ঘাস ফড়িং

ঘাস ফড়িং


গল্প

পালিয়ে গেলো রাজা

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২০      

সুদীপ্ত সালাম

এক দেশে ছিল এক অত্যাচারী রাজা। তার কোনো সন্তান ছিল না। অনেক বছর অপেক্ষার পর তার প্রাসাদ আলো করে একটি ছেলে হলো। ফুটফুটে একটি শিশু। গায়ের রং দুধের মতো। একমাত্র ছেলেকে নিয়ে আনন্দেই রাজা-রানীর দিন কাটছিল। শিশুটির দেখাশোনার জন্য একটি মেয়েকে রাখা হলো। একদিন কি হলো জানো! মেয়েটি শিশুটিকে যেই কোলে নিতে গেলো অমনি কান্না জুড়ে দিলো শিশুটি। ওমা! কান্না আর থামে না। শিশুর কান্না শুনে রাজা-রানী ছুটে এলো। ছুটে এলো প্রাসাদের বাকিরাও। কি হলো! কি হলো! মেয়েটি তো ভয়ে শেষ। শিশুর কান্না তবু থামে না। কান্নার কারণ কি? রাজা ভাবলেন, 'মেয়েটির গায়ের রং কালো বলেই রাজপুত্র ভয় পেয়েছে।' রাজা মশাই গম্ভীর হয়ে মন্ত্রীকে নির্দেশ দিলো, মেয়েটিকে রাজ্য থেকে বের করে দেওয়া হোক। রাজার হুকুম পালন করা হলো।

ওইদিন রাজা সারারাত ঘুমাতে পারল না। রাজপুত্র যেন কালো মানুষ দেখে আর কখনোই ভয় না পায় তার জন্য কী করা যায় তাই ভাবছিলো। শেষে সিদ্ধান্ত নিলো, রাজ্য থেকে কালো রঙের সবাইকে বের করে দিতে হবে। পরদিন সকালে এমনটিই করা হলো। বেছে বেছে গায়ের রং যাদের কালো তাদের জোর করে রাজ্য থেকে বের করে দেওয়া হলো। সব ওলটপালট হয়ে গেলো, পরিবারগুলো ভেঙে গেলো। অনেক শিশু বাবাকে হারালো, অনেক শিশু হারালো মাকে। অনেকে হারালো তাদের আদরের সন্তানকে। ভাই হারালো বোন, বোন হারালো ভাই। রাজ্যে আনন্দ বলে আর কিছু রইলো না। সবখানে শুধু কান্নাকাটি। ওদিকে রাজা ও রানী হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো এবং সুখে বসবাস করতে লাগলো।

ওদিকে যাদেরকে রাজ্য থেকে বের করে দেওয়া হলো তারা অন্যকোনো রাজ্যে ঠাঁই পেতে দিনের পর দিন হাঁটছে। তারা রোদে পুড়লো, বৃষ্টিতে ভিজলো, কতদিন যে না খেয়ে দিন কাটালো তার হিসাব নেই। চলতে চলতে একদিন তাদের সঙ্গে দেখা হলো আরেকটি দলের সঙ্গে। ওই দলের লোকজন জানালো, তাদেরকেও তাদের রাজা রাজ্য থেকে বের করে দিয়েছে, কেননা তাদের গায়ের রং সাদা। তাদের রাজার ছেলের গায়ের রং কালো। রাজার ভয়, সাদাদের সঙ্গে নিজের গায়ের রং তুলনা করে রাজপুত্রের যদি মন খারাপ হয়! তাই যাদের গায়ের রং সাদা তাদেরকে জোর করে রাজ্য থেকে বের করে দিয়েছে রাজা। সাদাও থাকবে না, রাজপুত্র বড় হয়ে তুলনাও করতে পারবে না। কালো মানুষের দল সাদা মানুষগুলোর মন খারাপ করা কাহিনি শুনলো। একজন বললো, 'আচ্ছা, আমরা একটা কাজ করি, যারা কালো তারা চলে যাক কালো রাজার রাজ্যে, আর যারা সাদা তারা ঠাঁই নিক সাদা রাজার রাজ্য।'

অনেকেই লোকটির কথায় সায় দিলো। অনেকে চুপ থাকলো। বড়দের কথার মধ্যেই বলে উঠলো একটি ছোট মেয়ে, 'আমি কিছু বলতে চাই।'

'বড়দের মধ্যে তুমি কেন বাছা নাক গলাচ্ছো!' অনেকেই বিরক্ত হলো।

কিন্তু এক বুড়ো লোক বললো, 'ওকে বলতে দাও।'

মেয়েটি সাহস পেয়ে বলতে শুরু করলো, 'মানুষ সাদাও হয় না কালোও হয় না, মানুষ শুধু মানুষ হয়। কালোরা যদি কালো রাজার রাজ্যে আর সাদারা যদি সাদা রাজার রাজ্যে চলে যায় তাহলে সমস্যার সমাধান হবে না।' মেয়েটি সবার মাঝে দাঁড়িয়ে বলতেই থাকলো, 'সাদাদের সাদা আর কালোদের কালো বলে যারা মানুষের ওপর অত্যাচার করে তাদেরকে বলতে হবে- এমন করা ঠিক না।'

বুড়ো লোকটি বললো, 'এই মেয়ে ঠিক বলেছে। আমাদের এক হতে হবে এবং ওই রাজাদের কাছে গিয়ে বলতে হবে যে, তোমরা যা করছো তা অন্যায়, তোমাদের এ অন্যায় আমরা মানবো না।'

সবাই বললো, 'ঠিক! ঠিক! ঠিক!'

তারপর কি হলো জানো? সাদা-কালো বলে কেউ আর থাকলো না। সবাই একজোট হলো এবং ওই রাজাদেরকে গিয়ে বললো, 'তোমরা যা করেছো তা ঠিক করোনি। তোমাদেরকে আমরা আর মানি না। তোমরা সরে যাও!'

রাজারা কি আর যায়! তারা কথা শুনলো না। দুই রাজা এক হয়ে মানুষগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ শুরু করলো! অনেকদিন যুদ্ধ চললো। অনেক মানুষ মারাও গেলো। কিন্তু সবশেষে মানুষেরই জয় হলো। দুই রাজা রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে গেলো। তারপর ওই মানুষগুলো যে যার রাজ্যে সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে লাগলো।