কালের খেয়া

কালের খেয়া


বইয়ের ভুবন

প্রেম রক্ত ও ঘামের কবিতা

প্রকাশ: ২০ মার্চ ২০২০     আপডেট: ২০ মার্চ ২০২০      

পুলক হাসান

প্রেম রক্ত ও ঘামের কবিতা

শ্রেষ্ঠ কবিতা, লেখক :: বুলান্দ জাভীর, প্রকাশক :: আলোঘর, প্রচ্ছদ ::মোস্তাফিজ কারিগর, মূল্য ::২৫০ টাকা

প্রেম মানবজীবনের এক মহান অর্ঘ্য। কবিতায় এ প্রেম যুগ যুগ ধরে জারিত, সময় ও প্রেক্ষাপটে পরম্পরায় অভিব্যক্তি ও অনুভবে নতুন নতুন মাত্রা নিয়ে উদ্ভাসিত। বয়সের তারুণ্যে সেখানে স্থূলতা, ভাঁড়ামি এবং নিতান্ত আত্মরতি প্রকাশও দেখা যায় বটে। তবে একটি বিশুদ্ধ ও সফল প্রেমের কবিতার আবেদন চিরকালীন। প্রয়োজনে গূঢ় অন্বেষণে আমরা তা থেকে উদ্ধৃতি টানতে বাধ্য হই। প্রেম ব্যক্তি অনুভবের চূড়ান্ত প্রকাশ। নানা ঘটনা ও অনুষঙ্গে তা প্রতিভাত হতে পারে। ফলে প্রেম শুধু জীবনাভিসার নয়, আরো নানাদিকও তার মধ্য থেকে উঠে আসে। তখন সেটা আর থাকে না স্বপ্ন নারীর মধ্যে কিংবা ব্যক্তি ও পারিবারিক ঘরোয়া গল্পের আবহে সীমাবদ্ধ। আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদের কবিতার বিষয় নারীকেন্দ্রিক কিন্তু তার মধ্যে জীবন ও জগতের উদ্ভাসন লক্ষ্য করি। এই পোড়া রূপসী বাংলার আদি-অন্তের সন্ধান পাই।

গ্রামীণ জীবনধারার ঐতিহ্যের বন্ধন জীবন্ত রূপে দেখতে পাই। মূলত এটাই আল মাহমুদের কাব্য সৃষ্টির স্বাতন্ত্র্য ও নিজস্বতা। এই স্বাতন্ত্র্য ও নিজস্বতাই একজন কবির বড় অর্জন বলে মনে করা হয়। সাম্প্রতিক কাব্যধারায় এ অর্জন অনেকেই দাবি করতে পারেন। তাদের মধ্যে অন্যতম কবি বুলান্দ জাভীর। ৮০ দশকের অগ্রগণ্য এ কবির কাব্যভাষা ও কাব্যচিন্তা স্বচ্ছ, সাবলীল এবং স্বতঃস্টম্ফূর্ত। কিন্তু সহজ প্রকাশের মধ্যেও তাঁর কবিতা ইঙ্গিতময়, বক্তব্যপ্রধান এবং জীবনের এক গূঢ় অন্বেষণ। এই অন্বেষণের মধ্য দিয়ে জীবনের সুরটি ধ্বনিত। সুর যদি জীবনের প্রকাশ, তবে কবিতা তার ধমনি। আর সেই সুর আহরিত প্রকৃতি থেকে, প্রকৃতির ধ্বনিমূর্ছনা থেকেই সুরের জন্ম। প্রেম সেখানে জীবনের সঙ্গে তৈরি করে চিরায়ত এক বন্ধন। ফলে কবিতার আদপে প্রেম, প্রকৃতি ও সুরেরই সম্মিলন। সৃষ্টি চেতনায় প্রেম তাই অপরিহার্য এক প্রসঙ্গ। ভাবোচ্ছ্বাসের চূড়ান্ত প্রকাশ প্রেম সেখানে বরফ গলা এক নদী। কবি বুলান্দ জাভীর প্রচণ্ডভাবে প্রেমিক ও রোমান্টিক। প্রেমময় অবলোকনে জীবন ও জগৎকে বেঁধেছেন তাঁর সৃজনে। জোর দিয়েই তাই বলা যায়, প্রেমই তাঁর কবিতার মৌলিক অধ্যায়।

সম্প্রতি অমর একুশে গ্রন্থমেলায় প্রকাশিত হয়েছে কবি বুলান্দ জাভীরের 'শ্রেষ্ঠ কবিতা'। বিগত প্রায় চার দশকে লেখা ও প্রকাশিত কবির কবিতা থেকে নির্বাচিত বিরানব্বইটি কবিতা স্থান পেয়েছে এই 'শ্রেষ্ঠ কবিতা' গ্রন্থে।

বুলান্দ জাভীর তার সমগ্র জীবন চেতনায় প্রেমেরই মহিমায় আঁকতে চেয়েছেন তাঁর কবিতার ক্যানভাস। প্রতিটি কবিতার মধ্যে তাই দেখি প্রচণ্ড এক প্রাণাবেগ এবং হৃদয়োৎসারিত স্বচ্ছ এক নির্ণয় চেষ্টা। যদিও তাঁর কবিতায় প্রেম আলো ফেলেছে পারিবারিক বন্ধন থেকে ঐতিহ্য সন্ধান এবং যাপিত জীবনের নানা অনুষঙ্গে। প্রেম ও প্রকৃতির রসায়নে উন্মোচন করেছেন তিনি স্বপ্নবিলাসী মধ্যবিত্তের মানস জগৎ এবং তার লোভাতুর ও স্বার্থপর চেহারাকেও। 'অস্থায়ী সেতু' কবিতাটির মর্মার্থ বুঝি তাই :

প্রতিদিন আমরা একটি অস্থায়ী সেতু নির্মাণ করি
পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করি
এবং দিনের শেষে তা ভেঙে ফেলি

মধ্যবিত্তের সম্পর্কটাকে ঠুনকো মনে করাই তাই স্বাভাবিক। কারণ, সে স্বার্থের ঊর্ধ্বে যেতে পারে না। যদি এই সম্পর্ককে যৌন বিলাসের সঙ্গে তুলনা করি। তবে 'সিন্থিয়া, সিন্থিয়া' এবং 'টাইপমেশিন' কবিতা দুটির অন্তর্গত আলো ওখানেই। 'মিস টরন্টো', 'মিস মেলবোর্ন', 'ওরলান্দো', 'মিস প্যারিস' ও 'হাডসন রিভার' ইত্যাদি কবিতায় ভৌগোলিক ভ্রমণ সত্ত্বেও বিচ্ছিন্ন হননি তিনি নিজের অজান্তে গড়ে ওঠা প্রেমিক সত্তা থেকে, পারিবারিক স্মৃতির বন্ধন থেকে। বিশেষ করে 'ওরলান্দো' কবিতায় সেই অনুভূতি জেগে উঠেছে তাঁর মধ্যে।

আজ উনিশ বছর পর ওরলান্দো এসে পুরনো বন্ধুকে পেয়ে
মনে হলো অনেকদিন পর বড় আপা বাড়ি এসেছে।

'মিস প্যারিস' কবিতায় যখন তিনি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে 'হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ কনসার্ট' মনে করেন এবং অমর বাণী 'এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম' ঘোষণাকে ফরাসি বিপ্লবের চেয়েও প্রাণাবেগের উচ্চতায় ঠাঁই দেন, তখন তাঁর মধ্যে স্বদেশপ্রেমের উদ্বেলতাই প্রকাশ পায়।

বুলান্দ জাভীর তাঁর কবিতায় যে বাস্তবতা আমাদের সামনে তুলে আনেন তা হয়তো অতি চেনা, কিন্তু বয়ান ও বিশ্নেষণে তা যে প্রাণবন্ত ও হৃদয়স্পর্শী, সেটাই তাঁর মুন্সিয়ানা। ৮০-এর দশকের কবিতায় তাঁর স্বতন্ত্র অবস্থানও হয়তো এ কারণেই।