কালের খেয়া

কালের খেয়া

প্রচ্ছদ

মাছির মন নিয়া, নূহের নৌকায়

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২০     আপডেট: ১৯ জুন ২০২০

শোয়াইব জিবরান

মহাপ্লাবনের সে গল্পটি ছড়িয়ে আছে মেসোপটেমিয়ার, গ্রেকো-রোমান, ইনকা, সিন্ধু সভ্যতার প্রাচীন গ্রন্থগুলোতে। গল্পগুলোতে সে মহাদুর্যোগ নেমে আসার আগের দিনগুলো কতই না অপেক্ষার আতঙ্কে ঠাসা। মেসোপটেমিয়ার গল্পে সে অপেক্ষার প্রহর সাত দিনের। তারা নৌকা বানিয়ে আতঙ্ক নিয়ে অপেক্ষা করেছে সে মহাপ্লাবনের। শৈশবে আমরা যেমন অপেক্ষা করতাম বন্যা বা ঝড়ের। গ্রামের প্রাচীন পুরুষেরা সংবাদ দিতেন পশ্চিমের ধলাই নদী পাহাড়ি বানের জলে ভরে উঠেছে। তীর ছাপিয়ে যাচ্ছে। বন্যা আসছে। মহাবন্যা। সব ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। আমরা ভয়ে সে দিকে তাকাতাম। নদীটি দেখা যেত না। তার ওপারের পাহাড়ের নীল আভা দেখা যেত। মনে ভাবতাম আহা সে পাহাড়ে যদি আগে চড়া যেত! ঘুমের ভেতরও বন্যার পানির শব্দ শুনতে পেতাম। আমাদের সে নীল পাহাড়ে পালিয়ে যাওয়ার আগেই একদিন ভোরে চরাচর ডুবিয়ে বন্যা আসত। ভোরে আতঙ্ক নিয়ে পথঘাট ডুবে যাওয়া করাল বানের পানি দেখতাম।

নূহের বন্যার হাজার হাজার বছর পর অমনি এক মহাপ্লাবনের সংবাদ আসতে থাকল। শোনা গেল দূর চীন থেকে সে মহাপ্লাবন ধেয়ে আসছে। জলের নয়, জীবাণুর। মহামারির। দেখতে না দেখতে সে জীবাণুর ঢেউ পশ্চিমে ছড়িয়ে গেল। আমেরিকা, স্পেন, ইতালি, ফ্রান্স, ইংল্যান্ডে। মানুষ মরতে শুরু করল দম বন্ধ হয়ে। চিকিৎসকরা বললেন, মরার সময় নাকি মানুষের জলে ডুবে যাওয়ার অনুভূতি হয়। সে কি ভয়াবহ দৃশ্য সব ফুসফুসে একটুখানি বাতাস টেনে নেবার যুদ্ধের। নূহের মতো বিশ্বাসীরা বলল, এখুনি সব গুটাও। তোমাদের মানুষদের ঘরে তোলো। লুকাও লুকাও। নূহের পুত্রটির মতো রাজারা অবিশ্বাস করলেন। হেসে উড়িয়ে দিলেন প্রথমত। তারপর সে নীল মৃত্যু সত্যি সত্যি আমাদের দুয়ারেও এলো। আমরা ঘরে ফিরলাম। আমিও নূহের নৌকা আকারের বৃহৎ এক ভবনের ছোট্ট কুঠুরিতে নিজেকে লুকালাম, ছাও বাচ্চা নিয়া। তারপর শুরু হলো এক বিপন্ন সময় যাত্রা। ধবল চাকুরি-বাকুরি, লাল-নীল সংসারের চিরচেনা রূপ হঠাৎই বদলে গেল।

এক সময় খুব সাধ হতো। আহা যদি একটি অমন জীবন পাওয়া যেত- যেখানে একটুখানি চালের জন্য, নুনের জন্য, একটুখানি জীবনযাপনের জন্য দৌড়াতে হবে না সকাল থেকে রাত্রি অবধি, ধুলো রক্তমাখা পায়। কেমন হতো যদি সারাটি দিন, সারাটি সপ্তাহ, সারাটি মাস শুধু ঘুমিয়েই কাটিয়ে দিতে পারতাম! কেমন আরামভরা সে জীবন হতো! অখণ্ড অবসরের! হুম একমাত্র মৃত্যুর মাধ্যমেই সে জীবন পাওয়া সম্ভব। অনন্ত ঘুমের। এক সময় সে স্বপ্নের কথা ভেবে নিজের এপিটাফও রচনা করেছিলাম-

এইখানে ঘুমিয়ে আছেন একজন ঘুমকাতুরে

তাকে ঘুমুতে দাও

নিজের ছেলেমেয়েকে ডেকে বলেছিলাম- এই এপিটাফটি আমার মৃত্যুর পর সাদা মার্বেল পাথরের ওপর নীল অক্ষরে লিখে কবরের দেয়ালে সেঁটে দিও। অমনই ঘুমকাতুরে ছুটির দিনে বউ দুপুরে ঘুম থেকে তুলতে শঙ্খ ঘোষের কবিতার সুরে বলতে হতো- ওঠো বাবু কুম্ভকর্ণ বাজারেতে যাও।

সে দিন সত্যিই চলে এলো। অফুরন্ত ছুটি। কোথাও যাওয়ার নেই, কিচ্ছু করার নেই। এক সময় মনে হলো এই তো সময়, সে লেখাটি লিখে ফেলার। সে লেখাটি মাথায় নিয়ে গত অনেকগুলো বৎসর ঘুরছি। পড়েছি, নোট নিয়েছি, জাহাজের মতো ম্যাপ করে কাঠামো সাজিয়েছি। কিন্তু অখণ্ড সময়ের অভাবে লেখা হয়ে ওঠেনি। এই তো সেই অখণ্ড সময়। লিখে ফেলব এই উপমহাদেশের শিক্ষার ইতিহাস গ্রন্থটিও। কত কত কিতাব আর তথ্য জড়ো করেছি। লিখে ফেলব সেই দীর্ঘ কবিতাটিও যার প্রথম পঙ্‌ক্তিটি ভারতের দামোদর নদী পার হতে লিখেছিলাম। লিখেছিলাম বিদ্যাসাগরের মায়ের জন্য সে নদীটি গভীর রাত্রিতে পারের স্মৃতি মাথায় রেখে। বিদ্যাসাগরের মাতৃভক্তির অনুষঙ্গে পৃথিবীর সকল শেখ ফরিদের মর্ম হাহাকার কবিতায় উঠে আসবে বৃহৎ ব্যঞ্জনায়।

হুম। এই সে মাহেন্দ্রক্ষণ। সব লিখে ফেলার সময়। কম্পিউটারে এই এই নামে ওয়ার্ড ফাইল খোলা হলো। এই তো লিখতে শুরু করব এক এক করে আগামীকাল থেকেই। এই লেখাগুলোই হবে এই মহামারির ভেতর সেই অমরত্বের সাধনা।

২.

পরদিন ঘুম থেকেই উঠে আর লিখতে বসা হয় না। তবু বসি। বসে ওয়ার্ড ফাইল খুলি। কিন্তু সেখানে আর লেখা হয় না। বদলে এই স্ট্ক্রিনে খোলা হয় ফেসবুক। খোলা হয় মেসেঞ্জার। আরও আরও অ্যাপ। বহু বছর আগে যে সুন্দরীর সঙ্গে চ্যাট হয়েছিল তাকেই নক করে বসি। পা ডুবাতে থাকি তার পাঁকে। না বেশিক্ষণ ভালো লাগে না এ মাদকতা। ফিরে আসি আবার লেখার ফাইলে। না। লেখা হয় না। পুরোনো ড্রাইভগুলোর অলিগলিতে ঢুঁ মারতে থাকি। অনেক অনেক পুরোনো টুকরো টুকরো লেখা পাই, ছবি পাই। সেগুলো কপি করে যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে পেস্ট করতে থাকি। অর্থহীন। গুগল সার্চ বক্সে লিখি দ্য হিস্টরি অব প্যানডেমিকস। পড়ি শতকে শতকে কত কত নামের মহামারি প্লাবনে মানুষের দলে দলে মরে যাওয়ার বর্ণনাগুলো। না। সেখানেও মন বসে না। এভাবেই চলে। পরদিন সকালে নাশতা করতে বসি। চিড়া আর আম। সঙ্গে মধু লেবুর রসের মহামারির পথ্যপানীয়। আর তখনই কোত্থেকে উড়ে টেবিলে একটি ধাড়ি মাছি আসে। প্রথমে সে মধুর কৌটার মুখে বসে। কিন্তু ক্ষণমাত্র সে বসা। তারপর উড়ে গিয়ে বসে আমের পরিত্যক্ত খোসার ময়লার ওপর। আবার ফিরে আসে। মধুতে বসে। আবার ময়লায় বসে। কিন্তু তার বসা হয় না- না ময়লায়, না মধুতে। আমি উঠে গিয়ে বিছানা ঝাড়ার ঝাড়ূটি আনি। আর মধু ও ময়লাতে উড়তে থাকা সে মাছিটি আচমকা আক্রমণ করি। মাছির মৃতদেহটি ছিটকে গিয়ে টেবিলের একপাশে পড়ে। আমি নিশ্চিতে আবার খেতে বসি। খেতে খেতে মনে হয় মাছিটি নিশ্চয়ই এই ফাঁকে আমার খাবারেও বসেছে। ঘেন্নায় আর খাওয়া হয় না। আর তখনই বোধটি জাগে- আমি মাছিটির আত্মা গিলে বসে আছি। মাছি আত্মার মানুষে রূপান্তরিত হয়েছি।

৩.

অখনে দিনের তাজা পত্রিকাগুলো দিনে পড়া হয় না। কমপক্ষে একদিনের বাসি করে তবে পড়তে হয়। আমাদের সন্দেহ কাগজের মাধ্যমেও করোনা মহামারির জীবাণু ছড়াতে পারে। ফলত তাজা পত্রিকাটিকে আলাদা টিস্যু পেপার দিয়ে ধরে প্রথমত বারান্দার কড়া রোদে ফেলে রাখা হয়। পুরোদিন। রাত্রির অন্ধকারেও সে সেখানে পড়ে থাকে বুকে কত তাজা খবর নিয়া। পরদিন বিকেলে তাকে অ্যালকোহল মেশানো টিস্যু দিয়ে মুছে তবে পড়া হয়।

আর আর যা কিছু আসে, সবকিছুকেই বাসি করে নিতে হয়। বাজার থেকে টাটকা শাকসবজি এলে প্রথমেই তাকে সাবানপানিতে চুবিতে নিয়ে সচল জলের ধারায় ধুয়ে নেওয়া হয়। তারপর ফেলে রাখা হয় ঘরের এক কোণে। শুকোনো অবধি। ততক্ষণে সে বাসি হয়ে আসে। সে বাসি সবজি রান্না হয়। আমরা মাছির মন নিয়ে খাই। খাবারেও মন বসে না। একদিন এক পুরোনো ছাত্র ফোন তার শিক্ষককে চমকে দেওয়ার জন্য লিচু নিয়ে বাসার নিচে চলে আসে। ফোন দিয়ে বলে, স্যার আমি রাজউক কলেজের সেই ছাত্র যার কাছ থেকে মহাবর্গ বইটি নিয়েছিলেন। আমি বড়ূয়া। আমার খুব ইচ্ছে হয় তাকে বাসায় ডেকে এনে মুখখানা দেখি। একটু পিঠ চাপড়ে দিই- সেই কিশোর বয়সে যেমন দিতাম। কিন্তু মাছিমন সাহস দেয় না। তবু বলি, উপরে আসো। সে বলে না স্যার। সেটা ঠিক হবে না। করোনা কমুক আসব স্যার। আমার তার বাসিমুখ মনে পড়ে। সে লিচু, যার প্রতিটিতে শিষ্যের ভালোবাসা জড়িয়ে আছে তা সঙ্গে সঙ্গে ছুতে পারি না। সাবান ফেনায় ধুয়ে বাসার কোনায় ফেলে রাখতে হয় বাসি হওয়ার জন্য। ততদিনে তার চামড়া লাল থেকে কাল হয়ে যায়। কোনো কোনোটিতে পচন ধরে। আমরা মাছির মন নিয়ে সে বাসি করা ফল কতকটা খাই।

এর ভেতরই ঈদ আসে। আমরা ছোটবেলায় ঈদের দিন নতুন টাকার নোট পেতাম। সে চকচকে নোটগুলো সারক্ষণ ছুঁয়ে দেখতাম। ঘ্রাণ নিতাম। ছেলেমেয়েকে সেই নতুন নোটই দেই। কিন্তু ভয় দেখিয়ে। খবরদার নাকেমুখে নেবে না। হাতে রাখার দরকার নেই। এ এক হাস্যকর প্রায় অমূলক, কিন্তু অবশ্যম্ভাবী ভীতি। এড়ানো যায় না। তাড়া করে সবকিছুতে। মাছিকে যেমন তাড়া করে মৃত্যুভীতি। আত্মরক্ষার জন্যই কিছুর ওপর সে বেশিক্ষণ থাকে না। বসে না।

এই মৃত্যুর মিছিলের দিনে মৃত্যু নিয়েও ভাবি। সবাই বলছে এই মহামারিতে সবাই মরবে না। কিন্তু যাদের বুকের পুরোনো রোগ আছে তারা অল্পতেই মরবে। শুধু এই তথ্যে যেন পুরোনো রোগটি ফিরে আসে। ওষুধ খাওয়া শুরু করি কিন্তু সামলানো কঠিন হয়। এক শ্বাসকষ্টের রাতে আকাশে মস্ত চাঁদ ওঠে উত্তরার বাংলাদেশ মেডিকেল ভবনের ছাদ বেয়ে। তার তীব্র আলো যেন রাতের সূর্য থেকে সে ঠিকরে পড়ছে। জানালা দিয়ে বিছানা ভেসে যায়। আমি সারা শরীর ভরে মাখতে থাকি। যেনবা জ্যোৎস্নায়ও এই মহামারির পথ্য ভিটামিন-ডি আছে। মৃত্যুচিন্তা চেপে বসে। সবাই ঘুমিয়ে আর আমি জেগে জেগে ভাবি, মৃত্যু যদি অখনে অমনি আসে। তবে তো চুপি চুপি চলে যাব। পাশের প্রিয় মানুষটিও জানবে না। কিন্তু পরক্ষণেই যেন এই মৃত্যুচিন্তা উবে যায়। ভাবি এই চাঁদ আমার দুইশত পূর্বপুরুষ আগের মানুষেরাও দেখেছেন। একই চাঁদ। তার নিচেই মরেছেন। চাঁদ তেমনি আছে। মৃত্যু অমোঘ। হবেই। আর আমি এই করোনার শ্বাসকষ্টে জলে ডোবার অনুভূতি নিয়ে মৃত্যুকে ভয় পাচ্ছি কেন। আমার মৃত্যু হলে তো বুকের এই শ্বাসকষ্টের রোগেই হবে। শ্বাস নেওয়ার কষ্ট পেতে পেতেই আর কটা বছর পরই হয়তো মৃত্যু হবে। সে ভোগান্তি মৃত্যু যন্ত্রণা তো আরও দীর্ঘ হতে পারে। মৃত্যুচিন্তায় আর মন বসে থাকে না। আমি উঠে বসি। এক সময় ঘোরের ভেতর গিয়ে ল্যাপটপের এমএস ওয়ার্ড ফাইল খুলে বসি। আমি লিখতে শুরু করি- চৈত্রের সেই শেষ রাতের গল্প যে রাতে আমি জন্মগ্রহণ করেছিলাম। মায়ের মুখে বহুবার শোনা সে গল্প। আমি আমার মায়ের ভেতর থেকে আবার জন্মলাভ করতে শুরু করি। নতুন জন্ম। এই জ্যোৎস্নাভরা রাতে। কিন্তু জন্মের গল্প বেশিক্ষণ আগায় না। অস্থির হয়ে গিয়ে আবার বারান্দায় দাঁড়াই। চাঁদটিকে আবার দেখি। মনে হয় পূর্ব পুরুষদের কথা। মৃত মায়ের কথা। তারাও তো এই অমনি চাঁদটিকে দেখে গেছেন। এক সময় মনে হয় এই চাঁদটিও তো অমর নয়। সূর্য ঠাণ্ডা হয়ে এলে সেও মরে যাবে। আবার পরমশূন্য হয়ে যাবে। শূন্য থেকে যা কিছু সৃষ্টি হয়েছিল। সকল সৃষ্টি কি তবে লয় হয়ে যাবে? পরমশূন্যতায় হারিয়ে যাবে? তারপর আবার কি সব শুরু হবে? শূন্য থেকে মহাশূন্য, আবার এই পৃথিবীর? তখনে কি এই আমার হাহাকার আমার আরেক সত্তার ভেতর ফিরে আসবে। আমার এই আর্তনাদের কালো কালো অক্ষরগুলো ফের ফিরে আসবে। পরম শূন্যতায় হারাবে না কিছুই? হারায় না কিছুই? সৃষ্টির শুধু রূপান্তর ঘটবে? সৃষ্টি অবিনশ্বর?

আমার মাছির অস্থির মনটি জ্যোৎস্নার মহাপ্লাবনের ভেতর ভেসে ওঠা এই নূহের নৌকার মতো বাড়িটির ভেতর এক স্থির বিশ্বাসে যেন স্থিত হয়। আমরা হারাবো না, আমাদের হারানোর উপায় নেই। নতুন নতুন রূপে ফিরে আসব বার বার, অবিনশ্বর।