কালের খেয়া

কালের খেয়া


দুঃসহ কাল

প্রকাশ: ২৭ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৯ জুন ২০২০      

দ্বিতীয় সৈয়দ-হক

ধীরে, অতি ধীরগতিতে চলে জীবন; শ্নথ পায়ে চলে, সমস্ত জীবনের চিরকারিতা যেন এক হয়ে একসাথে এসে জমা হয়ে পড়ে পায়ের কাছে। আজ সপ্তাহখানেক ধরে এভাবেই কাটছে দৈনন্দিন জীবন। গত জানুয়ারি মাসে হৃদরোগ ধরা পড়ায় আমাকে একটু বেশিই সচেতন থাকতে হয়েছে। যখন ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি থেকে আমরা শুনতে পাই সারাবিশ্বে করোনাভাইরাসের ছড়িয়ে পড়বার কথা। সুস্থ-সবলদের ওপর ঝুঁকি নাকি তুলনামূলকভাবে কম- সবচাইতে সাবধানে থাকতে হয় বয়স্কদের, ধূমপায়ী, হৃদরোগে আক্রান্ত যারা, ইত্যাদি। ইস্কুল জীবনে খুব নিয়মিত দশে-দশ পাবার কথা সেভাবে মনে পড়ে না, তবে, এই ক্ষেত্রে, মনে হয় দশের মধ্যে অন্ততপক্ষে আট কিংবা নয় আমার প্রাপ্ত।

আগে থেকে এভাবে সাবধান হবার সুবুদ্ধি যে নিজের থেকে আসে, তা দাবি করা ঠিক হবে না। এখানে, আমার চাইতে অনেক বেশি সতর্ক ও চিন্তিত, গোড়া থেকেই, আমার মা এবং স্ত্রী। বিগত কয়েকদিন তাঁদের নানাধরনের কথাবার্তা ও প্রস্তুতি দেখে খুব একটি সাহস করে বলতে পারি নাই, পুলিশ পল্গাজার পাশে ঝিলপাড়ে বসে একটু চটপটি খেয়ে আসবার কথা। সেই একই সূত্রে, সাহস করে বলা হয়নি যে, ডাক্তার যখন বলেছেনই কিছুদিন একটু বিশ্রামে থাকতে, সেই ফাঁকে একটু আমার নিজের রেসিপি-মতো কাহন কালামারি ফ্রাই হয়ে যাক। সেটা তো বলাই যাবে না, কেননা, স্কুইড তো এখন সেই সাপ-ব্যাঙ-ইঁদুর-বাদুড়ের মধ্যে পড়ে। এসব থেকেই নাকি শুরু। বিদ্যালয় পড়াকালীন একজন বন্ধু বলল, "যাহ্‌, শালা, শেষপর্যন্ত আমাদের মৃত্যুটাও 'মেড ইন চাইনা'" একদিকে হাসিও লাগে, তবে হাসতেও মন চায় না। আরেকদিকে, হাসতে গেলেও বিপদ- সামাজিক মাধ্যমে দেখা যায় যারা এসব ধরনের কথা বলছে, তাদের প্রতি অসহায় মানুষের ক্রোধ কেবল বাড়ছেই। আসলে, এটা তাদের প্রতিও ক্রোধ নয়- অদৃশ্য, অজানা আতঙ্কের মুখে, ভয়ের কারণে এ ধরনের প্রতিক্রিয়া।

এসবের মধ্যে, একজন লেখক হিসেবে আমার আজীবন যেই কাজ, তা-ই করি- লক্ষ্য করি। ঘরে বসে লক্ষ্য করি, যতদূর করা যায়, স্মার্টফোনের জানালা দিয়ে বাইরের পৃথিবীর দিকে চেয়ে। দেখি, কীভাবে পশ্চিম বিশ্বে মানুষে টয়লেট টিস্যু নিয়ে পাগলামি করে; দেখি, কীভাবে কিছু মানুষের জীবন হয়ে যায় সম্পূর্ণ করোনা-ভিত্তিক; দেখি, কিছু অপ্রীতিকর মানুষদের গুজব ছড়াতে এবং, দেখি, এতবড় বিপদের মধ্যেও কীভাবে লোকে মানুষের ভয়ের ওপর চড়ে অল্প কিছুদিনের মধ্যে বেশ কিছু টাকা বানাবার কাজে নেমে পড়ে। যেদিকে তাকাই, সেদিকেই খালি করোনা, করোনা, করোনাভাইরাস। একসময় মনে হয় যেন আমরা আক্রান্ত না হয়েও সকলে আক্রান্ত হয়ে পড়েছি এই রোগে। নানাবিধ মানুষের নানাবিধ প্রতিক্রিয়া দেখে মনে মনে তাদেরকে একেক ক্যাটেগরিতে ফেলতে চেষ্টা করি। ভাইরাসে যদি না-ই মারা যাওয়া থাকে কপালে, তবে, লেখালেখির জন্য কিছু মাল-মসলা তো জোগাড় করা হয়ে গেল, এই ফাঁকে।

ল্যাপটপের স্ট্ক্রিনের কোনায় তাকিয়ে দেখি মাত্র কয়েক শত শব্দ লেখা হয়েছে। ভেবেছিলাম, এই লেখার কাজটি হাতে পেয়ে, বেশ ভালোই হবে; সময় কেটে যাবে। তবে, লিখতে বসে দেখি যে সেই লেখাও চলছে ধীরে, ধীরে, শ্নথগতিতে, ঠিক আমাদের দিনকালের মতো। অনিশ্চয়তার মধ্যে চলছে লেখাটিও। করোনার দিনকাল নিয়ে এমন কী লেখা যায় যে আমরা সকলেই এর মধ্যে শতবার শুনিনি; ভাবিনি? আবারও ভাবি, কার জন্যই বা লিখছি? এমন পাঠক যদি থেকে থাকেন, যিনি এই দুঃসময়েও, খবরের কাগজের সাহিত্য পাতার অপেক্ষায় থাকেন, তাঁদেরকে আমি জানাই স্যালুট। তাঁদের জন্যই আমারা- লেখকেরা- লিখে যাই। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, তাঁরা কালের খেয়ার এই সংখ্যাটি আজ খুলে ধরেন নাই হাত ধোয়া ও পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন থাকবার কোনো জ্ঞান অর্জন করতে। তাঁরা জানতে চান না কীভাবে একই সাথে চিকিৎসকদের ও কৃষিশিল্পের অসতর্কতার কারণে যুগে যুগে জীবাণু প্রতিরোধকারী ওষুধ ক্রমে ক্রমে অকেজো হয়ে পড়ে। অনেক কিছুই লেখা যায় এসব নিয়ে, তবে এমন কিছু নয় যা অনলাইন খুঁজলেই সহজে পাওয়া যাবে না। ফেসবুকের যুগে আমরা সকলেই সাংবাদিক, সকলেই বিশেষজ্ঞ, সকলেই গুপ্ত তথ্যের ভান্ডার।

সেসব নিয়ে না বলে, বরঞ্চ, লেখাটি রয়ে যাক সাহিত্যের আঙ্গিনায়। লিখি, তাহলে, আবেগ নিয়ে কিছু কথা। সব ধরনের আবেগ নয়- প্রেম ভালোবাসার দিকে লেখাটিকে ঠেলে নিতে যাচ্ছি না। তার চাইতেও মৌলিক একটি আবেগের কথা নিয়ে কথা বলা যাক- স্ব-সংরক্ষণ- যা সকল প্রাণীর মধ্যেই কাজ করে থাকে এবং যা, একেকজনের ক্ষেত্রে একেকভাবে প্রকাশ পায়। করোনাভাইরাস যা করেছে, তা হচ্ছে মানুষের মধ্যে মৃত্যুভয় ঢুকিয়ে দেওয়া। সেই ভয়ের কারণে এখন প্রতিটি মানুষই আত্মসংরক্ষণ নিয়ে ব্যস্ত। খালি ব্যস্ত নয়, কিছু কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এখন এই আত্মসংরক্ষণের দুশ্চিন্তা নিয়ে পড়ে থাকা হয়ে গেছে সারাদিন ও রাত-ব্যাপী একটি কাজ। তবে, জীবজন্তুর ব্যাপারে আত্মসংরক্ষণ যেমন একটি সোজা ব্যাপার- 'কীভাবে প্রাণে বাঁচি'- মানুষের ক্ষেত্রে সেটি এত সহজ নয়। যেমন, পশ্চিম বিশ্বে টয়লেট টিস্যু নিয়ে যেভাবে খেল দেখা গেল, তাতে বোঝাই যায় তাঁদের খাদ্য নিয়ে ততটা চিন্তা নেই। খাদ্যের ব্যাপার পড়ে দেখা যাবে- আগে, সেই খাদ্য হজম করে বর্জন করবার সময় কীসব সুযোগ-সুবিধা থাকে, সেগুলোই হলো আসল চিন্তার বিষয়। বাংলাদেশের দূর কোন একপ্রান্তে, কোন এক কৃষকের হাতে বদনা নিয়ে এসব ঘটনার কথা শুনে একটু বিস্মিত হবার কথা বটে।

বাংলাদেশের মতো বিশ্বের সকল জায়গায় আমাদের সমস্যা হলো খাবার নিয়ে। তা পড়ে কীভাবে বর্জন হয়, দেখা যাবে। তাই, কিছুদিন যাবৎ, যেই দু'-একবার নিতান্ত প্রয়োজনে বের হওয়া হয়েছে, রাস্তায় প্রায়ই লোকের হাতে বাজার দেখেছি এবং, সেই বাজারের মধ্যে, অধিকাংশ মানুষেরই হাতে লক্ষ্য করেছি চাল, ডাল, পেঁয়াজ আর তেল। তাহলে, বোঝা যায়, বেলা শেষে, আমরা কেউই মাছে-ভাতে বাঙালি। আমরা খিচুড়িতে বাঙালি। ছোটবেলায় শোনা সেই টোনা-টুনির গল্পের মতো, বিপদে পড়ে সকলেই মনে হয় খিচুড়ির ওপর থাকবার পরিকল্পনা করছে অন্ততপক্ষে আগামী দু-এক সপ্তাহের জন্য। এটি হলো আমাদের শারীরিক আত্মসংরক্ষণ। তবে, অনেকের কাছে পেটে ভাতের চাইতেও গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে তাঁদের আত্মার সংরক্ষণ। তাই, করোনাভাইরাসকে তাঁরা দেখছেন একটি গজব হিসেবে। একবার ভাবি, তা হতেও পারে- মানবজাতি হিসেবে তো আমরা পাপ খুব একটা কম করি নাই। মানুষ প্রকৃতি, পশুপাখি, এমনকি অন্য মানুষের ওপর কম অত্যাচার তো করি নাই। যেমন, চাইনাতে কাঁচা বাজারের কথা- আজীবন শুনে এসেছি, তবে, অসুখ না ছড়ানো পর্যন্ত সেটিকে বন্ধ করা কেউ কর্তব্য বলে দেখে নাই। অথচ, এখন, কেবল আমাদের আত্মসংরক্ষণ ও আত্মার সংরক্ষণের জন্য তা বন্ধ করা হয়েছে। প্রযুক্তি-চালিত, উন্নত এই একবিংশ শতাব্দীতে আমাদের নিজের প্রাণের ওপর হুমকি না আসা পর্যন্ত কেউই কিছু করবার প্রয়োজন মনে করে নাই।

এই হলো আমাদের সভ্যতার লক্ষণ।

যেই সভ্যতা যুগের পর যুগ গাজা, প্যালেস্টাইন ও ওয়েস্ট ব্যাঙ্কে মানুষের ঘরবন্দি থাকা অবস্থা মেনে নিয়েছে, হয় প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষভাবে তা মেনে নিয়েছে বা হতে দিয়েছে- সেই সভ্যতার মানুষ শেষ পর্যন্ত নিজের প্রাণের ওপর হুমকি আসায় কিছুটা না হলেও টের পেয়েছে, সেখানকার মানুষদের গোটা জীবন কীভাবে কাটাতে হয়েছে। এমনও বলা যেতে পারে যে বিশ্বের কোনো কোনো জায়গায় মানুষদের জীবন চীন দেশের কাঁচাবাজারে আটক পশুপাখির চাইতেও ভয়াবহ। অথচ আমরা কিছু করি নাই। এগুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে, শত তর্কবিতর্ক হয়েছে, একেক দেশে শত সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান গড়া হয়েছে এসব মানুষদের জীবনে এক চিলতে উন্নতি আনার জন্য, অথচ- সত্যি কথা বলতে কি- আমরা তাঁদের জন্য তেমন কিছুই করি নাই। কারণ, আমরা দেখিয়েছি, যে যখন নিজের স্বার্থ, নিজের জীবনের ওপর হুমকি আসে, তখন আমরা রাতারাতি অনেক কিছু বদলে দিতে পারি। পৃথিবীকে বদলে দিতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গোলটেবিল বৈঠকের প্রয়োজন হয় না, শত-শত দিস্তার রিপোর্টের প্রয়োজন হয় না, একের পর এক গিওপলিটিক্যাল বৈঠক ও দাবার চালের প্রয়োজন হয় না- প্রয়োজন হয় কেবল নিজের জানের ওপর হুমকি।

বলে না, জান বাঁচানো ফরজ? সেই ফরজ কাজ নিয়েই গোটা পৃথিবী এখন ব্যস্ত। প্রয়োজনে আমরা রাতারাতি আমাদের বর্ডার বন্ধ করে দিতে পারি, লোকজনের বাড়ি থেকে বেরুনো বন্ধ করে দিতে পারি, সবচাইতে গরিব লোকের জন্যও চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে পারি- তার হেল্‌থ ইন্সিউরান্স থাক কি না থাক- এই সবই আমরা করতে পারি নিজেদের স্বার্থে।

লেখায় একটু গতি চলে আসায় একবার ভাবি, এবারে একটু চা হলে খারাপ হয় না, কিন্তু, পর মুহূর্তেই ভাবি, যে চা নিজে বানিয়ে নিতে হবে। ছুটা বুয়া অনেক আগেই দুপুরের খাবার তৈরি করে চলে গেছে। অবস্থা বুঝে হয়তোবা তাকে একদমই মানা করে দিতে হবে কিছুদিনের জন্য- যতদিন না জানা যায় আমাদের আশেপাশে করোনাভাইরাস কতদূর শিকড় গাড়তে পেরেছে। বিলেতে থেকে অভ্যস্ত হয়ে এতে আমার তেমন কিছু আসে যায় না- রান্নাবান্না থেকে কাপড় ধোয়া ও ঘরদুয়োর মোছা, প্রয়োজনে সবই করতে পারি। তবে, বিগত পাঁচ বছরে, এগুলো না করে অভ্যাস হয়ে গেছে। কারণ, মানুষ হিসেবে, আমরা সকলেই অভ্যাসের দাস। এখন, লেখা ছেড়ে এক কাপ চা বানিয়ে খাওয়ার কথা চিন্তা করে একটু বিরক্তই লাগে। তবুও, সেটি বানানো কোনো ব্যাপার না। কিন্তু সকলের পক্ষে তো সম্ভব না। বৃদ্ধ, অসুস্থ, অসহায়ি অনেকেই আছেন যাদের জন্য এক কাপ চা বানাবার মতো লোক নাই। আপাতত, এসব নিয়ে মাথা ঘামাবার বিলাসিতা আমরা করতে পারি কিন্তু- যদি এমন এক সময় আসে- যখন যে যার মতো করে বেঁচে থাকা নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বে- তখন?

বিলাসিতা শব্দটি লিখে চিন্তায় ডুবে থাকি কিছুক্ষণ।

আসলেই, করোনা এসে আমাদেরকে যেন এক দীর্ঘ বিলাসিতার নিদ্রা থেকে জাগিয়ে তোলে। প্রযুক্তির কারণে গোটা পৃথিবীকে আমরা ভেবেছিলাম আমাদের হাতের মুঠোয়। ইচ্ছে করলেই দেশে-বিদেশে যখন যার সাথে ইচ্ছে যোগাযোগ করবার ক্ষমতা পেয়ে আমরা বিশ্বকে ভেবে নিই অতি ক্ষুদ্র, অতি সহজ ও সুলভ জায়গা। বিশ্বের এমন কোনো পণ্য নেই, যা আমরা অনলাইনে কিনতে পারি না। কিছু খেতে মন চাইলে তা হাতে করে আমাদের পৌঁছে দেওয়া হয়, হোম ডেলিভারির ওপর নির্ভর করে একটি মানুষ ইচ্ছে করলে দিনের পর দিন নিজেকে বাস্তব দুনিয়া, সমাজ থেকে সরিয়ে নিতে পারে। করোনাভাইরাসের মতো রোগের ঝুঁকির কথা জেনেও আমরা সেটিকে সেভাবে গ্রাহ্য করি নাই- কেননা, আমরা ভেবেছি যে এমন পরিস্থিতির সম্মুখে আমাদের কখনও হতে হবে না। ভেবেছি যে প্রযুক্তি সবসময় এক পা করে এগিয়ে থাকবে; ভেবেছি আমরা এসব থেকে নিরাপদ। আমার ব্যক্তিগত ধারণা যে করোনার মতো আশঙ্কা আমাদের কেবল শুরু। এর চাইতেও ভয়ানক মহামারি রোগ অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য, কারণ, আমারা ধরে নিয়েছি যে আমরা এসবের কবলের বাইরে।

আজ কয়েক দশক ধরে শুনে এসেছি যে আমাদের খাদ্যশৃঙ্খলে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার কারণে ভাইরাস প্রতিরোধের বিকাশ ঘটছে, অথচ এতে কোনো তোয়াক্কা করা হয় নাই। প্রচুর পরিমাণে আলোচনা হয়েছে, তৈরি হয়েছে প্রামাণ্যচিত্র, গঠন হয়েছে কত নানাবিধ সংস্থা এটিকে নিয়ে প্রতিবাদ করবার জন্য কিন্তু, কাজ বলতে তেমন কিছুই করা হয়নি। ধরে নিই, আমরা, যে করোনাভাইরাসের খোবল থেকে বেরিয়ে এলাম আমরা কোনমতে- কিন্তু তা হলেই কি আমরা ঝুঁঁকিমুক্ত হয়ে গেলাম? বিশ্বের প্রতিটি খামারে যদি রাতারাতি অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া বন্ধ করা হয়, তার প্রতিক্রিয়া হবে আরও ভয়াবহ। কারণ, সেসব ওষুধের ওপর আমাদের পশুসম্পত্তি সম্পূর্ণ নির্ভর। আমাদের অন্তহীন চাহিদার, আমাদের অতৃপ্ত ক্ষুধার জন্য এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে এবং, এটি এমন এক সমস্যা, যা রাতারাতি সমাধান করা অসম্ভব।

তাই বলি, ধীরে, অতি ধীরগতিতে চলে জীবন; শ্নথ পায়ে চলে, সমস্ত জীবনের চিরকারিতা যেন এক হয়ে একসাথে এসে জমা হয়ে পড়ে পায়ের কাছে। বেয়ে পড়ে জীবন, জানালায় একটি বৃষ্টির ফোঁটার মতো, নির্যাতিত গৃহবধূর গাল বেয়ে একটি অশ্রুকণার মতো। এভাবেই চলবে, জীবন, এবং, গোটা পৃথিবী আর কখনোই ফিরে যাবে না সেই দিনে- যখন একজনার হাত ধরে মনে হবে না হাত ধোবার কথা, যখন নিশ্চিন্তে করতে পারব আলিঙ্গন, যখন অন্য মানুষদের সাথে যতদূর সম্ভব দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে না, যখন বিনাকারণে, বিনাপ্রয়োজনে ঘর থেকে বেরুবো না। কে জানে, কোত্থেকে কী রোগ বেঁধে যায়, আমাদের? কে জানে, কোন রেস্তোরাঁর কাটাচামচে লুকিয়ে থাকে কোন জীবন নাশ-করা রোগজীবাণু? করোনা কাটিয়ে আমরা উঠতে পারি ঠিকই, কিন্তু এই আতঙ্ক রয়ে যাবে আমাদের সাথে চিরকাল। মানুষ হয়ে উঠে দাঁড়াতে যেমন সময় লাগবে, প্রতিটি আক্রান্ত দেশ, প্রতিটি সরকার ও ব্যাবসাপ্রতিষ্ঠানে পড়বে এই রোগের প্রভাব।

১৭৯৮ সালে, ম্যালথাস নামে একজন অর্থনীতিবিদ "অ্যান এসেই অন দ্য প্রিন্সিপ্যাল অফ পপুলেশনে" বলেন যে মানুষ উচ্চমানের জীবনযাপন করার চাইতে প্রাচুর্যের সময় সেটিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কাজে লাগিয়ে থাকে এবং, একসময়, দেখা যায় যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে, সমাজে নিম্ন স্তরের মানুষেরা দুর্ভিক্ষ ও রোগে আক্রান্ত হয়ে আবার জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসে। এই দৃষ্টিভঙ্গিকে 'ম্যালথুসিয়ান ট্র্যাপ' বা 'ম্যালথুসিয়ান স্পেক্টর' বলে উল্লেখ করা হয়। কয়েক শত বছর আগের কথা হলেও, ম্যালথাস এর থিওরি বরাবর সত্য বলে দেখা গেছে। গোটা পৃথিবীর জনসংখ্যা যেখানে ৭.৭ বিলিয়ন মানুষে দাঁড়িয়েছে, তখন ভাবতে হয় যে খুব সম্ভব আমরা এমন একটি পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছি কিংবা যাবার পথে- যেখানে পৃথিবীর জনসংখ্যা একটি নতুন ভারসাম্য খুঁজছে- যেখানে জনসংখ্যা না কমলে মানবজাতিই টিকতে পারবে না। এসব কালো কল্পনা মনে করে মন ভারী হয়ে আসে। কলেজ জীবনে যখন প্রথম পড়ি ম্যালথাসের কথা, স্পষ্ট মনে পড়ে যে সম্পূর্ণ ব্যাপারটি আমার কাছে অবিশ্বাস্য মনে হয়েছিল; হাস্যকর। তখন ভেবেছিলাম, দু'শত বছর আগে একটি মানুষের কথা বিশ্বাস করার কীই আছে? আজ, তার কথা মনে করে, কেন জানি এতটা হাসি পায় না। তবে, যেসব জিনিস আমাদের হাতের বাইরে, সেগুলো নিয়ে বেশি মাথা ঘামানো হয়ে যায় জীবনের অপচয়। বাঁচতে হবেই, আমাদেরকে, যদি আর কেবল ক'টি দিন, তাহলে, সেই দিনগুলো কাটুক পরিবারের সাথে, আপনজনদের কাছে রেখে, প্রতিটি মুহূর্তকে যথাসম্ভব গুরুত্ব ও মর্যাদা দিয়ে। এভাবেই, দেখা যাবে মরণের মুখে আমরা জীবনকে মর্যাদা দিতে শিখি। ইতোমধ্যে আমি, লক্ষ্য করব, লিখে যাব, গানের সুর করব এবং বেঁচে থাকবার স্বাদ গ্রহণ করে যাব যতদিন লেখা থাকে কপালে। ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। া

ষ ঢাকা থেকে