সেলিম আল দীনের নাট্যভাবনা নিয়ে তাঁর একটি গ্রন্থে তিনি বাংলাদেশের নাট্যচর্চার নানা প্রবণতা সম্পর্কে শ্রদ্ধামিশ্রিত যে মন্তব্য করেছেন, তা খুবই প্রণিধানযোগ্য হয়ে ওঠে। এ ছাড়া নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্য দিয়ে নাট্যকার সেলিম আল দীন প্রচলিত নাট্যরীতিকে পরিহার করে যে-নাট্যধারা সৃষ্টি করেছিলেন, তাতে তিনি বিমোহিত হন এবং এই গ্রন্থে সেলিম আল দীন-প্রবর্তিত নাট্যরীতিকে অভিনন্দন জানান। অরুণ সেন প্রাবন্ধিকের মর্যাদা অর্জন করেছিলেন যুবা বয়সেই। কিন্তু কোনো দিন, বিশেষত প্রতিষ্ঠা অর্জনের পরেও ব্যক্তিগত জীবনে ও মননচেতনায় পণ্ডিতমন্য অহংকারকে প্রশ্রয় দেননি।

আমরা সাহিত্যের পাঠকেরা জানি, বিশ শতকের ত্রিশের দশকে কবিতায় যে আধুনিকতার সূত্রপাত হয়েছিল, সেখানে কবি বিষ্ণু দে সংখ্যার আধিক্যে নব্য আধুনিকতার বীজ বপন করে একসময়ে মহিরুহের উজ্জ্বলতা ধারণ করেছিলেন। তাঁর কাব্যকৃতি নিয়ে বিস্তৃত কাজ করা খুব সহজ ছিল না। একদিকে তাঁর কবিতাকে দুর্বোধ্য বলে সরিয়ে রাখা হয়েছিল, অন্যদিকে সমকালীন আন্তর্জাতিক শিল্প ও কবিতা অঙ্গন থেকে কবির পরিগ্রহণ বোধ উপলব্ধি করতে পারার পথ খুব মসৃণ ছিল না। অরুণ সেন ভালোবাসা ও সাহিত্যের প্রেম নিয়ে এই দুরূহ কাজটি সম্পাদন করেছেন।

দুই.

অরুণ সেন কেবল যে বিষ্ণু দে-র কবিতা নিয়ে বহুমুখিন কর্মে ব্যাপৃত ছিলেন তা নয়, আধুনিক কবিতার নানা প্রবণতা নিয়েও একটি গ্রন্থ লিখেছেন। শিল্প ও সাহিত্যের নানা বিষয় নিয়েও তাঁর গ্রন্থ রয়েছে। ক্ষীণকায় কিংবা বৃহৎ কলেবরের প্রতিটি গ্রন্থেই তাঁর নানামুখী কর্ম ও প্রতিভার স্বাক্ষর রয়েছে। শিল্প-সাহিত্যের জিজ্ঞাসা তো বটেই সমাজ এবং সংস্কৃতিও তাঁর বিশ্নেষণ ও অনুসন্ধানের বিষয় ছিল। বিষ্ণু দে-র শতবর্ষ উদ্‌যাপনকালে পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমি থেকে জানুয়ারি ২০০৯ সালে 'বিষ্ণু দে : স্বভাবে প্রতিবাদে' শীর্ষক একটি গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। এই বিপুলাকার ও সুমুদ্রিত গ্রন্থে বিষ্ণু দে'কে নিয়ে লেখা উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগুলো সন্নিবেশিত হয়েছে। এই বইয়ের পরিচিতিতে বলা হয়েছে :"বিষ্ণু দে-কে জানতে বুঝতে তাঁর আটটি বইয়ে 'এই মৈত্রী, এই মনান্তর', 'বিষ্ণু দে-র রচনাপঞ্জি', 'বিষ্ণু দে :এই ব্রত যাত্রায়', 'যামিনী রায় বিষ্ণু দে :বিনিময়', 'বিষ্ণু দে-র কথা', 'বিষ্ণু দে-র নন্দনবিশ্ব', ইংরেজিতে ও বাংলায় জীবনী 'বিষ্ণু দে' - যে তথ্যভিত্তি ও পাঠ তৈরি করেছেন তা আন্তর্জাতিক গবেষণার সমতুল্য।" এ ছাড়াও শিল্প-সাহিত্যের নানা বিষয়ে লেখা তাঁর বই :'কবিতার দায়মুক্তি', 'কবিতা : এই সময়ের পাঠ', 'বাচন ও স্বনির্বাচন' তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ।

এ ছাড়া বাংলাদেশের স্বরূপ-জিজ্ঞাসার আলোকে ও চর্চার মধ্য দিয়ে এই অঞ্চলের বাঙালির অন্বেষা নিয়ে কলকাতার নয়া উদ্যোগ প্রকাশনা থেকে তাঁর ও আমার সম্পাদনায় প্রকাশিত 'বাঙালি ও বাংলাদেশ' শীর্ষক একটি গ্রন্থ যা দুই বাংলায় আদৃত হয়েছিল। বইটিতে আছে বাঙালির আত্মসমীক্ষা, মানস গঠনে নানা চড়াই-উতরাই, আবেগ ও শিকড় সন্ধানের সংগ্রামের প্রসঙ্গ।

কলকাতার ডাকসাইটে অধ্যাপক ও প্রাবন্ধিক শিবাজী বন্দ্যোপাধ্যায় ও অরুণ সেনের সম্পাদনায় 'দেশে বাংলাদেশে' গ্রন্থটিতেও এ-অঞ্চলের বাঙালির আত্মসত্তা নির্মাণের প্রসঙ্গ ও বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার বিষয়টি মর্যাদা নিয়ে উপস্থাপিত হয়েছিল।

অরুণ সেনের চর্চা ও সাধনা সাহিত্য প্রসঙ্গেই থেমে থাকেনি। শিল্পও তাঁর আগ্রহের বিষয় ছিল। ভারতের প্রখ্যাত চিত্রকর যোগেন চৌধুরীকে নিয়ে বহু শ্রম ও নিষ্ঠায় তিনি একটি সুমুদ্রিত গ্রন্থ রচনা করেন। এই গ্রন্থে যোগেন চৌধুরীর জীবনসংগ্রাম, প্রতিষ্ঠা ও জীবনযাপনে তিনি যে কত ভাবে নিজের সৃজনে পরিবর্তনপ্রয়াসী হয়ে উঠেছিলেন, তার বিস্তারিত বিবরণ আছে। এ ছাড়া শিল্প প্রসঙ্গে আরেকটি গ্রন্থও খুব উল্লেখযোগ্য। শিল্পী যামিনী রায় ও কবি বিষ্ণু দে-র সঙ্গে যে বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল, তাতে ছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও নান্দনিক যোগাযোগের এক বিরল কাহিনি। কবির লেখা অনেক প্রবন্ধ, কবিতার স্মৃতিচারণ এবং শিল্পীর অজস্র চিঠি ও স্কেচ অবলম্বন করে অরুণ সেন 'যামিনী রায় বিষ্ণু দে : বিনিময়' নামে এই গ্রন্থ রচনা করেন। বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার এই গ্রন্থটি প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। এই গ্রন্থটিও অরুণ সেনের শিল্প-অনুরাগের নিদর্শন।

আমরা অনেকেই তাঁর সখ্য পেয়েছিলাম। অল্পবয়সী অনেক রবীন্দ্রসংগীতশিল্পীর জন্য তাঁর কালিন্দীর বাসভবন হয়ে উঠেছিল তীর্থ-দর্শনের মতো। আমি আর হায়াৎ মামুদ যখন ওঁর বৃহৎ পাঠাগারে রাত্রিযাপন ও সময় অতিবাহিত করেছি, অধিক রাত্রি পর্যন্ত গান শুনেছি- ভারতীয় শাস্ত্রীয়সংগীত, নানা বিষয়ে আড্ডায় ঘুরেফিরে আসত সামাজিক ও রাজনীতি প্রসঙ্গ, তবে তাঁর অনুসন্ধিৎসা ছিল বাংলাদেশের সাহিত্য ও নাট্যচর্চার প্রসঙ্গ। এই সময়ে একটি বিষয় আমাকে অভিভূত করেছিল, তাঁর হৃদয়ের ঔদার্য ও মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখে তাঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা ও প্রীতি দ্বিগুণ বৃদ্ধি পেয়েছিল। প্রাতরাশ, দ্বিপ্রাহরিক আহার ও নৈশভোজে একই টেবিলে আমরা একসঙ্গে খেতাম তাঁর গৃহসহায়িকা শকুন্তলা ও সন্ধ্যাকে নিয়ে। তাঁরা শুধু গৃহকর্মী ছিলেন না, অরুণ সেন এই গৃহসহায়িকাদের দীর্ঘদিনের আত্মীয়জ্ঞান করতেন। এ ছিল আমাদের জন্য এক বিরল অভিজ্ঞতা। এই মহৎ মানুষটিকে সদ্য হারিয়ে আমি ব্যক্তিগতভাবে অত্যন্ত শোকাহত। মানুষটিকে শ্রদ্ধা জানাই। া