কালের খেয়া

কালের খেয়া


তুমুল গাঢ় সমাচার

ষাটের দশকের কবিতা ও আমাদের আধুনিকতা

নব-জাগরণের এক বিস্মৃত অধ্যায়

প্রকাশ: ০৮ মার্চ ২০১৯      

বিনায়ক সেন

পর্ব ::৭

[গত সংখ্যার পর]
দ্বিতীয়ত, এই সাংস্কৃতিক নব-জাগরণের ওপরে বিশ্ব-সভ্যতার শ্রেষ্ঠ প্রতিভাধরেরা অন্তরীক্ষ থেকে পুষ্পবৃষ্টি করেছিলেন। এর পেছনে বোদলেরীয় ক্লেদজ কুসুমের অবক্ষয়ের ছায়া যেমন ছিল, তেমনি ছিল শানিত সমাজ-মনস্কতা। সার্ত্রে ও কাম্যুর অস্তিত্ববাদ, ফ্রয়েডের মনোবিকলন ও মার্কসের সমাজ-ইতিহাস সচেতনতা একই সাথে ক্রিয়াশীল ছিল ষাটের দশকের কবিতায়। লালনও ছায়া হয়েছিলেন। ফুলের মৃত্যু না হলে দুঃখে-বিরহে যেমন কবিতার জন্ম হয় না; কবির মৃত্যু না হলে তেমনি কষ্টে-শোকে ফুলের জন্ম হয় না- এ রকম সম্ভাবনার কথা কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্ত তার একটি প্রবন্ধে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। ষাটের কবিকুলের জন্য অবক্ষয়বোধ ও সমাজ-বদলের নিগূঢ় অভিপ্রায় তেমনি পরস্পর-বিরোধী না হয়ে সম্পূরক সত্তার মতো কাজ করেছিল। পূর্বাপর অনিবার্য ঋতুবদল বা ভাবান্তর হিসেবেই তা চিহ্নিত হয়েছিল। যদিও নানাবিধ উৎস থেকে আলো এসে পড়েছিল এই কবিদের ওপরে, কিন্তু তারা ছিলেন নিজ নিজ ভুবনের সপ্রতিষ্ঠ কারিগর। প্রেরণা-তাড়িত হয়ে তারা তাদের শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোকে লিখেছিলেন, যার সাথে পাকিস্তানের রাষ্ট্র, ইতিহাস, দর্শন ও রাজনীতির আমূল বিরোধ দেখা দিয়েছিল। তৃতীয়ত, যে-অর্থে এলিয়টের ওয়েস্টল্যান্ড ও জয়েসের ইউলিসিস বিশের দশকে পাশ্চাত্য আধুনিকতার জন্ম দিয়েছে, ষাটের দশকের বাংলাদেশের আধুনিক কবিতার ধারাও তেমনিভাবে পাকিস্তানি ভাবধারার বিরুদ্ধে এক অনাস্বাদিত আধুনিকতার, শিল্পরুচির ও বোধের জন্ম দিয়েছিল, যার পরিণতিতে সম্ভাব্য মনে হয়, বা সম্ভবতার হয়ে উঠেছিল বাহাত্তরের রাষ্ট্র, সংবিধান ও আজকের বাংলাদেশ।

ষাটের দশকের গোটা জীবন-যাপনকেই যেন একটি মায়াবী আয়নার মধ্যে- তার সমস্ত অমঙ্গলবোধ ও শুভত্বের বাসনা নিয়ে- প্রত্যক্ষ করেছিলেন সেদিনের কবি-সাহিত্যিকেরা। অবাস্তব অমার্জনীয় মনে হয়েছিল সেদিনের পাকিস্তানি রাষ্ট্র-ব্যবস্থার আইন-টাইন, কানুন-কালাকানুন, বেশ-পরিবেশ। অলক্ষ্যেই ধসে পড়েছিল ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের যুক্তি। সে জন্যই তারা অনায়াসে কখনও এলিয়টকে আঁকড়ে ধরে, কখনও ভায়েহোকে জড়িয়ে, কখনও রবীন্দ্রনাথের গানে উজ্জীবিত হয়ে, আবার কখনও বোদলেয়ারের কাছে ঋণস্বীকার করে নতুন একটি দেশ-সমাজ প্রার্থনা করেছেন, যেখানে প্রতিটি মানুষ বাধাবন্ধনহীন মুক্ত, সৃষ্টিশীল, রহস্যময়, আপন ভুবনের সম্রাট। বিচ্ছিন্ন, একক, বহিরাগত, অচেনা বলেই এই কবিকুল বৃত্তের বাইরে গিয়ে রাষ্ট্র-সমাজের শাসন ও অনুশাসনকে দেখতে পেরেছিলেন। যা সম্ভব ও বাস্তব তাকে তাদের কাঙ্ক্ষিত বলে মনে হয়নি; আর যা অসম্ভব ও অবাস্তব তাকে তারা শ্রেয়োজ্ঞান করেছেন। প্রতিটি রেনেসাঁই অসম্ভব ও অবাস্তবকে পৃথিবীর মাটিতে ফলদায়ী বৃক্ষের মত লালনের স্বপ্ন দেখেছে। রফিক আজাদের মত 'অসম্ভবের পায়ে' নিজেকে উৎসর্গ করেছে। বোদলেয়ার যেমন বুদ্ধদেব বসুর অনুবাদে বলেছেন :

'বলো তবে, অদ্ভুত অচেনা মানুষ, কী ভালোবাসো তুমি?
আমি ভালোবাসি মেঘ, চলিষ্ণু মেঘ... ঐ উঁচুতে... ঐ উঁচুতে
আমি ভালোবাসি আশ্চর্য মেঘদল।'

না ভ্রাতা, না ভগ্নি, না পিতা, না জননী, আমি বা আমরা যে রাষ্ট্রে বাস করতে চাই, তা লালনের রিপাবলিক। এভাবেই আগামীর সমাজ-রাষ্ট্রকে দেখেছেন তারা।

[ক্রমশ]