কালের খেয়া

কালের খেয়া


প্রিয় না থাকাগুলি

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২০     আপডেট: ১৯ জুন ২০২০      

সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম

মাত্র কয়েক মাসেই বিশ্বের ও বাংলাদেশের স্বাস্থ্য এবং অর্থনীতির মানচিত্র যে একেবারে পাল্টে গেল, সংস্কৃতির ছবিটাও করোনাজীবাণুর আঁচড়ে এভাবে ক্ষতবিক্ষত হলো, ভাবতেও চিন্তায় জট লেগে যায়। অতিমারি-মহামারি আগেও হয়েছে, স্বাস্থ্যসেবা এবং ব্যবসা-বাণিজ্যে ধস নেমেছে, কিন্তু সংস্কৃতিকেও এভাবে একটা যুদ্ধের মাঠে কখনও নেমে পড়তে হয়নি, যে যুদ্ধে লড়াই করার মতো অস্ত্র তার হাতে নেই। গত ক'মাস থেকে দেখছি, আমাদের (এবং বড় অর্থে মানবসমাজের) সংস্কৃতির যেসব মূল্যবোধ শিক্ষা দেয়, সেসব স্বতঃস্ম্ফূর্তরা এবং উদযাপন-কৃত্যকে মৌলিক বলে ধরে নেয়, সেসবকেই এই মহামারি পাল্টে দিচ্ছে। আমাদের ঈদে-পূজা-পার্বণে, নববর্ষে, নবান্ন উৎসবে আমরা প্রাণের সঙ্গে প্রাণ মিলাই, একে অপরকে আলিঙ্গন করি, হাতে হাত রাখি, অথচ মহামারির প্রতিদিন আমরা চিৎকার শুনছি, 'দূরে থাকো' 'মুখ ঢেকে রাখো'। প্রতিবেশী এখন অবাঞ্ছিত, আত্মীয় যত দূরে যাবেন, ততই প্রশংসিত। এখন মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেনকে রাখতে হবে তিন হাত দূরে মুখোশ পরিয়ে, তার অন্ধকার বিদিশার মতো চুল ঢেকে রাখবে সুরক্ষা কেশজাল। সংস্কৃতি বলছে একতাই বল, মহামারি বলছে, এই বল নিতান্তই দুর্বলের, এটি চুপসে যেতে থাকা ফুসফুসে একটুখানি বাতাসও ছোঁয়াতে পারবে না। গান বলছে, একটুকু ছে?াঁয়া লাগলে মনে মনে রচি ফাল্কগ্দুনী, করোনাদানব বলছে, বটে! কিন্তু কুড়ি সেকেন্ড ধরে সাবান দিয়ে হাত না ধুয়ে এলে এই ছাঁয়ায় প্রিয়জনকে 'মরণের মুখে রেখে দূরে যাও দূরে যাও চলে।' অসুখ হলে রবীন্দ্রনাথও নিশ্চয় আশা করতেন, মা এসে মাথায় একটু জলপট্টি দেবেন, একটুখানি হাত রাখবেন। ডেঙ্গু-অথবা ডেঙ্গি-যখন পরাক্রমের সঙ্গে কাস্তে চালাচ্ছে গেল বছর, এক হাসপাতালে গিয়ে দেখি ম্রিয়মাণ সন্তানকে বুকে জড়িয়ে নীরব প্রার্থনায় চোখ বন্ধ করেছেন মা। এখন মাকে করোনাদানব অধিকার করে নিলে সন্তান একশ হাত দূরে সরে যাবে।

সংস্কৃতির ভালোর সঙ্গে, যেসব ক্ষতকে সংস্কৃতি সারায়, সারাতে সারাতে স্বাস্থ্যের অঞ্চলে নিয়ে ফেলে- অথবা ফেলতে পারে, সে রকমই আমরা ভাবি- সেসবের রূপান্তর অথবা জেগে ওঠাকেও আমাদের দেখতে হচ্ছে।

সংস্কৃতি আমাদের যে পরার্থপরতা শেখায়, মহামারি তাকে জাগাচ্ছে; আবার স্বার্থপরতাকে আরও কুশ্রী চোহারায় সামনে নিয়ে আসছে। করোনাভীতি জয় করে মৃতের সৎকার করছেন কৃতসংকল্প অনেক তরুণ, অথচ করোনায় মৃত বাবাকে হাসপাতালে রেখে বাড়ি ফিরে গেছে দুই সন্তান, তারাও তরুণ। ভালোমন্দের, শুভ-অশুভের এই দ্বৈরথ চিরকালই ছিল, থাকবেও; কিন্তু সংস্কৃতির ভেতরের শক্তি ও সৌন্দর্যবোধ, তা চেষ্টা করছিল যুদ্ধটাকে অশুভের সঙ্গে অসম করতে। এখন, করোনাউত্তর পৃথিবীতে কোন রথের চূড়ায় উড়বে বিজয় কেতন, কে জানে!

এই ছ'মাস আগেও তো আমরা সংস্কৃতির ভালো চর্চাগুলিকে বর্ম হিসেবে পরতে দেখেছি সমাজের কিছু মানুষকে। সেই অংশটি কি এখন আইসোলেশনে, স্বেচ্ছাবন্দিত্বে? তা না হলে গরিবের ত্রাণ কীভাবে লোপাট হয় এবং লোপাটকারী ওপর মহল থেকে কিছু মৃদু তিরস্কারটা শুধু শোনে, তাতে তার লোপাটের ভাগে হয়তো কিছু টান পড়ে, কিন্তু সে হাসতে হাসতে আরও লোপাট কাজে যায়, আর আর্তের কান্নায় আকাশ ভারি হয়? পোষাকপতিদের মন পড়ে থাকে- না, বিপন্ন শ্রমিকদের অন্ধকার ভবিষ্যৎ চিত্রে নয়, মোটেও নয়, পড়ে থাকে- তাদের লাভের অঙ্কে কিছু লালকালির দাগ যে পড়ছে, সেই দাগগুলিকে যেভাবে হোক মুছে দিতে।

একজন শিক্ষক হিসেবে আমার একটা আশার জায়গা ছিল ভালোর হার না মানার, সম্ভাবনার আলোটা জ্বালিয়ে রাখার, শক্তিতে। মহামারি শুরু হলে আমি বুঝে নিয়েছিলাম, বিশ্বের মতো আমরাও আর আগের অবস্থানে থাকতে পারব না, বিরাট পরিবর্তন হবে অবস্থানের দুটি সম্ভাবনা তখন সামনে ছিল (একটি অবশ্য শঙ্কা) : এক, বিশ্বটা আরও মানবিক হবে, সাম্যের পথে হাঁটবে- যেহেতু মহামারি আমাদের শিখিয়েছে, যতই শক্তিশালী হই আমরা বিত্তের পাহাড়ে চড়ে থাকি, করোনাদানবের কাছে আমরা শুধুই নির্দয় পরিসংখ্যান এবং আমাদের যতই দূরে থাকার কথা বলুন বিশেষজ্ঞরা, একজন আরেকজনের, এক দেশ আরেক দেশের পাশে বা দাঁড়ালে ক্ষতি হবে সবার। অথবা দুই. বিশ্বটা রূপান্তরিত হবে ডারউইনীয় এক যুদ্ধক্ষেত্রে, যেখানে সবচেয়ে সক্ষমেরাই বেঁচে থাকবে। অবস্থাদৃষ্টে এ রকম মনে হওয়াতে ভুল নেই যে, দ্বিতীয় সম্ভাবনার-অথবা শঙ্কার দিকেই আমরা এগোচ্ছি। আমাদের দেশেও ডারউইনীয় লড়াই যে শুরু হয়ে গেছে, তার লক্ষণ তো চারদিকেই। টাকা থাকলে প্রতিহিংসার গুলি ছুড়ে, আইনকে পায়ে দলে উঁচু মহলের অনুমতি নিয়ে বিমানে চড়ে বিদেশ চলে যাওয়া যায়! শিল্পমালিকরা দুই শতাংশ সুদে প্রণোদনা ঋণ পান (যা ফেরত পাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শূন্যের কোঠায়), সেখানে কৃষকদের সুদ গুনতে হয় চার শতাংশ।

অনেক আগে দুই পরিবারের দ্বন্দ্বে শুভ নামের এক স্কুলছাত্র হারিয়ে গেলে সংবাদ সাময়িকীতে একটা কবিতা চোখে পড়েছিল, 'শুভ হারিয়ে গেছে'।

শুভ কি হারিয়ে গেল? না থাকার দলে চলে গেল?

প্রিয় না থাকাগুলি, অনুপস্থিতির, একটা তালিকা করলে, শুভ হারানোর বেদনাটা সবচেয়ে প্রবল হয়ে যাচ্ছে। আমরা যারা শিক্ষকতা অথবা লেখালেখি করি, সংবাদের পেছনে ছুটি, সংস্কৃতিকে জীবনের সঙ্গে মেলাই, শুভকে আমরা একটা অনুপ্রেরণা হিসেবে পাই। জননেতা মণি সিংহ বলতেন, রাজনীতির কাজ শুধু সাম্য প্রতিষ্ঠা নয়, সাম্যের সঙ্গে শুভের অধিষ্ঠানও। এখন রাজনীতিতে দুটিই অনুপস্থিত, কিন্তু এগুলো যেহেতু রাজনীতিবিদদের প্রিয় আর নেই, তারা এ নিয়ে কষ্টও পান না। থাক তাদের কথা। কিন্তু আমরা যারা শুভকে চাই, তারা রাজনীতিতেও তাকে চাই।

সংবাদ সাময়িকীর সেই কবিতার শুভ ছ'মাস পর পুলিশি তৎপরতায় উদ্ধার হয়ে ফিরে এসেছিল। মহামারি-উত্তর বাংলাদেশে শুভকে যে উদ্ধার করবে তেমন মানুষ কই?

হতাশা শব্দটাতে আশা মিশে আছে। আমার আশা, মহামারিকালে দেখা বাঁশিওয়ালা ওই কিছু তরুণ। তাদের বাঁশির ডাকে এক দিন হয়তো অসংখ্য তরুণ বেরিয়ে আসবে- কিন্তু তারা নিয়তির নদীতে ঝাঁপ দিতে যাবে না, যাবে ডারউইনীয় যুদ্ধ ময়দানে লড়তে, শুভের পক্ষে।

প্রিয় না থাকাগুলি আর কী কী? অনেক মানুষের মুখের অমলিন প্রাণময়, অবারণ, অন্তরঙ্গ হাসি। প্রতিদিন সকালে ক্লাসে যাবার জন্য রাস্তায় নামলে প্রথমেই দেখা হতো ফুটপাতে বসা এক মুচির সঙ্গে। মাঝবয়সী, চুলে পাক ধরেছে। একটি মেয়ে তার পড়ে দশম শ্রেণিতে, একটি ছেলে পড়ে মাদ্রাসায়। আমাকে দেখে তিনি হাসতেন। 'কেমন আছেন স্যার?' তিনি জিজ্ঞেস করতেন। কোনো কারণ নেই, তার খদ্দের তো আমি কালেভদ্রে, তার পরও। মহামারি তাকে প্রথমেই ভাসিয়ে নিয়ে গেছে। আরও একটু এগোলে বড় রাস্তার পাশে চওড়া ফুটপাতের গা-ঘেঁষে পরোটা ডিম আর চা দিয়ে সাজানো সকালের নাশতা বেঞ্চে বসা লোকজনকে পরিবেশন করতে করতে একটি মেয়ে আমাকে দেখলে হেসে সালাম দিত। 'ভালো আছেন স্যার?' সে জিজ্ঞেস করত। কোনো কারণ নেই তার আমাকে সৌজন্য দেখানোর, কিন্তু প্রতিদিন আমাকে দেখে নিশ্চয় তার আপন মনে পড়েছে। আমিও হেসে তার কুশল জিজ্ঞেস করতাম। তারপর আমি এগুতাম, সেও তার মহাব্যস্ততায় ফিরে যেত, কিন্তু সকালটা আমার সুন্দর হয়ে যেত। তারপর যখন ক্লাসে পৌঁছাতাম, ছেলেমেয়েগুলির সপ্রাণ হাসি আর কথা আমাকে মনে করিয়ে দিত জীবনটাকে আমরা যতই অসুন্দর করে ফেলি না কেন, সুন্দর জেগে আছে।

যেই ব্যস্ত মেয়েটি, যে হয়তো তার পরিশ্রমে একটা পরিবারকে টিকিয়ে রেখেছিল, সেও ভেসে গেছে। যে ছেলেমেয়েগুলি তাদের হাসি দিয়ে আমার দিনটার একটা ভালো শুরু করে দিত, তাদের ক'জনও প্রিয়জন হারিয়েছে। আমার ভয়, তাদের হাসি হয়তো না-থাকার দলে চলে যাবে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্র, সরকার এবং দেশ চালায় সেসব প্রতিষ্ঠান, তারা সবাই সহজ পথের যাত্রী। দেশের সংকটে, দুর্যোগে, বিপাকে যখন মানুষ এক হয়, অথবা কোনো অন্যায় বা অবিচারের প্রতিবাদে একটা মঞ্চে জড়ো হয়, তখন এরা নিষ্পেষণের সহজ পথে যায়, আলোচনার, কথোপকথনের কঠিন কিন্তু সভ্য এবং সমাধানমুখী পথে যায় না। গণজাগরণ মঞ্চ থেকে নিয়ে রাষ্ট্রের মেরামতের দাবিতে পথে নামা স্কুলছাত্রদের বিশাল মঞ্চ আমাকে আশা দিত, তারা আমাদের মহৎ আন্দোলনগুলির-বাহান্না থেকে নিয়ে একাত্তরের- উত্তরাধিকার ধরে রেখেছে। যখন পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিসত্তাগুলির ওপর রাষ্ট্রের নিপীড়ন চলেছে, সারাদেশে তরুণরা প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছে। কিন্তু অনেক দিন মাস গেল, অনেক অন্যায় হলো, লুটপাট হলো, কালাকানুনের নির্দয় ব্যবস্থার হলো, কিন্তু নতুন কোনো মঞ্চ তৈরি হলো না। করোনাদানব বিদায় নিলে কি প্রতিবাদমঞ্চগুলি আবার সপ্রাণ হবে, নাকি না-থাকার দলে চলে যাবে?

ভয়ে ভয়ে এই প্রশ্নটি তুলছি আর টেলিভিশনে দেখছি, 'কালো জীবনও মূল্যবান' আন্দোলন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শহরের পর শহরে সুনামির ঢেউ তুলছে, শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠতার দুর্গে আঘাত হানছে। বিশাল সব মিছিলে আছে যারা, বন্ধু হেলাল হাফিজের যেই অমর কবিতায় উদযাপিত যৌবনের শ্রেষ্ঠ সময়ে, তাদের অধিকাংশ না হলেও বড় একটি অংশ সাদা। তাহলে প্রতিবাদী কণ্ঠ নিশ্চয় না-হারার দলে চলে যাবে না, যদিও করোনাদানবের হুমকিতে এ দেশে তা নির্বাসনে গেছে।

হেলালের কথায় মনে পড়ল, তার স্বাস্থ্য নিয়ে আমার সবসময় একটা উদ্বেগ থাকে। সেও যেন থাকার দলে থাকে, অনেক অনেক দিন। তাকে করোনা-উত্তর বাংলাদেশের প্রয়োজন।

না থাকার দলে যে কিছু প্রিয় মানুষ চলে গেছেন, এই রুদ্ধ সময়ে অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, জামিলুর রেজা চৌধুরী- তা আমাদের নিঃস্ব করে দিল। ভাগ্য ভালো অনেকেই করোনার হাত গলিয়ে ফিরে এসেছেন। মুনতাসীর মামুন যেমন। একটা বড় আশা আমার, না হারার দলে আমার কোনো প্রিয়জন অচেনা মানুষদের যারা প্রিয়জন, তারাও যেন থাকেন, যেন চলে না যান।

২. প্রিয় না থাকার দলে আছে আমার মুক্ত চলাফেরার হঠাৎ-সিদ্ধান্ত একটা ভালো নাটক অথবা ছবির প্রদর্শনীতে যাওয়ার, মন টানলে হুট করে আমার নিজের শহরে চলে যাওয়ার স্বাধীনতা। অনেক দিন আড্ডা হয় না অথচ প্রাণবন্ত অনেক আড্ডায় আমি কিছু মানুষকে নতুন করে চিনেছি। কথাটা অহঙ্কারী শোনালেও বলতে ইচ্ছে করে- অধ্যাপক আনিসুজ্জামানকে আমি যতটুকু জেনেছি, তার অনেকটাই এ রকম 'আড্ডায়'। স্যার আড্ডা কথাটা বলতে আস্কারা দিতেন, বলতেন কোদালকে তো কোদালই বলতে হয়। এক সপ্তার ক্লান্তি এক সন্ধ্যায় মুছে ফেলতাম কায়সার হক আর ফকরুল আলমের সঙ্গে আড্ডায়, এতে অন্যরাও মাঝে মাঝে শামিল হতেন। এখন তাদের সঙ্গে কথা হয় ফোনে। কিন্তু ফোন তো ডাক্তারের বদলে আসা কমপাউন্ডার! বাড়িয়ে বলছি না, বন্ধু কাজী মোস্তাইন বিল্লাহর সঙ্গে আড্ডা দিতে চট্টগ্রাম চলে গেছি, সামান্য উছিলাতেও! এখন এসব আড্ডার কথা ভাবি। এগুলি কি এখন প্রিয় অনুপস্থিতির হিসাবে নাম লিখানো আড্ডা কি আর ফিরবে মুখোশ পরে, সামাজিক দূরত্বে বসে আড্ডা কি হয়, কোনোকালে হয়েছে? হয়তো ভিন কোনো গ্রহে, কিন্তু তার কোনো খবর আমরা জানি না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ধূলিমলিন গ্রন্থাগারটা আমার খুব প্রিয় একটা জায়গা। মাঝে মাঝে এই গ্রন্থাগারে গিয়ে পুরোনো বই বের করে পড়েছি। একশ-দেড়শ বছরের পুরোনো বই ইতিহাস, ভাষা ও সাহিত্য, সমাজ, উপনিবেশী জীবন- এসবের ওপর। এই গ্রন্থাগারের অবশ্য মুখোশ পরে যাওয়াটা এমনিতেই প্রয়োজন, কিন্তু মুখোশ-দস্তানা পরে এখন বাইরে বসে থাকলেও এর দরজা খুলবে না। এই মুহূর্তে ধূলিছাওয়া গ্রন্থাগারটিকে কালের সাক্ষী তার পুরোনো বইগুলিকে, প্রিয় অনুপস্থিতির তালিকায় ফেলতে পারি।

আমি যে কর্মব্যস্ততায় অভ্যস্ত- শিক্ষকতা, সভা-সেমিনারে উপস্থিত থাকা, লেখালেখি এবং টুকটাক গবেষণা এবং সামাজিকতা রক্ষায় নানা অনুষ্ঠানে আন্তরিক অথবা আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ- তার কিছু হারিয়ে গেছে, কিছু ভার্চুয়াল হয়েছে। এসবই চলতে একটা ছন্দে। মাঝে মাঝে ছন্দপতন হয়েছে, দীর্ঘ আলোচনা সভায় ক্লান্তি এসেছে, কারও অর্থহীন বকবকানি শুনে নিজেকে তিরস্কার করেছি, কেন বসে আছি সেজন্য, কিন্তু ছন্দপতন কথাটাতেই তো ছন্দকে স্বীকার করে নেওয়া হয়েছে। খুবই কষ্ট হয় যখন দেখি জীবনের এই ছন্দটি না-থাকার দলে চলে গেছে। আমি জানি না, এই ছন্দটা ষোলোআনা কখনও ফিরে পাব কিনা। এক সময় হয় তো পরিচয় পত্রের মতো করোনা-মুক্তির একটি সনদ গলায় ঝুলিয়ে চলাফেরা করতে হবে। জীবনটা তখন পুরোপুরি ছন্দ হারাবে।

আমার পায়ের তলায় আছে সর্ষে। আমার প্রিয় এমন দেশের ভেতর। বিদেশেও সুযোগ পেলে গেছি। প্রতি বছর তিন-চারবার বাইরে যাই, কোনো বিশ্ববিদ্যালয় একটা আমন্ত্রণ জানালে, সঙ্গে বিমান ভাড়াটা ধরিয়ে দিলে আলোচনা-টালোচনা যাই হোক, গিয়ে হাজির হই। গত বছর ইতালিতে গেলাম, ভেনিসে এক দিনে ছব্বিশ মাইল হেঁটে বেড়ালাম। সঙ্গে ছিল শিল্পী মুখলেস। এই বছরও যাওয়ার কথা ছিল বেশ কটি শহরে, ইংলন্ডের দক্ষিণে এক ছোট্ট সমুদ্র শহরে কাটাবার কথা ছিল একটি সপ্তাহ। প্রতিটি ভ্রমণ থেকে মনটাকে আরও সতেজ করে ফিরতাম। কিন্তু আর কি কোথাও যাওয়া যাবে, যখন চাই তখন? পায়ের নিচের সর্ষে মুছে ধুয়ে এখন ঘরের ভেতর যোগাসনে বসে থাকতে হবে। অথবা টিভিতে টিএলসি চ্যানেল খুলে অলীক ভ্রমণে বেরুতে হবে।

যা হারিয়ে গেছে তা আগলে বসে থাকব না। আমার যে বয়স তাতে হারিয়ে যাওয়া, হঠাৎ হাওয়া হয়ে যাওয়া, প্রিয় চর্চাগুলি, স্বাধীনতাগুলি সঞ্জীবনী মুহূর্তগুলিকে যেতে দেয়াটাই ভালো। আফসোসটা শুধু জায়গায় : এক দিন সব অনুপস্থিতি যখন উপস্থিতির প্রাবল্য নিয়ে ফিরে আসবে জীবন আবার সকল মাত্রায়, পূর্ণতায়, জাগবে, কাজের চাঞ্চল্য ফিরবে, শাহবাগে কলরোল উঠবে, সংস্কৃতির বন্ধ দুয়ারগুলি খুলবে, ট্রেনে-বাসে কালের খেয়া পড়তে পড়তে মানুষ অফিসে-বাড়িতে যাবে, আমি শুধু থাকব না। না থাকি, তাতে কি আসে যায়। শুধু চাই সেই পূর্ণ জীবনের যাত্রার ধ্বনি যেন মানুষকে শুভের পক্ষে জাগায়। া