কালের খেয়া

কালের খেয়া

মহামারি, সাহিত্য ও করোনার কাল

তুমুল গাঢ় সমাচার

প্রকাশ: ১০ জুলাই ২০২০     আপডেট: ১০ জুলাই ২০২০

বিনায়ক সেন

পূর্বে প্রকাশিতের পর



মহামারি-পরবর্তীকালে চার্চের প্রভাব এতটাই ক্ষুণ্ণ হয়েছিল, তাকে কিছুটা পুনরুদ্ধার করতে না পারলে জন-অসন্তোষ বেড়ে যেতে পারত এবং আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়ে জনবিদ্রোহের সূচনা হতে পারত। এ কারণেই চার্চসমূহকে অর্থ-সাহায্য করার জন্য ওরা এত উদগ্রীব হয়েছিলেন :
Yet, perhaps even more than this, the frenzied charity in which the rich of Europe indulged during and after the Block Death demonstrated their faith in the one institution where it seemed a proper sense of social discipline survived. Discredited the Church might be in the eyes of many but, to the nobles and the monied elite, it was still the dyke which held back the flood of anarchic insurrection unless it were shored up then everything, it seemed, might be swept away.

১৬৬৫ সালের প্লেগের অনুরূপ ফলেও অবস্থার সৃষ্টি হয়েছিল, ধারণা করা যায় ১৮৩০-এর দশকের কলেরার প্রকোপ নিয়েও এমনটা ভাবা চলে। কিন্তু এক্ষেত্রে লন্ডনের গ্রেট প্লেগ-এর তুলনায় ঐতিহাসিকরা বিশেষ করে সাক্ষী মেনেছেন গুটিবসন্তের মহামারীকে। উদাহরণত, ১৬৮৮ সালেরGlorious Revolution ছিল প্রথম বড় আকারের অভিঘাত-সম্পন্ন 'বুর্জোয়া বিপ্লব' (দ্বিতীয়টি ছিল, ১৭৭৬ সালের আমেরিকার স্বাধীনতা-ঘোষণা, এবং তৃতীয়টি ছিল ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লব)। এই বিপ্লবের মাধ্যমে রাজশক্তির নিরঙ্কুশ দাপুটে ক্ষমতা অনেকখানি কমে যায়, এবং ধনাঢ্য বণিক-শিল্পপতি বুর্জোয়া-শ্রেণির প্রভাবাধীন 'সংসদের' রাজনৈতিক ক্ষমতা বেড়ে যায়। জায়মান বুর্জোয়ার অর্থনৈতিক অধিকার/ক্ষমতা সম্প্রসারিত হয়, যা ছিল ধনবাদী বিকাশের পক্ষে খুবই সহায়ক (যার প্রমাণ মেলে শিল্প-স্থাপনে জমি-অধিগ্রহণ বা Land-enclosure নীতি-বাস্তবায়নের মধ্যে)। যেটা আমাদের সচরাচর বোধের বাইরে ছিল, এই Glorious Revolution-কে পরোক্ষভাবে সহায়তা করেছিল গুটি-বসন্তের মহামারী। ব্যাপারটি কাকতালীয়, কিন্তু ঘটনা-প্রবাহ বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। 'প্লেগস্‌ অ্যান্ড পক্সেস :দ্য ইমপ্যাক্ট অব হিউম্যান হিস্টরি অন এপিডেমিক ডিসিসেস' গ্রন্থের লেখক আলফ্রেড বোলেট (Bollet) জানিয়েছেন এ নিয়ে বিস্তারিতভাবে। আমি এখানে তার বক্তব্য সংক্ষেপে তুলে ধরছি :

'রাজপরিবারের ওপরে বসন্তের মহামারির প্রভাব প্রায়শ চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল। ২৯ বছর বয়সে প্রথম এলিজাবেথ ১৫৬২ সালে মরতে মরতে বেঁচে গিয়েছিলেন... ১৬৬০ সালে দ্বিতীয় চার্লস যখন ইংল্যান্ডে ফিরে এলেন সিংহাসনের দখল নিতে, হেগ শহর থেকে তার দলবল জল-বসন্তের মহামারির বীজ বয়ে নিয়ে এসেছিল। তাতে চার্লসের সেই ভাই (গ্লুস্টেরের ডিউক) এবং প্রিন্সেস মেরি মৃত্যুবরণ করেন। স্যামুয়েল পেপিস (Pepys)-এর দিনলিপি লন্ডনে ১৬৬১ সালের গুটি-বসন্তের প্রাদুর্ভাবের বর্ণনা দিয়েছে।...এই মহামারীর কারণে ব্রিটিশ রাজসিংহাসনের উত্তরাধিকারেও পরিবর্তন আসে। ১৬৮৮ সালে রোমান ক্যাথলিক ধারার অনুসারী রাজা জেমস দ্বিতীয়কে গ্লোরিয়াস রিভোলিউশনের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় (জেমস ফ্রান্স পালিয়ে যান)। তখন জেমসের কন্যা মেরি ও তার স্বামী উইলিয়াম সিংহাসন লাভ করেন। তারা দুজনেই ছিলেন প্রটেস্ট্যান্ট ধারায় বিশ্বাসী। কিন্তু ১৬৯৪ সালে মেরি গুটি-বসন্তে মৃত্যুবরণ করেন কোনো সন্তানাদি না রেখেই। উইলিয়াম (William. III নামে পরিচিত- ইনি ছিলেন মেরি স্টুয়ার্টের ছেলে) ১৭০২ সালে মারা গেলে মেরির ছোট বোন এ্যান (Anne) সিংহাসনে বসেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে আবারও উত্তরাধিকারের ক্ষেত্রে সংকট দেখা দেয় যখন এ্যানের ছেলে বিদেশ ভ্রমণে গিয়ে জল-বসন্তে মৃত্যুবরণ করেন। এর ফলে সংসদে আইন পর্যন্ত পাস হয় যে, পার্লামেন্টের অনুমতি ছাড়া এরপর রাজপরিবারের কোন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বিদেশে ভ্রমণ করতে পারবেন না। এ্যানের মৃত্যুর পরে ব্রিটিশ রাজ-সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হন জার্মানিতে বাসরত রাজা জর্জ প্রথম। তারা বাড়িতে জার্মান ভাষায় কথা বলতেন। পরে এরাই ইরেজি আদব-কায়দা-ভাষা আয়ত্ত করে প্রতিষ্ঠা করেন উইন্ডসর ঘরানা (বা The Windsors) যার উত্তরসূরি হচ্ছেন বর্তমানে ইংল্যান্ডের রানী।' দেখা যাচ্ছে, জল-বসন্ত এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল ব্রিটিশ রাজতন্ত্রের ইতিহাসে।

[ক্রমশ]