কালের খেয়া

কালের খেয়া

প্রচ্ছদ

খেলিছে বিশ্ব লয়ে, আনমনে

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২০     আপডেট: ১০ জুলাই ২০২০

শেখ তাসলিমা মুন

খেলিছে বিশ্ব লয়ে, আনমনে

ছবি ::তেপান্তর

আমার দেব সন্তান অর্থ এবার গ্রাজুয়েশন করল। ওর গ্রাজুয়েশন হলো বিশেষ স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে। জীবনের ১২ বছর সে ন্যাশনাল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কাটিয়ে ফেলেছে ভাবতেই আমি অবাক হয়েছি, বারবার আবেগাক্রান্ত হয়েছি।

আমার অর্থ পৃথিবীর সকল এঞ্জেলের একজন। ও আমার এঞ্জেল। স্বর্গের দেবশিশু পথ ভুলে আমার ঘরে এসে পড়া এক নক্ষত্র।

ফেসবুকে ওর গ্রাজুয়েশনের ছবি আপলোড করেছিলাম। আর এক এঞ্জেলের মা আমাকে লিখেছেন, আমাদের এখানে (বাংলাদেশে) সে সুযোগ নেই। আমার ছেলের জন্য কোনো গ্রাজুয়েশন নেই। মনটা স্বাভাবিকভাবেই খারাপ হয়ে গেল।

আসলে মা-বাবারা চাইলে নিজেরাও সন্তানের শিক্ষাজীবন উদযাপন করতে পারেন। বিশেষ স্কুলে এ উদযাপন আয়োজন না থাকলেও আমরা প্যারেন্টরা নিজেরা জানি আমার বাচ্চার বয়স কত। কোন বয়সে তার কোন গ্রেডে যাওয়ার কথা। বিশেষ ট্রেনিংয়ের আওতায় কিন্তু ও ওর গ্রেড সমাপ্ত করছে। আমরা মা- বাবারা নিজেরাই প্রতি বছর তাদের সে বছরগুলোর সমাপনী অনুষ্ঠান ও সার্টিফিকেট দিতে পারি। এতে ওরা ওদের বিশেষ 'বুঝ'-এর ভেতরই উদ্বুদ্ধ হয়, উৎসাহিত হয়, আনন্দ নেয়। ভালোবাসাটা অনুভব করে।

কোনোভাবেই আমাদের শিশুগুলোকে অবহেলিত করে রাখার সুযোগ নেই। তাদের আলাদা করে রাখার সুযোগ নেই। তারাও এ সমাজ এবং জীবনের অংশ। মূল ধারা থেকে তাদের আলাদা না করতে দরকার অ্যাক্টিভিটিস। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় না হোক, অন্তত মা-বাবারা কিন্তু একত্রিত হয়ে, অর্গানাইজড হয়ে তাঁরা এসব আয়োজন করতে পারেন। অন্তত যাঁরা শিক্ষিত এবং সক্ষম মা-বাবা।

আমার জীবনে আমি কোনোদিন আমার সন্তানদের এতটুকু অবহেলা সহ্য করিনি। অর্থ বিশেষ শিশু বলে তো আমি আরও সহ্য করিনি। নিজের ক্ষমতাকে আমি চ্যালেঞ্জ করেছি। প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছি সোসাইটির প্রতি। তার মানুষ হিসেবে সম্মান আমি দাবি করে ছিনিয়ে এনেছি। সারা পৃথিবী ভ্রমণ করেছি, ভ্রমণের প্রতিটি মুহূর্তে বাঘিনীর মতো আমি ফুঁঁসে উঠেছি আমার দেব শিশুকে অবহেলা দেখালে। সবচেয়ে নিদারুণ অভিজ্ঞতা আমার হয়েছিল বেইজিং এয়ারপোর্টে। মিলিটারি পোশাকে আবৃত এক এয়ারপোর্টের কর্মীকে আমি ঘুষি বাগিয়ে ধরেছিলাম শুধু অর্থকে অসম্মান করেছিল বলে। আমার মাথায় তখন ছিল না- চীন একটি কমিউনিস্ট দেশ।

আমাকে বছরের পর বছর জেলে ঢুকিয়ে রাখতে পারত। কিন্তু আমি আমার অর্থর অসম্মান কোনোদিন সহ্য করিনি। করব না। অর্থর জন্য এ পৃথিবীকে জায়গা করে দিতেই হবে; এবং জায়গা করে দিতেই হবে। এ বিষয়ে আমার কোনো ছাড় নেই। আমি আমার 'ফিমেল প্যারেন্ট রোল'কে এতটুকু দুর্বলভাবে দেখিনি। নিজেকে করুণার চোখে দেখিনি, কাউকে দেখতে দিইনি।

আমার অর্থ অটিস্টিক। এক বিশেষ দেব শিশু। ও আমার শক্তি। ওর জন্ম না হলে- শক্তি কাকে বলে; মনে হয় আমার চিরজীবন অজানাই থেকে যেত। পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের মূল্য মনে হয়, ওর জন্ম না হলে- আমি বুঝতে পারতাম না। অর্থ'র আরেক নাম ঈশ্বর। পৃথিবীর মানুষের ভেতর যে ভালোবাসা হয়ে বাস করে।

আমাকে অনেকে প্রশ্ন করেছে- একা কীভাবে সামাল দেন আপনি? একা লাগে না? হতাশ লাগে না? রাগ হয় না? ক্রোধ হয় না? এর প্রতিটি দায় তো তার বাবারও ছিল। সে তো দিব্যি দেশে 'ফেম ফ্যাক্টরি' পত্তন করে ফেলেছে। আপনি নাকানি-চুবানি খেয়ে বাদুড়ঝোলা জীবনযাপন করে যাচ্ছেন। আমার উত্তর- যে কোনো অ্যাডাল্ট যখন প্যারেন্ট হবে বলে মনে করেন বা হয়ে পড়েন, তাদের সকলকে একটি বিষয়ে প্রথমে নিশ্চিত হতে হবে, জীবনের যে কোনো পরিস্থিতিতে সে সেই শিশুর দায়িত্ব বহনে সক্ষম কিনা। তার আদার প্যারেন্ট যদি তার পার্টটি একইভাবে না দেখে বা দেখতে ইচ্ছুক না থাকে, তাহলে সে সন্তানের জীবন গড়ায় তার দায়িত্ব নিতে সক্ষম হবে কিনা? তার উত্তর জেনেই তাকে প্যারেন্ট হতে হবে। তার নিজের ভেতর যদি এ দায়িত্ব বিষয়ে এতটুকু অস্বচ্ছতা থাকে, এ দায়িত্ব কী সে বিষয়ে ধারণা পরিস্কার না থাকে, তার প্যারেন্ট না হওয়াই উত্তম। আমি আমার দায়িত্ব বিষয়ে জানি; এ'জন্য আমার কোনোদিন নিজের দায়িত্ব নিয়ে বাজার- দরকষাকষি করার দরকার পড়েনি। সন্তানের মা-বাবা হওয়া এমন একটি বিষয়, যা নিয়ে দরকষাকষি করতে হলে, তা না হওয়াই মঙ্গলজনক।

আমি অন্যের দায়িত্ব নিতে পারব না; কিন্তু আমারটা নিতে পারি, সে বিষয়ে ১০০% থাকলে আমি যেতে পারি অনেক দূর- এ বিশ্বাস থেকেই আমি কাজ করি। আর একটি কথা, সন্তান সে অটিস্টিক না পৃথিবীর সো কল্ড 'নর্মাল' সেটি বিষয় নয়, বিষয় সে তার ইনডিভিজুয়াল সত্তা, তার ব্যক্তিত্ব, তার ডিগনিটি, তার অধিকার। পৃথিবীর প্রতিটি সন্তানের মতো মানুষ হবার অধিকার রয়েছে তার বিশেষত্ব নিয়েই। আর সেটি নিশ্চিত করবে তার বাবা-মা। সে দায়িত্ব থেকে পালিয়ে থাকবার কোনো উপায় আমি খুঁজিনি। বিষয়টি এমনই সহজ আমার কাছে।

সময়টা তবে সহজ ছিল না। তখন আমার নতুন চাকরি। তার আগে আর একটি চাকরি ছেড়ে সন্তানদের হাত ধরে, স্বামীর জন্য লন্ডন গিয়েছিলাম। লন্ডনে একটি পরিবার গড়ে উঠবে সে স্বপ্নে বিভোর হয়ে। ছয় মাস যুদ্ধ করে, ঘরবাড়ি ঠিক করে পশুর মতো পরিশ্রম করে বাচ্চাদের সেট্‌ল করে, নিজেদের অবস্থান শক্ত করে যখন নিয়ে এলাম, ঠিক তখনই সব ভেঙে আবার ফিরতে হলো ফেলে যাওয়া আরেক দেশের ঘরবাড়িতে, সব দিক থেকে নিঃস্ব হয়ে।

আবার যুদ্ধ। আবার বাচ্চাদের স্কুল, ডে-কেয়ার, নিজের নতুন চাকরি। মাত্র অফিস শুরু করেছি। ট্রেনিং চলছে। এর মাঝেই ডে-কেয়ার থেকে ডাক। গেলাম। মুখোমুখি বসলাম। ডে-কেয়ার মনে করছে, অর্থ'র আই কন্ট্যাক্ট নেই। সে অন্য শিশুদের সাথে খেলতে আগ্রহী নয়। নিজের মনে একটি ঘরের কোণে যাবতীয় জিনিস জড়ো করে খেলে যায়। ডাকলে সাড়া দেয় না। আমি ওদের সাথে তর্ক করতে থাকলাম যে, ওর ওপর দিয়ে অনেক ঝড় যাচ্ছে। অনেকগুলো দেশ, অনেকগুলো ভাষা, অনেকবার বাসা বদল, বাবার চলে যাওয়া- সবকিছু ওকে একটু নীরব করে দিয়েছে। ও চুপচাপ থাকছে। এর মানে এই নয় যে, ওর কোনো সমস্যা। এটি সময়ের ব্যাপার। ওকে একটু আলাদা সময় দিলে আবার ওর সব ঠিকঠাক হয়ে যাবে, খোলামেলা হয়ে যাবে। বিশেষ করে ও ভীষণ সোশ্যাল একটি শিশু হিসেবে এক্সপ্রেস করে আসছে। এটি সাময়িক। ডে-কেয়ার আমাকে জোর করল না; কিন্তু অনেক ইনফরমেশন দিল। এও জানাল, আমি পারমিশন দিলে ওরা একটি নির্দিষ্ট বিভাগ আছে, যেখানে বাচ্চার স্পিচ বিষয়ে নিরীক্ষা করা হয়, সেখানে রেফার করবে। আমি একটু সময় নিয়ে ভেবে বললাম, ঠিক আছে! দেখি তারা কী বলে।

আমাদের সেখানে কাটল ছয় মাস। ছয় মাস ধরে সপ্তাহে একবার করে গেলাম। ওরা কান ও চোখ বিভাগে পাঠাল। বাচ্চার শ্রবণ ক্ষমতা পরীক্ষা করল প্রায় চার সিটিংয়ে। অনেকটা সংগীত স্টুডিও রুম। ওর কানে ভারী হেডসেট দিয়ে বাইরে থেকে ডাক্তার খুব ভ্যারাইটিজ শব্দ দিয়ে ওকে জিজ্ঞেস করেন- অর্থ তুমি কি শুনছ? আমি লক্ষ্য করলাম, অর্থ শুনছে কিন্তু ডাক্তারের প্রশ্নের জবাব দিতে সে আগ্রহী নয়। এমনকি ডাক্তারের মুখের দিকে তাকাতেও তার কোনো আগ্রহ নেই। ডাক্তার এক মাস টেস্ট অব্যাহত রেখে বললেন, ওর হিয়ারিংয়ে কোনো সমস্যা নেই। চোখ বিভাগেও এ অবস্থা। সে দেখে; কিন্তু ডাক্তারের প্রশ্নের উত্তর দেয় না। সে রুমের অন্য জিনিসপত্রের দিকে বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠে। শেষমেশ মেশিনের মাধ্যমে টেস্ট করে জানা গেল তার চোখেও সমস্যা নেই। সমস্যাটা ওর 'ইন্টারপ্লে'তে। কমিউনিকেশনে। সে কনভারসেশনে আগ্রহী নয়। কিন্তু সে নিজের মনে কথা বলে। তার নিজের কিছু শব্দ আছে বলার জন্য। অর্থাৎ তার ভাষা আছে।

ওরা বলল, ভাষাটা যে একটি কমিউনিকেশন মাধ্যম এটি ও বুঝতে পারছে না। যার জন্য ও আমাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে, এটাও বুঝছে না। ওর প্রশ্ন থাকলে ও কিছু শব্দ অবলম্বন করে বা কাজের মাধ্যমে করে যাচ্ছে। যেমন খিদে লাগলে 'কাবা' বলে আমার হাত ধরে ফ্রিজের কাছে নিয়ে যাওয়া। বাইরে যাবে বলতে পারছে। কিন্তু আমি যদি বলি বলটা আমাকে দাও। সেই কমান্ডটি সে নিতে পারছে না। কিন্তু বল শব্দটি শুনে রিকগনাইজ করতে পারছে। 'বলটি আমাকে দাও!' এটি শুনে বলটি নিয়ে সে নিজে খেলা শুরু করছে।

অর্থ'র প্রথম ডায়গনসিস Semantic pragmatic language disorder. ওরা ওখান থেকে রেফার করল শিশু সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে।

এপ্রিল ২০০৫। কচি রোদে ভেসে যাওয়া একটি সকাল। ওরা আমার হাতে একটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বলেছিল, আমরা যা সন্দেহ করেছিলাম সেটিই, অর্থ অটিস্টিক। আমি এক হাতে একটি কাগজের বান্ডেল নিয়ে বেরিয়ে এসেছিলাম। অফিসে গিয়ে আমার টেবিল ক্লিন করেছিলাম। আস্তে করে অফিস থেকে বেরিয়ে এসেছিলাম। এরপর ছয় মাস আমি অফিসে যাইনি। আমি সময় নিয়েছিলাম আমার করণীয় বুঝতে। আমার দায়িত্ব বুঝতে। অটিজম কী সেটি বুঝতে।

অর্থকে ডে-কেয়ারে পৌঁছে দিয়ে আমি চলে যেতাম লাইব্রেরিতে। অটিজম বিষয়ে বই নিয়ে বসে থাকতাম ঘণ্টার পর ঘণ্টা। বুঝেছিলাম, এ জার্নিটা লম্বা এবং সারাজীবনব্যাপী। সেখানে আমি একা।

আমি পিছু হটা কাকে বলে জানি না। আমার প্রথম কাজ হলো- অর্থর আচরণগুলোর একটি লিস্ট করে ফেলা। সেগুলো অটিজম বিষয়ক স্টাডির সাথে মেলানো। স্টকহোম অটিজম ফর স্মল চিলড্রেনের সাথে যুক্ত হলাম। ওখানে থিওরিটিক্যাল ক্লাস করলাম। আমার ১২টি লেসনস ছাড়াও অর্থর প্রশিক্ষণ শুরু হলো। প্যারেন্টসের জন্য থেরাপি এবং প্রশিক্ষণ পেলাম। শুরু হলো তাদের বাসায় আসা। অর্থর খেলা, কথা, আচরণ ভিডিও করা এবং সেগুলোর পর্যালোচনা এবং দৈনন্দিন রুটিন তৈরি করা। একটি মেথড আছে। ছবি দিয়ে জীবন বিবরণ। জীবনের প্রতিটি আচরণ ছবি দিয়ে বর্ণনা করা এবং নামায়িত করা। এভাবে অর্থকে কাছের পারিপার্শ্বিকতা বোঝানো শুরু হলো। 'রি-এনফোর্সমেন্ট' আরেকটি মেথড, যা দিয়ে নেগেটিভ আচরণ দূর এবং পজিটিভ আচরণে উদ্বুদ্ধ করা। মিলিয়নস জিনিস একসাথে জানতে ও বুঝতে সে সময় কোথায় পৌঁছে গিয়েছিলাম মানসিকভাবে আজ আর সে কথা ভাবতে চাই না।

ভোর ৩টায় উঠে মাকে বিছানা থেকে তুলে টেনে নিয়ে তার ঘরের মেঝেতে বসিয়ে খেলতে লাগিয়ে দেওয়া। সপ্তাহের সাত দিন। দশ বছর আমি তিন ঘণ্টার বেশি ঘুমাতে পারিনি। চার বছর বয়সেই ঘর খুলে দৌড়ে মাকে হারিয়ে দিয়ে নিমেষে চোখের আড়ালে হারিয়ে যাওয়ার সে ভীতিকর দিনগুলো। সামলাতে তো হয়েছেই। অপশন তো আমার কিছু ছিল না।

বিদেশের ইউনিভার্সিটি থেকে আন্তর্জাতিক আইনে ডিগ্রি নিয়ে যে আমি সব সময় আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলোতে কাজ করার স্বপ্ন দেখেছি, সেই আমি আজ এমন একটি অবস্থায়- ছয় মাস অফিসেই যেতে পারিনি। চাকরিটা কীভাবে টিকিয়ে রাখব সেই চিন্তায় চিন্তিত। ক্লান্তি আর দুশ্চিন্তায় ডুবতে ডুবতে উঠে দাঁড়ানোর একটি পিঠ আমার আগে থেকেই ছিল। উঠে দাঁড়ালাম। জীবনটাকে নতুন করে কেটে-ছেঁটে যাপনের জন্য তৈরি করতে হবে। পুরোনো স্বপ্নগুলো ছেঁটে ফেলে, যা আমার বর্তমান তার ভেতর শুরু করতে হবে আরেক ধরনের জীবন।

শুরু করে দিলাম তথ্য সংগ্রহ। কীভাবে অর্থর জন্য সবচাইতে ভালো ট্রেনিং স্কুল খুঁজে পাওয়া যায়। বুঝলাম, এটিই এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় যুদ্ধ। কাউন্সিল অফিসে এডুকেশন ডিপার্টমেন্টের এক্সট্রা রিসোর্স গ্রপের সাথে কথা বললাম কয়েক দফায়। আমি লাইব্রেরি করে, অটিজম সেন্টার থেকে ইনফরমেশনের ভিত্তিতে যেসব স্কুলের নাম এনে দিই, ওরা সেই স্কুল বিষয়ে আমাকে উৎসাহ দেখায় না। আমি যতবার সেসব স্কুলের কথা বলি, ততবার তারা কাউন্সিলের এলাকাভিত্তিক স্কুল কতটা ইফেক্টিভ সে বয়ান অব্যাহত রাখে। আমি কিছুতেই বুঝি না ওরা আমার সাথে এমন করছে কেন। তখনও অভিজ্ঞতায় আমি পিছিয়ে আছি। আমি ঠিক করলাম- আমার বেতনের অর্ধেক খরচ করব কোনো প্রাইভেট ইনটেনসিভ থেরাপিতে। তবু আমাকে করতে হবে। একদিন লাইব্রেরিতে বসে একটি বই পড়তে শুরু করেছি, বইটি এক মায়ের অটিস্টিক বাচ্চা নিয়ে যুদ্ধবিষয়ক। সে প্যারেন্ট লিখছে- মনে রাখবে, বাড়তি মনের চাপ নেওয়ার সময় এবং এনার্জি তোমার নেই। যখন দেখবে যেখানে তোমার বাচ্চার সঠিক হেল্প হচ্ছে না, জায়গা বদল করো। যেখানে ভালো স্কুল, তোমার বাচ্চা ফ্রেন্ডলি, সেখানে মুভ করো, কারণ তোমার এখন সব এনার্জি তোমার বাচ্চার জন্য সেইভ করতে হবে। হঠাৎ যেন আমার চোখের সামনে দিগন্ত খুলে গেল। মনে হলো, লাইনগুলো আমার জন্য লেখা। বইটি আমার জন্য অপেক্ষা করে ছিল।

পরদিন অফিসে টেবিলে বসে নিজের বাড়ি রিয়েল স্টেটে বিক্রির জন্য দিলাম। স্টকহোমের যে স্কুলটি অটিজম বিষয়ে সবচেয়ে ভালো কাজ করছে, সেই স্কুলের আশপাশে বাড়ি দেখা শুরু করলাম। ওয়েবসাইটে ফেড়ে-খুঁড়ে যা বের করতে পারলাম, সেটি হলো এলাকাটি এক্সপেনসিভ। আমার বাড়ির দামে জুটল দুটি বেডরুমের একটি অ্যাপার্টমেন্ট। এক সপ্তাহের ভেতর আমি আমার বাড়ি বিক্রি করলাম এবং একটি ফ্ল্যাট কিনে ফেললাম আমার অফিসের কাছেই।

শুরু হলো নতুন জায়গায়, নতুন বাসায়, অর্থর নতুন স্কুল নিয়ে আমার নতুন জীবন। এ পিরিয়ডটি আমার আর অর্থর জীবনের সবচাইতে দামী একটি সময়। জীবনের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার সীমা নেই; কিন্তু সে সময়টির কোনো তুলনা নেই। লিখতে গেলে পুরো একটি বই লিখতে হয় শুধু এ স্কুল নিয়ে। এত শিখেছি সে বছরগুলোতে, এত পেয়েছি এবং এত দিয়েছি। একেক সময় মনে হয়, কে যেন আমাকে দিয়ে এক আকাশসম কাজ করিয়ে নিচ্ছে। দেবদূতের মতো কিছু মানুষ আমার চারপাশে। তারা আমাকে আঁজলা ভরে ভালোবাসা বিলিয়ে যাচ্ছে। স্বর্গের দ্বার বেয়ে নেমে আসা আমার দেবশিশু, স্বর্গের দেবশিশুর মতো সুন্দর। তাকে ঘিরে খেলছে এ পৃথিবী, পৃথিবীর এক দল মানুষ। এত যত্ন, এত ভালোবাসা দিয়ে অর্থকে ওরা ঘিরে থাকে, আমার চোখ চিকচিক করে ওঠে। সে সময় ওদের সুপারভাইজার ছিল খ্যাতনামা একজন বিশেষজ্ঞ। তার কাছে আমি অনেক শিখেছিলাম। আমাকে আলাদাভাবে সপ্তাহে এক ঘণ্টা ক্লাস নিতেন।

কত রাতের আকাশ ভরা কথা। অর্থকে নিয়ে এ যাত্রায় কতবার ভেঙেছি, গড়েছি, কেঁদেছি, হেসেছি, শিখেছি। শিখে চলেছি।

অর্থ আমাকে প্রতিদিন শেখায়। এক আঁজলা জীবন। আমার জীবনের সব অর্থপূর্ণতার নাম সে- অর্থ। আমি দেখি এক দেবশিশু। আর সে দেবশিশু খেলিছে বিশ্ব লয়ে, আনমনে।

সুইডেন থেকে