কালের খেয়া

কালের খেয়া

প্রচ্ছদ

নিঃশব্দ লড়াই

প্রকাশ: ০৩ জুলাই ২০২০     আপডেট: ১০ জুলাই ২০২০

মণিকা চক্রবর্তী

নিঃশব্দ লড়াই

অলঙ্করণ ::আনিসুজ্জামান সোহেল

দেব শিশুকে নিয়ে লিখতে হবে। আমি ভাবছিলাম কী লিখব! কোথা থেকে শুরু আর কোথায়ই বা শেষ! মাথার কাছে যে বইটিকে সবসময় রাখি, তা হলো পার্ল এস বাকের 'দ্য চাইল্ড হু নেভার গ্রিউ।' তিনি সাহিত্যে পুলিৎজার ও নোবেল দুটি পুরস্কারই পেয়েছিলেন। জড়বুদ্ধিসম্পন্ন তার নিজের মেয়ে শিশুকে নিয়ে লেখা এই বইটি আমি অনেকবার পড়েছি। প্রায়ই পড়ি। নিজের ভেতর এক অন্যরকম গভীর সত্যকে উপলব্ধি করেই এই বইটি তিনি লিখেছিলেন।

লেখকের জীবনের সব পূর্বধারণাকে নস্যাৎ করে দেয় এই লেখা। যেন তিনি একজন শুধুই মা। যে সত্যকে তিনি অনুভব করেছেন, সেই সত্যের কাছে যেন বাদ বাকি জীবনটাই অন্তঃসারশূন্য। তাঁর বইয়ের কিছু কথা- 'সেই সময়গুলোতেই আমি পৃথিবীতে যে দু'ধরনের মানুষ আছে তাদের আলাদা করতে শিখলাম; যারা পরিত্রাণহীন শোককে চিনেছে এবং যারা চেনেনি। কারণ দুঃখেরও মূলত দুটি ধরন আছে ; যা নিবৃত্ত করা যায় এবং যা নিবৃত্ত করা যায় না।' ...একটু পরেই লিখছেন, 'এটা জলপ্রবাহে ছুড়ে দেওয়া পাথরের মতো। ব্রাউনিং যেভাবে বলেছেন- 'জলকে অবশ্যই নিজের মধ্যে ভাগ হয়ে জলকে মানিয়ে নিতে হবে, কারণ সে পাথরটিকে অপসারণ করতে পারবে না।'

আমার ছেলের বয়স এখন বাইশ বছর। এত সুন্দর ছিল দেখতে ছোটবেলায়! ওর নাম রেখেছিলাম স্বপ্ন সায়ন্তন। অন্য স্বাভাবিক বাচ্চাদের মতোই ওর বড় হয়ে ওঠা। দু'বছর বয়সেই পুরোপুরি হাঁটা, চলা, কথা বলা, ছড়া, গান- সবই বলতে পারত সে। তবে কয়েকটি বিষয় আমাকে খুব অবাক করত। সে কখনও স্যান্ডেল ঠিকভাবে পরত না, চকলেট চুষে না খেয়ে চিবিয়ে খেত, অপরিচিত লোকদের একেবারেই পছন্দ করত না, ট্রাইসাইকেলটি কখনও চালাতে শেখেনি। আমি ওর জামা নিজ হাতে সেলাই করতে ভালোবাসতাম। একদিন দুপুরে সেলাইকলের সুঁই আমার হাতে ঢুকে গিয়ে প্রচুর রক্ত বের হতে লাগল। আমি ব্যথায় কষ্ট পাচ্ছি, কাঁদছি; কিন্তু সায়ন্তনের কোনো অভিব্যক্তি প্রকাশ পেল না। আরেক দিন আমার বারান্দা থেকে ওকে চিৎকার করে কাঁদতে দেখলাম। বিষয়টা কী! জানতে গিয়ে দেখি সে ছোট্ট আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে নিচের বাগানে গরু ঢুকে বাগান নষ্ট করছে। এই দুটি বিপরীত বিষয়ের ভেতর দিয়ে ওর সংবেদন ক্ষমতার প্রকাশকে আমি আজও স্পষ্ট করে বুঝতে পারিনি। তবে এটা বুঝেছি অনেক পরে যে, তার প্রত্যক্ষণ ক্ষমতা ও সংবেদনশীলতা কোনো কোনো ক্ষেত্রে অনেক অনেক বেশি। যেমন- পরিবারের প্রতিটি মানুষকে সে অনেক ভালোবাসে, আবার গানও ভালোবাসে। গানের প্রকৃত সুর না পেলে সে গানকে এড়িয়ে যায় এবং অনেক কষ্ট পায়। ঠিক সুরে চমৎকার কোনো গান শুনতে পেলে সে অনেক খুশি হয়।

ওর তিন বছর বয়সে আমি ওকে গাজীপুর শিল্পকলা একাডেমিতে ছবি আঁকার ক্লাসে নিয়ে যাই। ওখানে সে মুখে মুখে অনেক ছড়া বলত, কিন্তু রঙ পেন্সিল দিয়ে আঁকার প্রতি কোনো উৎসাহ দেখাত না। অথচ বাসায় চমৎকারভাবে ব্লক সাজিয়ে খেলা করত। এ রকম ছোটো ছোটো অনেক সূক্ষ্ণ বিষয় ছিল, যা আমাকে খুবই চিন্তিত করত। আবার খুব অবাক হতাম, সে যখন ওয়াল্ট ডিজনির বইয়ের বামবি গল্পটি পুরোপুরি মুখস্থ বলতো; বইটির নির্দিষ্ট পাতাটি সামনে রেখে। এমনকি আমার গাওয়া কোনো গান পুরোপুরি আমার মতো করেই নির্ভুলভাবে গলায় তুলে গাইত। বেশ বড় রকমের একটি পরিবর্তন দেখতে পেলাম ওর সাড়ে তিন বছর বয়সে। সরকারি চাকরির বদলিজনিত কারণে সেই সময় আমরা গাজীপুর থেকে বেলকুচি থানায় বদলি হলাম। গাজীপুরের সরকারি ফ্ল্যাট বাড়িগুলোতে আমাদের অনেক প্রতিবেশী ছিল। আমার পাশের ফ্ল্যাটের ভাবির মেয়ের সঙ্গে সায়ন্তনের খুবই ভাব ছিল। দিনের অনেকটা সময় ওখানেই থাকত সে। নতুন জায়গায়, নতুন ডুপ্লেক্স বাড়িতে এসে আমি খুব একা হয়ে গেলাম। নিচের তলায় দারোয়ান, পিয়ন, ড্রাইভার থাকত সবসময়। ওরাই হলো সায়ন্তনের বন্ধু। সারাদিনই সে ছুট দিয়ে নিচের বাগানে, উঠানে খেলা করে; তবে কোনো সামাজিক খেলা নয়। সে খেলে আপন মনে। বাড়ির পাশের মাঠে রাজ্যের ছেলেরা খেলা করে। তাদের সঙ্গে খেলবে ভেবে দারোয়ান ওকে নিয়ে যেত সেই মাঠে। কিন্তু খুবই আর্শ্চযজনকভাবে সে মোটেও খেলত না। হয় চুপ করে এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকত, অথবা কোনো একটি গাছের ডালের ছোট্ট অংশ হাতে নিয়ে তাতেই মগ্ন থাকত। আমার ব্যালকনি থেকে দেখা যেত সেই মাঠ। আমি ওকে দেখতাম আর খুবই বিষণ্ণ বোধ করতাম। তখনও কি জানতাম- স্বপ্নের ভেতরের এক চূড়ান্ত ভাংচুর আমার পুরো সত্তাকেই বদলে দেবে! দেখতে দেখতে টের পেতে লাগলাম, যে ছেলে অনর্গল কথা বলত, তার কথা এসে থেমে যাচ্ছে দুটি বা তিনটি বাক্যে। সঙ্গে সঙ্গে তার জিদ বাড়তে লাগল, টয়লেট ট্রেনিংটা আস্তে আস্তে যেন হারিয়ে যেতে থাকল। নিচের উঠোনে খেলতে যায়, প্যান্ট ভিজিয়ে আসে। আমি এক তীব্র অশান্তি নিয়ে ভেতরে ভেতরে ছটফট করি। কাউকে বিষয়টি বুঝিয়ে বলাও যায় না। ওর বাবা তখন থানার নির্বাহী কর্মকর্তা। চব্বিশ ঘণ্টাই জরুরি কাজে ব্যস্ত। দু-একদিন ওকে বলার পর সিদ্ধান্ত হলো- ওকে স্কুলে দেবো। যথারীতি স্কুলে দিলাম। সাত দিন পর জানলাম, সে ক্লাসের সিটেই বসে না। ওরা ওকে নিয়ে খুবই মুশকিলে পড়েছে। আমি ওর সমস্যাটা মরিয়া হয়ে সবাইকে বোঝাতে চাইলাম, কিন্তু কেউ বুঝতে চাইল না। যেহেতু সে আগে অনর্গল কথা বলেছে, বিষয়টা কেউ গুরুত্ব দিয়ে দেখল না। কেউ বলল ভিটামিনের অভাব হয়েছে, কেউ বলল নতুন জায়গায় মানিয়ে নিতে কষ্ট হচ্ছে। ঠিক এ সময় আমার বোন এলো আমার বাড়িতে বেড়াতে। ওর ছেলে আমার ছেলের বয়সী। আমি অবাক হয়ে দেখলাম- দুটি শিশুর ক্ষেত্রে কত পার্থক্য! সায়ন্তন কোনো ক্রিয়েটিভ খেলা খেলত না, অন্যদিকে আমার বোনের ছেলে দু'দিনেই মাঠে গিয়ে খেলা করল। দারোয়ান, পিয়ন, বুয়া সবার সঙ্গেই যেন নতুন নতুন খেলা নিয়ে মেতে উঠল। আমার বোন স্পষ্টভাবে বিষয়টি তুলে ধরল এবং অনেক যুক্তি-তর্ক দিয়ে বোঝাতে সফল হলো যে, কিছু একটা বিষয় ঘটছে। দ্রুত ডাক্তার দেখানো দরকার।

ডাক্তার কোথায় পাব! আমরা চিন্তিত হয়ে পড়লাম। তখন যোগাযোগ ব্যবস্থা এখনকার মতো ভালো ছিল না। নদীভাঙন এলাকায় বারোমাসেই রাস্তা ভাঙা থাকত। তবু অনেক কষ্টে শিশু বিশেষজ্ঞ এম আর খানের সিরিয়াল নিলাম পনেরো দিন পর। এই পনেরো দিনের মধ্যে এক সন্ধ্যায় আমি বিষণ্ণ মনে বসে বসে নিচের তলার লাইব্রেরিতে এনসাইক্লোপিডিয়া দেখছিলাম। সেই সময় পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে হঠাৎ অটিজম লেখাটির ওপর চোখ পড়ে যায়। গ্রামের শান্ত অন্ধকার রাতে সাতটা থেকে রাত নয়টা পর্যন্ত ওই লেখাটি আমি অনেকবার পড়ি। ইংরেজি ভাষায় লেখা শব্দগুলো যেন আমি বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমার মনে হচ্ছিল আমি ভুল ব্যাখ্যা করছি। এটা হতে পারে না। পড়তে পড়তে আমি কাঁদছিলাম, কারণ আমার ছেলের সঙ্গে লক্ষণগুলো মিলে যাচ্ছিল। ছেলে ঘুমিয়ে পড়ার পর লেখাটি আমি ছেলের বাবাকে দেখালাম। মনে পড়ছে, সেই রাতে আমরা দুজনেই অনেক কান্নার পর রাতের খাবার না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। এম আর খানকে দেখাবার আগে মনে তখনও আশা ছিল- যা পড়েছি সব ভুল। ভুল কি হতে পারে না! ওর অটিজম হতে যাবে কেন! কিন্তু পনেরো দিন পর শিশু বিশেষজ্ঞ ডাক্তার ওকে ভালোভাবে দেখে, সাইকিয়াট্রিস্ট ডা. মল্লিককে রেফার করলেন। তিনি খুব সহজভাবেই বললেন- 'এই বাচ্চাটি আর কথা বলবে না, বিষয়টি মেনে নিতে হবে আপনাদের। ওকে সময় দেবেন। বিহেভিয়ার থেরাপি দেবেন ধৈর্য ধরে। আসলে দুঃখপ্রকাশ করা ছাড়া কিছুই বলার নেই আমার। আপনারা একটা ভয়ানক অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছেন। সে অটিজমে ভুগছে। কেন এই রোগটি হচ্ছে কেউ বলতে পারছে না। চার বছরেই ঠিকঠাক ধরা পড়ে। ছেলে শিশুরাই বেশি আক্রান্ত।'

একটিও আশার কথা নেই। পৃথিবীটা যেন হঠাৎ করে উল্টোপথে ঘুরছে। আমরা টাল সামলাতে পারছিলাম না। অবশ্য তখনও সায়ন্তন ডাক্তারের প্রশ্নের উত্তরে দু-চারটি কথার ঠিক ঠিক উত্তর দিচ্ছিল। ওর নিজের নাম, বাবার নাম, কোনটি কলম, কোনটি চাবি- এসব! কিন্তু ওর আচরণ ছিল প্রচণ্ড জেদি আর অস্থির। ডাক্তারকে সে সহ্যই করতে পারছিল না। ডাক্তারের দিকে না তাকিয়ে, না বসে, দৌড়াতে দৌড়াতে আমাদের হয়রান করে ফেলছিল। সেই রাতটিকেও আমি কোনোদিন ভুলব না। রাত নয়টায় ডাক্তারের চেম্বার থেকে বের হয়ে, রাতে থাকার জন্য আমরা বিয়াম ভবনের দিকে যাচ্ছিলাম। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট মি. ক্লিনটন ঢাকায় এসেছিলেন বলে সে সময় আলোতে সুসজ্জিত ঢাকা শহর। আমাদের অস্তিত্ব বিপন্ন, অসহায় আর বিশাল অন্ধকারের দিকে। আমরা তিনজন একটা রিকশায়, আমি শুধুই কাঁদছিলাম। যেন পৃথিবীর ভেতরের সব যোগাযোগের পথ আমিও হারিয়ে ফেলেছি আমার শিশুটির মতো। কিছুক্ষণ পরেই বজ্রাহত গাছের মতো স্তব্ধ হয়ে রইলাম আমরা দু'জনেই। রিকশাটা যাচ্ছে গন্তব্যের দিকে। ছেলেকে বুকে জড়িয়ে আমি প্রস্তুত হচ্ছি এক নিঃশব্দ লড়াইয়ের জন্য।

শুরু হলো এক আর্শ্চয উন্মাদনার জীবন। আমি ডাক্তারের কথামতো ওকে অনেক সময় দিতে শুরু করলাম। কিন্তু সময় দেওয়ার ক্ষেত্রে যে নির্দিষ্ট পরিকল্পনা, ধৈর্য, শিশুর মনস্তাত্ত্বিক বিকাশ ও চারপাশের সাহায্যকারী পরিবেশ দরকার, তা আমি মোটেও পেলাম না। আমি শিক্ষাজীবনে বিএড এবং এমএড ট্রেনিং করেছিলাম। সেখানে বিহেভিয়ার থেরাপির বিষয়গুলো শেখানো হয়েছিল। আমি আমার মতো করে সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছিলাম। সময়টাকে প্ল্যান করার যত চেষ্টা করতাম, ততই পারিবারিক বাধা আসত। আজ থেকে বাইশ বছর আগে অনেক ডাক্তারই জানতেন না অটিজম নামক অসুখটির কথা। সেখানে আশপাশের মানুষ জানবে কী করে! যেহেতু চাইল্ড সাইকোলজির ওপর আমার পড়াশোনা ছিল, আমি সব বাধা ঠেলেই কাজ করে যাচ্ছিলাম। তখন কোনো স্কুল নেই, কোনো পরামর্শদাতা নেই, কোনো ডাক্তার নেই, কোনো বিশেষ শিক্ষা উপকরণ নেই! নিরূপায়ভাবে অসহায় আমি ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম, মাঝে মাঝে উন্মাদ। সত্যি বলতে কী, একজন ব্যক্তিকেও আমার পাশে পাইনি। যারা অন্তত একবারটি হলেও বোঝার চেষ্টা করেছে মানুষটি এমন করছে কেন! বরং তাদের মনে হলো- আরেকটি সন্তান এলে এই সমস্যার সমাধান হবে। কিন্তু আমি রাজি হলাম না। এদিকে ঢাকা শহরে যত ডাক্তারের সন্ধান পেলাম, সবাইকে দেখানো হলো। কেউ কেউ বললেন ক্যালসিয়ামের অভাবে এটা হতে পারে। যত রকমের পরীক্ষা- নিরীক্ষা ছিল সবই করালাম। এমআরআই করাবার সময় ওকে অনেক কড়া ডোজের ঘুমের ওষুধ দেওয়া হতো। ওর অস্থিরতা এতটাই ছিল যে, সেই ঘুমের ওষুধও বিশ মিনিটের বেশি কাজ করত না।

কিছুদিন পর আমরা চেন্নাই গেলাম। ভেলোরে খ্রিষ্টান মেডিকেল কলেজে ওর সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানো হলো। ওর সঙ্গে সঙ্গে আমরাও সন্তানের বাবা-মা হিসেবে আমদের পরীক্ষা করালাম। থাইরয়েডের কোনো সমস্যা বা আর অন্য কোথাও কোনো সমস্যা আছে কিনা তা পরীক্ষা করে ডাক্তার দেখিয়ে জেনে নিলাম। সেখানের একজন খ্রিষ্টান ডাক্তার আমাকে বললেন, যিশুর নাম করে একটি সেকেন্ড বেবি তুমি নিয়ে নাও। তুমি জীবনটাকে ব্যালেন্স করতে পারবে। তাঁর কথায় এমন কিছু ছিল যে, আমি চুপ করে রইলাম।

সেকেন্ড বেবির আগমনের সঙ্গে সঙ্গে আমার শারীরিক অবস্থা ও সায়ন্তনের সার্বিক অবস্থা আরও খারাপ হতে লাগল। কিন্তু আমার মানসিক শক্তি যেন সব ছাপিয়ে এমন এক দৃঢ়তায় পৌঁছতে লাগল, আমার নিজেকে মনে হতো অতি মানুষ। খুব কঠিন অবস্থার মধ্যে দিন পার করছিলাম। তার চেয়েও কঠিন অবস্থা আমাকে সরাসরি আক্রমণ করল। ২০০১ সালের ইলেকশনের আগে হঠাৎ করেই বদলি শুরু হলো আবার। আমাদের যেতে হবে মহেশখালী। প্রেগন্যান্সি নিয়ে মহেশখালী যাওয়াটা ডাক্তার নিষেধ করলেন।

আমি আমার অসুস্থ শরীর নিয়ে মায়ের বাসায় রইলাম। আমার বুকের ভেতর পাথরচাপা কষ্ট। কিন্তু আমি খুব স্বাভাবিকভাবে দেখে যাচ্ছি চারপাশের জীবন। যেন আমি কেউ নই। কখনও আমি কারোরই ছিলাম না। একের পর এক ধাক্কা খাচ্ছি কিন্তু ভেতরটা যেন ততটাই শক্ত হচ্ছে। মেয়ের এক বছর হলে আমাদের আবার বদলি হলো। আমরা নোয়াখালী সদরে গেলাম। এই বারবার পরিবেশ বদল আমার সন্তানের ওপর খুব খারাপ প্রভাব ফেলল। ততদিনে আমি ঢাকায় একজন ডাক্তারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে চলেছি। ঢাকায় তখন একটিমাত্র অটিস্টিক বাচ্চাদের স্কুল, তিনি আছেন ওই স্কুলে। এক রাতে তিনি ফোন করে জানালেন, তাঁর স্কুলে একটি মাত্র সিট খালি আছে। আমি যদি এখন হ্যাঁ বলি, তাহলে বাচ্চাকে তিনি তাঁর স্কুলে নেবেন। আমি কোনো দ্বিধা না করে হ্যাঁ বললাম এবং শুধু নিজের সাহসের ওপর ভর করে দুটি শিশু নিয়ে একাই ঢাকায় থাকতে শুরু করলাম।

সেইসব জীবনের ভয়াবহ চিত্র সবিস্তারে আমি তুলে ধরতে পারব না। শুধু একটি উদাহরণ দিচ্ছি- একদিন দুপুরে রিকশায় চড়ে ছেলের স্কুল থেকে বাসায় ফিরছি। হঠাৎ পেছন থেকে ধাক্কা। আমার মেয়ে আর আমি রাস্তার ওপর পড়লাম, ছেলে চলন্ত গাড়িগুলোর সামনে দৌড়াচ্ছে। মেয়ের বয়স তখন তিন বছর। আর ছেলে তো আজীবন শিশু।

দম আটকে আসা অভিজ্ঞতার মধ্যে নিয়ত পথ চলা। হাজার পৃষ্ঠা লিখলেও এই লেখা শেষ হবে না। আমি যত খারাপ সময়ের ভেতর দিয়ে গেছি, ততটাই নিজেকে সুগঠিত করার চেষ্টা করেছি। একমাত্র সময়কে ও নিজেকে সুগঠিত করেই এই কঠিন সমস্যার সঙ্গে কিছুটা মানিয়ে নেওয়া যেতে পারে। তাতে কিছুটা স্বস্তি পাওয়া যায়। সমাজ, পরিবার, অটিস্টিক শিশু- এই সবকিছুকে সমন্বয় করে সঠিক পথে চালাতে গেলে কতটা স্ট্রাকচারাল, কঠোর পরিশ্রমী এবং চমৎকার হতে হয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমি দীর্ঘ বছর ধরে রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারিনি। তাই বলে কিছুতেই ভেঙে পড়া চলবে না। আমি আমার ছেলেকে নিয়ে বাংলাদেশের প্রায় সব জায়গায়, এমনকি কক্সবাজার, কুয়াকাটায় বেড়াতে গেছি। শপিং মল, রেস্তোরাঁ, পার্ক কিছুই বাদ দিইনি। এই চ্যালেঞ্জিং শিশুটিকে সঙ্গে নিয়েই আমার লেখার জগৎ, আমার গান, আমার সংসার, আমার বাগান- সব মিলিয়ে আমি। আমি আমার চারপাশের জীবনে এ রকম বাচ্চাদের মাকে সংসার হারাতে দেখেছি, কত গুণবতী মাকে নিজের জীবনের কোনো যত্ন না নিয়ে তিলে তিলে ক্ষয় হতে দেখেছি, বার বার ভেঙে পড়তে দেখেছি। আবার কেউ কেউ সমাজকে উপেক্ষা করে, সব বাধা ঠেলে তার শিশুকে প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছেন। এসব মায়ের প্রতিই আমার শ্রদ্ধা।

হাজারো সংকটের মাঝে নিজেকে কখনও পরাজিত মনে হয়নি, আমার শিশুটির মুখ চেয়ে, তার একটুখানি হাসিই আমার এই বদ্ধ পৃথিবীতে একমাত্র আশ্রয়। সকল সম্পর্কের সূত্র।