ঘাস ফড়িং

ঘাস ফড়িং

লীনার আকাশ দেখা

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০২০

গল্প লিখেছেন মীম নোশিন নাওয়াল খান ছবি এঁকেছেন শুভব্রত ইয়াসমিন

লীনা বারান্দার গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আজকাল তার কিচ্ছু ভালো লাগে না। সারাক্ষণ মন খারাপ থাকে। কারো সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করে না, খেলতে ইচ্ছে করে না, পড়তেও ইচ্ছে করে না। এই মন খারাপের ব্যাপারটা বেশ অদ্ভুত। করোনাভাইরাসের জন্য যখন স্কুল বন্ধ হয়ে গেল, আব্বু-আম্মুর অফিস বন্ধ হয়ে গেল, সবাইকে ঘরে থাকতে বলা হলো- তখন লীনা খুশিই হয়েছিল। এমনিতে সে আব্বু-আম্মুকে কাছে পায় না তেমন। দু'জনই অফিসে থাকেন। এখন সবাই বাসায় থাকতে পারবে- কত্ত মজা হবে!

কিন্তু লকডাউন শুরুর পর বাসায় থেকে ক্লান্ত লীনা। নিচে-বাইরে কোথাও যাওয়া যায় না। উপরের এক বাসায় করোনা রোগী আছে, তাই ছাদে যাওয়াও বন্ধ। লীনারা থাকে তিনতলায়। তাদের বাসাটা তিনদিক থেকে আটকা। শুধু এক পাশ খোলা। এই খোলা দিকটায় এক চিলতে বারান্দা। এইটুকুন একটা বারান্দা, তাও এক পাশ খোলা। লীনাদের বাসার সামনেই একটা উঁচু ভবন। সেটার জন্য লীনা বারান্দায় দাঁড়িয়েও আকাশ দেখতে পায় না। চোখ আটকে যায় ভবনে। অনেক কষ্টে উঁকিঝুঁকি দিয়ে একটুখানি আকাশ দেখা যায়। তবে ঠিকঠাক চাঁদটাও দেখা যায় না। মেঘেরা কী সুন্দর ভেসে যায়। অথচ লীনা সেটাও দেখতে পায় না।

আগে এগুলো কখনো তার মনে হয়নি। নিয়মিত যখন স্কুলে যেত লীনা, স্কুলের খোলা মাঠে বিশাল আকাশের নিচে ছোটাছুটি করত বন্ধুদের সাথে, খেলাধুলা করত। তাই যেটুকু সময় বাসায় থাকত, তাতে আকাশ না দেখলেও তেমন কিছু মনে হতো না। তা ছাড়া রোজ বিকেলে সে ছাদে উঠে খেলত। অথচ এখন সে বন্দি হয়ে আছে এইটুকু একটা জায়গায়। যেখানে আকাশ দেখা যায় না। বন্ধুদের সঙ্গে খেলা যায় না। আর আব্বু-আম্মু সারাদিন বাসায় বসে অফিসের কাজ করে।

লীনাকে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আম্মু ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন। লীনার কাঁধে হাত রেখে জিজ্ঞেস করেন, 'কী হয়েছে মা? এখানে দাঁড়িয়ে কেন? গোসল করে আয়, আমি অফিসের একটু কাজ সেরেই খেতে দিচ্ছি।'

লীনা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, 'সব কবে ঠিক হবে আম্মু? আমি কবে আবার স্কুলে যাব?'

আম্মু হেসে বললেন, 'এই না কিছুদিন আগে খুব খুশি হয়েছিলি স্কুলে যেতে হবে না শুনে? এখন আবার স্কুলে যাওয়ার জন্য অস্থির হচ্ছিস যে?'

লীনা বলে, 'আমি আকাশ দেখব আম্মু। বন্ধুদের সাথে খেলব। আমার একা আর ভালো লাগছে না।'

কথাটা বলতে গিয়ে সে কাঁদতে শুরু করল। আম্মু হাঁটু গেড়ে বসে তাকে জড়িয়ে ধরলেন। তার কান্নার শব্দে আব্বুও ছুটে এলেন। কী হয়েছে জানতে পেরে লীনার মাথায় হাত বুলিয়ে বলেন, 'এই তো আর ক'টা দিন মা। তারপর দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। এই ক'টা দিন তুই অন্য কাজগুলো কর। এই যেমন- ছবি আঁক, কাগজ দিয়ে ফুল-পাখি বানানো শেখ, গল্পের বই পড়।'

লীনা বলে, 'সব করে ফেলেছি আব্বু। আমার আর এগুলো ভালো লাগে না। আমি বাইরে যাব।'

আব্বু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বারান্দার এক পাশে রাখা খাঁচার পাখির দিকে তাকিয়ে বলেন, 'তোর অবস্থা এখন ওদের মতো। তুইও এখন খাঁচায় বন্দি পাখি। আমি বুঝতে পারি মা। পাখি কি আর খাঁচায় থাকতে ভালোবাসে? তার তো খাঁচায় থাকার কথা না। মুক্ত আকাশে উড়ে বেড়ানোর কথা। আর কয়টা দিন মা, সব ঠিক হয়ে যাবে দেখিস।'

আম্মু বলেন, 'চল মা, গোসল করে খাবি। আর এখানে মন খারাপ করে দাঁড়িয়ে থাকিস না। বিকেলে আমরা লুডু খেলব। ঠিক আছে?'

লীনার কানে আম্মুর কথাগুলো একদমই ঢুকল না। তার মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে আব্বুর কথাগুলো। আম্মু তার হাত ধরে ঘরে নিয়ে গেলেন। গোসল-খাওয়া শেষে ফের বারান্দায় দাঁড়ায় লীনা। এবার পাখির খাঁচার দিকে তাকায়। খাঁচায় দুটি পাখি। মাস তিনেক আগে ঝড়ে পাখির বাসা ভেঙে লীনাদের ছাদে এসে পড়েছিল দুটি পাখির ছানা। তখনও উড়তে শেখেনি। আব্বু যত্ন করে ছানা দুটি বাসায় এনে বলেছিলেন, 'কিছুদিন আমরাই ওদের লালন-পালন করবো। একটু বড় হলে ওরাই উড়ে যাবে।' কিন্তু লীনার খুব ভালো লেগে যায় ছানাদের। তাই ওদের রেখে দেয়। আব্বু-আম্মুর বারণের পরও তার কান্নাকাটিতে শেষমেষ তারা রাজি হয়েছিলেন। সেই থেকেই পাখির ছানা দুটি এখানেই থাকে।

আজ আব্বুর কথাগুলো শুনে খুব কষ্ট হচ্ছে তার। সত্যি তো, সে এখন ওই খাঁচার পাখি দুটির মতো বন্দি হয়ে আছে। মাত্র কয়েকটা দিন হয়েছে, অথচ তার কিছুই ভালো লাগছে না। বন্ধুদের সাথে খেলতে যেতে ইচ্ছে করছে, খোলা আকাশ দেখতে ইচ্ছে করছে। পাখি দুটিও তো আকাশ দেখতে পারছে না। অন্য পাখিদের সঙ্গে গান গাইতে পারছে না। উড়তে পারছে না।

লীনা বুঝতে পারে সে বড় একটা ভুল করেছে। এদের খাঁচায় রাখা একদমই ঠিক হয়নি। নিজে বন্দি থেকে সে বুঝতে পারছে এটা কতটা কষ্টের। মুক্ত পাখিকে খাঁচায় আটকে রাখা তো অপরাধ।

লীনা খাঁচার দরজা খুলে দেয়। পাখি দুটি এদিক-ওদিক চেয়ে একটু ভেবে কয়েক সেকেন্ড পর ফুড়ুত করে উড়ে যায়। লীনা গ্রিলে মাথা লাগিয়ে উঁকিঝুঁকি দেয়। দেখে, খাঁচার পাখি উড়তে উড়তে দূর আকাশে চলে যাচ্ছে। তার এতদিনের মন খারাপটা ভালো হয়ে যায়। সে না দেখতে পারুক, এতদিন বন্দি থাকা পাখি দুটি তো আজ আকাশ দেখবে। এই পাখিদের মতো তার বন্দি জীবনও নিশ্চয়ই একদিন কেটে যাবে। পৃথিবী সুস্থ হয়ে যাবে। সেও আবার ছুটে যাবে বন্ধুদের কাছে, খোলা আকাশের নিচে। া