কালের খেয়া

কালের খেয়া

'জানা মতে সে খাইতে চায় নাই'

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২০     আপডেট: ২৬ জুন ২০২০

মানস চৌধুরী

'...বিবরণে প্রকাশ আটক করিবার পর রাত্রিবেলা সে খাইতে চাহিয়াছিল। তাহাকে কী খাদ্য সরবরাহ করা হইয়াছিল এবং কী পরিমাণে- তাহার লিখিত কিংবা স্বীকৃত কোনো প্রকার দলিল পাওয়া সম্ভব হয় নাই।...'

এই অবধি লিখেছিল আশিক। এরপর আর সে লিখতে পারেনি, কিংবা সম্ভবত চায়নি। ওর মনে পড়ে সম্পাদকের কথা। মনে পড়ে রিপোর্টিংয়ের ভাষা এ নয়। ও টের পায় একটা নাম না-জানা ক্রোধ ওর শরীরে, কিংবা হয়তো মাথায় ভর করেছে। এ রকম সময়ে লেখা ছেড়ে দিতে হয়। বাইরে গিয়ে হারিয়ে ফেলতে হয় নিজেকে। আর ভুলে যেতে হয় পুরো লেখার সূত্রটাকে। যাতে আবার নতুন করে শুরু করা যায়। আশিকের মাথায় পুরাতন প্রশ্নগুলো নতুন করে দেখা দেয়। পেশাগত নিরপেক্ষতার মানে কী সেই এক বহু পরতের প্রশ্ন আচ্ছন্ন করে রাখে ওকে। একতলা বাসার অন্ধকারে বিকেলের রহস্যময় আলো সামান্য ঢোকে। সে আলোতে আশিকের মন ভরে না। সে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। সিগারেট হাতড়ায় পকেটে। পায় না, কিন্তু নড়ে না। খুঁজতে যায় না টেবিলের ওপর। কিংবা কিনতে বেরোয় না। দাঁড়িয়ে থাকে। চোখ ওর জানালার ওপারে আরেক দেয়ালে টোকা খায়। কোথাও আকাশ নেই। এ রকম নিরাকাশ মনে ওর প্রশ্নগুলোর জবাব দেখা দেয়। সেই জবাব ওকে খুশি করে না। বরং ক্লান্ত করে আরও। তবুও জবাব পাওয়া একরকমের স্বস্তি। ক্লান্তিকর এক স্বস্তি। আশিকের এখন বোধোদয় ঘটতে চলে নিরপেক্ষতার মানে হলো বিযুক্তি। এমত ভাবনায় যখন আসে, অমনি জানালার নিকট দিয়ে উড়ে যায় অস্থির সন্ত্রস্ত এক কাক। কাকের পিছু নিতে ওর চোখ অক্ষম। নিরাকাশ জানালাতে কাকের গতিবিধি ধরা পড়ে না। ঠিক এ রকম সময়েই কাকের গলা শোনা যায়- 'কা, কা' অথবা কাছাকাছি কোনো শব্দ। শুধু আশিকের মন বলল 'কা, কা'।

থানার কাছে আসতেই ওর সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল প্রায়। দরজার কাছে দাঁড়ানো কনস্টেবলের চোখেমুখে পরিস্কার অভিব্যক্তি। আশিককে সে ঢুকতে দিতে চায় না। পকেট থেকে পত্রিকার পরিচয়পত্র বের করে আশিক। সেটা হাতে নেয় কনস্টেবল, কিন্তু তাকিয়ে থাকে আশিকের মুখের দিকে। আশিক জোর করে আবার পত্রিকার নামটা বলে। কনস্টেবল একইভাবে তাকিয়ে থাকে ওর মুখের দিকে। সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে এক দারোগা বারান্দায় আসে। কনস্টেবলের দিকে একবার, আশিকের দিকে একবার তাকিয়ে গলা খেঁকিয়ে বলে- 'ঢোকা'। থানার ভিতরে ঢোকে আশিক। সেই দারোগাই থুতনি বাড়িয়ে চেয়ার দেখিয়ে দিলে বসে পড়ে আশিক। দারোগাও বসে। আশিকের বাঁ পাশেও সাদা পোশাকে আরেকজন বসে পেপার পড়ছে। তার বসার ধরনে আশিকের মনে হয় এই দারোগার পদের কাছাকাছি কেউ। দারোগা সরু চোখে আশিকের দিকে তাকিয়ে থাকে। আশিক কথা হাতড়াতে থাকে। পাশের জন পত্রিকা পড়া বাদ দিয়ে আশিকের দিকে তাকিয়ে থাকে। বেশ কতকক্ষণ আশিককে নিরুপায় অবস্থায় রেখে, একই রকম সরু চোখে, মুখে এক চিলতে হাসি এনে দারোগাই কথা শুরু করে-

'কোন পত্রিকা কইলেন?'

আশিক পত্রিকার নাম বলে। দারোগা আবার জিজ্ঞেস করে-

'কী খবর চান?'

'আয়েনউদ্দিনের মরার খবর।'

'আয়েনউদ্দিন মরছে নাকি?'

এটা বলে পাশের জন। আশিক সেদিকে মুখ ঘোরাতে যাবে, তখন উর্দি-পরা দারোগা বলে-

'আয়েনউদ্দিন কেডা?'

আসলে আয়েনউদ্দিন যে মরেছে সে খবর আনতে বা দিতে আশিক থানায় যায় নাই। আয়েনউদ্দিনের মরার খবর সে পেয়েছিল ঘুম থেকে উঠেই। ছুটা কাজের বুয়া দুই বাসার পর তিন নম্বর বাসা হিসেবে আশিকের মেসে ঢুকে ঘরের ঝাড়ূ হাতে নিয়েই এই সংবাদ দেয়।

'আয়েনউদ্দিন কইলাম মরছে।'

'কখন?' প্রায় ধূসর হয়ে ওঠা বিস্কিট রঙের কম্বলটা এক ঝটকায় সরিয়ে আশিক জিজ্ঞাসা করে।

'ফজরের আজানের এক ঘণ্টা পরে। জায়নামাজও তুলতে পারে নাই।'

'কন কী? নামাজ পরতেছিল?'

'আরে হ্যায় না। হে বেডা নামাজ পরবে ক্যামতে? বেডি পরতে নিছিল। বেহেশত পাইবে গো।'

একটা মাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বুয়া আলাপ শেষ করে। এর বেশি আর বলার দরকার ছিল না তার। আশিক জামা গায়ে লাগাতে লাগাতে বুয়ার হাতে ঘরের তালা ধরিয়ে দেয়। তারপর পাড়ার দোকানে যায় সে।

এটা যে দৈবাৎ আশিক তা জানত। মানে এই যে আয়েনউদ্দিন আর আশিক একই পাড়ায় থাকে। বা দৈবাৎ না। কিন্তু একই পাড়ার আয়েনউদ্দিন যে ফজরের আজানের এক ঘণ্টা পর মরল, আর ঘুম থেকে ভালোমতো উঠবার আগেই আশিক তা জানতে পারল- এটা দৈবাৎ। অন্য এলাকার আয়েনউদ্দিন বা আর কেউ, যদি আগের দিন বাদ-মাগরিবও মরে থাকে সেটা জানা সোজা কাজ নয়। এসব ভাবতে ভাবতে দোকানে যায় আশিক।

দোকানি বরকত তখন চারপায়া দোকানের সামনে পানি ছিটায়। তিনজন দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে বিড়ি ফুঁকতে ফুঁকতে কথাবার্তা বলে। আশিক জানে আয়েনউদ্দিনই বিষয়। দু'জনের গায়ে তেলচিমসা কাঁথা। একজন মাফলার কান পেঁচিয়ে। আশিককে আসতে দেখে সবাই একটা সৌজন্য-বিরতি দেয়। কিংবা আশিকের মনে হয় যে সেটা একটা সৌজন্য-বিরতি ছিল যাতে আশিক এই আলাপে অনায়াসে ঢুকতে পারে। অথবা যাতে আশিকের আলাপ তারা শুনতে পারে। আশিক সে রকম কিছু করল না। দোকানদার আগরবাতি জ্বালিয়েছিল। মোহিনী দরশন আগরবাতির গন্ধে আশিকের খিদের কথা মনে হয়।

তিনবার আশিক দোকানের পাল্লায় সুতলি দিয়ে ঝোলানো কলার কাঁদিতে হাত দেয়। আবার হাত সরিয়ে নেয়। বরকত সেদিকেই তাকিয়ে ছিল।

'ছিঁড়েন। পাকা তো।'

'না। বমি পাইতেছে।'

'রাত্তিরে খাইছেন কিছু?'

'আপনে একটা চা দ্যান। রুটি ভিজায়া খামু।'

'মগে দিম?'

বরকত জিজ্ঞাস করে। অন্য তিনজনের আলাপ তখনও ঝিম মেরে আছে। বা ওদের আলাপ তখন শেষ হয়েই গেছিল।

'রাইতেই না কইলেন হ্যার অবস্থা ভালো ঠেকতেছিল না।' আশিক আয়েনউদ্দিন প্রসঙ্গে ঢোকে।

'কইছি তো ভাই আমরাও।' মাফলার-পরা বলে।

'হে বেডি করবেডা কী?' বরকত বাম-হাতে কেটলির মুখ তুলে ডান হাতে চামচ ঘুটতে ঘুটতে বলে।

আশিক এবড়ো-থেবড়ো বেঞ্চটাতে বসে। ওর পাশে বড় অ্যালুমিনিয়ামের মগে চা। একমনে ও বনরুটি চায়ে ভেজায়। আর সামনে রাস্তায় মাটির দিকে তাকিয়ে থাকে। অর্ধেক খাওয়া বনরুটি ও পাড়ার বন্ধুবৎসল কুকুরটাকে দিয়ে দেয়।

'ঘুমের মইদ্যেই মরছে।' উঠতে উঠতে আশিক জিজ্ঞাস করে। বিশেষ কারও উদ্দেশে না।

'ঘুম কি আইছে নাকি অর? গোঙাইতে গোঙাইতেই মরছে।' একজন কাঁথাওয়ালা বলে।

মেসের কমন রান্নাঘরে ঢুকে আশিক দেখে বুয়া কী রান্না করে গেছে। তারপর কমন হাগাখানায় ঢোকে। কিন্তু হাগে না। হাঁটু-ভাঁজ করে চীনামাটির প্যানের দিকে মুখ করে বসে। তারপর আধখাওয়া বনরুটি আর চা-টুকু বমি করে। এরপর পানি খেয়ে কাগজ-কলম নিয়ে বসে ওর এলোমেলো বিছানার চৌকির ওপর। পাশের ঘরে দু'জন থাকে। তাদের মধ্যে সগির এরই মধ্যে কোথাও বেরিয়ে গেছে। আজাহার এসে ঢোকে।

'শরীল খারাপ করছে নাকি আপনার?'

'না তো।'

'বমি করলেন শোনলাম।'

'হ্যাঁ। আয়েনউদ্দিন মরছে শুনলাম বুয়ার কাছে।'

'আয়েনউদ্দিন মানে পাঁচতলার দারোয়ান?'

এই পাড়ায় পাঁচতলা বাড়ি এখন অন্তত ছয়টা। ছয়তলা একটা। সাড়ে ছয়তলা আরেকখানা। কিন্তু পাঁচতলা বললে সবাই একটা বাড়িই বোঝে। সেটাই এই তল্লাটে প্রথম পাঁচতলা এ রকম একটা প্রচারণা আছে এখানে। তখন থেকে কোনো সংশয় ছাড়াই সবাই ওই বাড়ির নাম পাঁচতলা দিয়েছে। সবাই বলতে চারপায়া দোকানের নিয়মিত খদ্দেররা, বাসায়-বাসায় কাজ করতে-যাওয়া বুয়ারা। আরও আছে। এই গলিটা ধরে দোকানটার পাশ ধরে হেঁটে একটু সামনে গেলেই বিরাট এক ছাবড়া-দেওয়া এলাকা। সরকারের ভাষায় বস্তি। ডেভেলপমেন্টের ভাষায়ও তাই। আগের মোড়টা, যেখানে কয়েকটা পর পর টিনের শাটার লাগানো দোকান আছে, সেখান থেকে ডানে মোড় নিয়েও সেই ছাবড়াতলাতে গিয়ে ওঠা যায়। ওটা একটা খনি। কত জাতের, কত জেলার আর কত পেশার লোক যে ওখানে থাকে তার কোনো হিসাব নাই। আয়েনউদ্দিন থাকত ওখানকারই কোনো একটা ঘরে। কোন ঘরে তা আশিক জানে না। বুয়া জাহেদাও ওখানে কোথাও থাকে। আশিকের জানা নাই সেটাও।

কিন্তু আয়েনউদ্দিনের সঙ্গে আশিকের নিয়মিত দেখা হতো। অফিস থেকে ফিরবার পথে প্রায়ই আশিক অন্য রাস্তা দিয়ে আসে। বরকতের দোকান মাঝেমধ্যেই তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। ঢোকার পথে এক কাপ চা খেয়ে নিতে আর সিগারেট কিনতে অন্য চারপায়া দোকানে সে যায়। সেখান থেকে আসার পথে, বরকতের দোকানের একটু আগেই, পাঁচতলার নিচে টুল নিয়ে বসে আয়েনউদ্দিন। যে দিনগুলোতে আশিক অন্ধকারে ঠিকমতো দেখতে পায় না, কিংবা অন্যমনস্ক থাকে, সেই দিনগুলোতেও আয়েনউদ্দিনই কথা বলে-

' সেলামালেকুম ভাই। অফিস থেকে আসলেন?'

মোটামুটি একই সম্ভাষণ প্রতিদিন। আশিক কখনো কখনো বলে-

'ওলেকুমাসসালাম। ডিউটি?'

এ কথা বলে আশিক। আর হাঁটতে থাকে বাসার দিকে। আর কোনো কোনো দিন কিছু বলে না। হাসে। আর দাঁড়ায়। দাঁড়িয়ে কেবল কিনে আনা সিগারেট পকেট থেকে বের করে। আয়েনউদ্দিনের দিকে একটা বাড়িয়ে দেয়। এদিক-ওদিক তাকিয়ে আয়েনউদ্দিন হাত বাড়িয়ে সেটা নেয়। তারপর বটলগ্রিন জামার পকেটে সেটা রেখে দেয়। রাতে খাবে।

দিনের বেলায় আয়েনউদ্দিন রিকশা চালায়। হরতালের দিনগুলো ছাড়া। আর যেদিন শরীরে কুলায় না সেদিনও কামাই দেয়। রাতের বেলা এই পাঁচতলার দারওয়ান। এই বটলগ্রিন জামাটা এই বাড়ির মালিকই দিয়েছে। আগের রাতে আয়েনউদ্দিনকে সে দেখে নাই। আয়েনউদ্দিনও তাকে অন্ধকারে সালাম দেয় নাই। আশিক সেটা নিয়ে কিছু না-ভেবেই বরকতের দোকানের সামনে চলে এসেছিল। সেখানে এসেই সে শোনে আয়েনউদ্দিনের খবর।

'ভাই আয়েনোদ্দিরে জব্বর পিডা দিছে। চাকরিও ছাড়াই দিছে।' বরকত জানায়।

'ক্যান?'

'কাইল রাতে নাকি চুরি হইছে মালিকের বাসায়।'

'কে চুরি করছে?'

'হেইডা কেউ দ্যাখছে নি?'

'কী চুরি গেছে?'

'জানে কার বালে? সোনার গহনা হোনলাম।'

'আয়েনউদ্দিনকে পিডাইছে ক্যান? আয়েনউদ্দিন বাসার ভিতরে ঢুকবে ক্যামনে?'

'হ্যায় ক্যান ঘুমাইছিল? চোর দ্যাহে নাই ক্যান?'

'হে তো ঘুমায় না। আর চোর ঢুকলে বাসার ভিত্‌রে ঢুকবে ক্যামনে?'

'কথা তো ভাই হেইডাই। চোর কি বেবাত রাস্তাঘাটেই থাকেনি? সোনার মামলা। বুইঝেন কথাডা।'

'টের পাইছে কখন?'

'হেইডা তো ভাই কইতে পারি না। আয়েনোদ্দি ঘুমাইছিল। দুপুর ১২ডা নাহান মোসলেমরে দিয়া ডাইকা নিছে।'

'মোসলেম মানে দোতলার ড্রাইভার?'

'হ। তো আয়েনোদ্দি কইছে খাইয়া আই। হে বেডা জানেও না কারবার কী। মোসলেম কইছে অহনই ল।'

'নিয়া আইসাই পিটাইছে?'

'হ ভাই। মালিকে, মালিকের দুই পোলা। তারপর মোসলেম, মালিকের ড্রাইভার খোরশেদরেও পিডাইতে কইছে।'

'কন কী!'

'আরে ভাই। বাড়িরই ছয়সাত জন। এর মইদ্যে পাড়ার রংবাজরা আইসা পড়ছে। বারো তেরো জনে চাইর ঘণ্টা ধইরা খালি পিডাইল।'

শেষের কথাগুলো একটু নিচু গলায় বলে বরকত।

'তারপর?'

'হ্যার পরে ওরে পুলিশ ডাইকা থানায় দিয়া দিছে।'

'কন কী! আয়েনউদ্দিন কী করল?'

'কী করবে ভাই? পিডানোর পয়লা কইতে নিছিল - আমার প্যাডে খিদা। আমারে মাইরেন না। আমি তো চুরি করি নাই।'

'তারপর?'

'হ্যারপর তো আর হেডাও কইতে পারে না। গোঙাইতে থাকল খালি।'

'কেউ কিচ্ছু কয় নাই?'

'কেডা কইব? কী কইব?'

'পুলিশে কী করল?'

'নিয়া গিয়া আবার পিডাইছে।'

'কন কী? বাঁচব ক্যামনে? এহন কই?'

'বাসায় আনছে। হোনলাম ছাড়ছে। অর বউ মর্জিনা আর দুই-তিনজন গিয়া রিকশায় কইরা নিয়া আসছে।'

মর্জিনাকে আশিক দেখেছে কয়েকবার। ওদের পাশের মেসবাড়িতেই সে রান্না করতে আর ঘর পরিস্কার করতে আসে। আশিক গোঁজ মেরে দাঁড়িয়ে থাকে। ওকে ওভাবে দেখে বরকতই আবার কথা বলে-

'যাবেননি ভাই দ্যাখতে? আমি দোকান বন কইরা যামু। আমার মনে লয় অবস্থা খারাপ দেইখা ছাইড়া দিছে। হোনলাম মালিকে বাদ-মাগরিব থানায় গেছিল।' আবার গলা নামায় বরকত।

'না ভাই। আমার খিদা লাগছে।'

আশিক বাসায় গিয়ে আসলে তেমন খায়নি। কিছু করেওনি। কেবল অনেকক্ষণ ধরে সিগারেট টানছিল শুয়ে শুয়ে। সকালে জাহেদা এসে বকাঝকা করবে বলে রান্নাঘরের পাতিলের খাবার হাগাখানায় ফ্ল্যাশ করে দিয়েছে। তারপর কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়েছে। অনেক শীত করছিল ওর।

সকালে যখন জাহেদা এসে আশিককে সেই খবরটাই দিল যেটাকে ঘুম না-আসার কালে ও সমানে তাড়াচ্ছিল। আশিকের বমি পেয়ে গেছিল। সেই বমি সে গিলে বরকতের দোকানে যায়। আর ফিরে এসে বমি করে ও কাগজ-কলম নিয়ে লিখতে বসে। লেখা শেষ করে অফিস পৌঁছাতে ওর প্রায় সাড়ে এগারোটা বাজে।

বেলা দুটোর কিছুক্ষণ পর বার্তা সম্পাদক তাকে ডাকেন।

'তোমার এবারের স্টোরিও তো একটা যা তা মাল হয়েছে। আমি আর তোমার সঙ্গে কথা বলতে চাই না। এডিটরই তোমার সঙ্গে কথা বলবেন। যাও।'

আশিকের মুখ শুকিয়ে যায়। কোনো কথা না বলে ও সম্পাদকের দরজার দিকে যায়। তাকে দেখে সম্পাদক নিজেই ভিতরে ঢুকতে বলেন। আশিক ঢুকলে তাকে বসতেও বলেন। তারপর তাঁর টেবিলে রাখা ওর লেখাটা ওর দিকে এগিয়ে দিয়ে বলেন-

'এই স্টোরি আজ তুমি নিউজ ডেস্কে দিয়েছ?'

'জি।' মিনমিন করে আশিক বলে।

'এসবের মানে কী?'

'জি। আমি তো এবারে চেষ্টা করেছি।'

'কী হয়েছে তোমার? গলায় আওয়াজ নাই কেন? খাও নাই সকালে?'

'জি আসলে ...'

'একটা হত্যাকা ! এটা কোন ধরনের নাম?' আশিককে থামিয়ে দিয়েই সম্পাদক বলেন।

'কিন্তু আসলেই তো ...'

'না তোমার কাছে এটা কেউ জানতে চায়নি। আর তোমার ব্যাখ্যাও কেউ শুনতে চায়নি। পাড়ার একটা ঘটনা নিয়ে হাজার ওয়ার্ডের একটা স্টোরি বানিয়েছ। তোমার কি মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে নাকি? নিউজ সেকশন তোমার নামে ছয় মাস ধরে একই কমপেল্গন করে যাচ্ছে।'

'কিন্তু আমি তো ...'

'শোনো তুমি আজ অফিস থেকে বাসায় যাও। বিশ্রাম নাও। তোমাকে ভালো দেখায় না। আর এসব হাবিজাবি মনের কথা দিয়ে স্টোরি লেখা বন্ধ করো। বড়জোর লিখতে পারো 'গণপিটুনিতে দারোয়ান নিহত'। আসলে সেটাও লিখতে পারো না। সে তো আর স্পটে মরেনি। নিউজ অ্যাসেস করতে শেখো। যাও এখন।'

সম্পাদকের ঘর থেকে বের হলে বার্তা সম্পাদক জানতে চান- 'কী, কথা হলো?' আশিক মাথা নেড়ে বাসার দিকে রওনা হয়। সায়েম আশিকের সাথেই এই পত্রিকায় ঢুকেছে, দূর থেকে তাকিয়ে আছে আশিকের দিকেই। আশিক বুঝল সায়েম জানতে চায়। বার্তা সম্পাদকের কাছ থেকে সে সায়েমের ডেস্কেই যায়। কথা কিছু বলে না। শুধু বলে- 'বাসায় যাই রে। শরীরটা ভালো না।' সায়েমও আর কিছু জিজ্ঞেস করে না।

দুপুরে খায়নি। বাসায় ঢুকেই সে রান্নাঘরে ঢুকে পেল্গটে খাবার বাড়ে। ভীষণ গা গুলাতে শুরু করে তার। আর শীত শীত লাগাটা বাড়েই। আধাটা খেয়ে সে আবার হাগাখানায় ঢালে। তারপর লিখতে বসে। মাঝপথে লেখা পছন্দ না হলে কাগজটা রেখে জানালার ধারে দাঁড়ায়। তারপর থানায় যায়। থানায় তার কথাবার্তা বিশেষ হয় না। ফিরবার পথে আশিকের মনে হয় কাঁপুনি দিয়ে জ্বর আসছে। কিন্তু লিখবার অদম্য এক ইচ্ছে তখন ভর করেছে ওকে।

সম্পাদক তখন শতব্যস্ততার মধ্যেও আশিকের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবছেন। একটা চিঠির খসড়া তড়িঘড়ি তিনি টাইপ করে প্রিন্ট করেছেন। আশিককে তিন মাসের বিনা বেতন ছুটি মঞ্জুর করেছেন তিনি। এবং আশা করেছেন যে এর মধ্যেই আশিক মানসিকভাবে গুছিয়ে উঠতে পারবে।

সায়েম তখন অফিসের টিঅ্যান্ডটি ফোন থেকে আশিকের ৩০০ টাকার প্রি-পেইডে ফোন লাগায়। আর আশিক কম্বল মুড়ি দিয়ে লিখছিল। নতুন করে যেভাবে লেখে তার শিরোনাম দেয় 'জানা মতে সে খাইতে চায় নাই'। কম্বল সরিয়ে ড্রয়ার থেকে স্ট্যাপলার বের করে পিন মারতে যাবে, এমন সময় তার মোবাইল বাজে। পিনটা মারা শেষ করে সে ফোন ধরে-

'তরে ছাটাই করছে। তর আর অফিসে আইসা কাম নাই। আমি যাওয়ার পথে আমু নে।'



ফোন রেখে আবার আশিক হাগাখানায় দৌড় লাগায়, কম্বল গায়ে জড়িয়েই। এ দফা বুয়ার মাছের চচ্চড়ি আর ভাত বমি করতে।