ঘাস ফড়িং

ঘাস ফড়িং


রাবেয়ার ছোট্ট পতাকা

প্রকাশ: ২৪ মার্চ ২০২০      

গল্প লিখেছেন আহমেদ রিয়াজ ছবি এঁকেছেন রজত

রাবেয়ার দিনগুলো খারাপ কাটছে।

স্কুুল বন্ধ হয়ে গেছে সেই কবে! সারাদিন ঘরে বসে থেকে সময় কাটে? কাটে না। তার ওপর আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে, বাবা নেই। মায়ের কাছে জানতে চেয়েছিল রাবেয়া, 'বাবা কোথায়, মা?'

ছলছল চোখে মা বললেন, 'জানি না।'

তাহলে কি বাবা কিছু না বলে চলে গেলেন? কিন্তু বাবা তো এমন নন। ঘর থেকে বেরুনোর আগে মাকে বলে যান। রাবেয়াকেও বলে যান। তাহলে বাবার কি খুব তাড়া ছিলো?

দুপুরের মধ্যে খবরটা ছড়িয়ে গেলো। রাবেয়ার বাবা নিরুদ্দেশ। বিকেলেই রাবেয়াদের ঘরে এসে হাজির মতি চাচা। ওদের পাশের বাড়িতেই থাকে। মতি জানতে চাইলো, 'শুনলাম, রাবেয়ার বাবা নাকি নিরুদ্দেশ হয়েছে! সত্যি নাকি রাবেয়ার মা?'

মতিকে এলাকার কেউই সহ্য করতে পারে না। পারবে কী করে? তার মতো বদ লোক এ পাড়ায় দ্বিতীয়টি নেই। সবার বাড়ির ওপর কড়া নজরদারি করে। এলাকায় শান্তি রক্ষার নামে শান্তি কমিটিও করেছে। এলাকায় যারাই মুক্তিযুদ্ধে গিয়েছে, তাদের পুরো পরিবারকেই গায়েব করে দিয়েছে। সবাই জানে, সবই মতির কারসাজি। মতি পাকিস্তানি সৈন্যদের দিয়ে তাদের ওপর অত্যাচার করায়। কতো রকম অত্যাচার!

মা বললেন, 'ভুল শুনছেন। রাবেয়ার বাবা নিরুদ্দেশ হন নাই।'

এবার খিক খিক করে হাসতে হাসতে বললো মতি, 'তাহলে বুঝেছি। মুক্তির দলে নাম লিখিয়েছে।'

তারপরই মতির চোখ দুটো পান খাওয়া জিহ্বার মতো লাল হয়ে উঠলো। মায়ের দিকে তাকিয়ে বললো, 'রাবেয়ার বাপ কাজটা ভালো করে নাই।'

তারপর হিস হিস করতে করতে চলে গেলো।

মায়ের মনে দুশ্চিন্তা। মতি কি ওদের ওপরেও অত্যাচার চালাবে? রাবেয়া এসে দাঁড়াল বারান্দায়। লম্বা টানা বারান্দা। কী সুন্দর দখিনা বাতাস! পাশের বাড়ির দিকে তাকালো। ওটাই মতির বাড়ি। মতির বাড়ির ছাদে চাঁদ-তারা মার্কা পতাকা উড়ছে। তখনই মনে পড়লো রাবেয়ার। আরে! ও তো একটা পতাকা বানাচ্ছিলো। বাবার কাছে পতাকার একটা ছবি দেখেছিলো ও। সাদাকালো ছবি। পতাকা উড়াচ্ছিলেন বঙ্গবন্ধু। বাবা তখন ওকে বুঝিয়ে বলেছিলেন, 'এই যে পতাকাটা দেখছো; এর চারপাশটা সবুজ। মাঝে এই বৃত্তটা লাল। টকটকে লাল। সকালের সূর্যের মতো লাল। আর লাল সূর্যের মাঝে বাংলাদেশের মানচিত্র। হলুদ।'

টুকটাক সেলাইয়ের কাজ করেন মা। অনেক রকম কাপড় এমনিতেই থাকে। মাঝে মাঝে মাকে কাপড় গুছিয়ে দেয় রাবেয়া। গুছিয়ে দিতে দিতেই সবুজ কাপড় পেয়ে গেলো। আর লাল-হলুদ কাপড় তো থাকেই। ব্যস। পতাকা বানিয়ে ফেললো রাবেয়া। সুন্দর একটা পতাকা। রঙিন পতাকা!

মতির বাড়ির ছাদে তাকালো রাবেয়া। বিশাল পতাকা!

এবার নিজের বানানো পতাকার দিকে তাকালো। তাকিয়ে মনটা খারাপ হয়ে গেলো। ওর পতাকা এইটুকুন। এই টুকুন পতাকাটাই ও একটা লাঠির মাথায় বাঁধলো। তারপর সেটা মেলে ধরলো। আর কী অবাক! এইটুকুন পতাকাই বাতাস পেয়ে উড়তে লাগল পত পত করে। উড়ন্ত পতাকার দিকে তাকিয়ে এবার ওর মনটা ভালো হয়ে গেলো। হাঁক ছাড়ল রাবেয়া, জয় বাংলা!

হঠাৎ বাইরে থেকে কে যেন হাঁক দিলো, 'জয় বাংলা বলে কে রে!'

বাইরে তাকাল রাবেয়া, মতি চাচা!

ততোক্ষণে ওর পতাকাটা দেখে ফেলেছে মতি। আর দেখেই তার চোখ দুটো হয়ে গেলো টকটকে লাল। পান খাওয়া মুখের চেয়েও লাল। হাত বাড়িয়ে বাইরে থেকেই ওর পতাকাটা ছিনিয়ে নিলো মতি। তারপর দাঁত কটমট করে বললো, 'তোর বাপ মুক্তির দলে নাম লিখিয়েছে, তাতেও তোর আশ মেটেনি। আবার পতাকা বানিয়েছিস! দাঁড়া, তোদের মজা দেখাচ্ছি। একটু পরই টের পাবি।'

ধুক করে উঠলো রাবেয়ার ছোট্ট বুকটা। তাহলে কি মতি পাকিস্তানি সৈন্যদের গিয়ে ওর বাবার কথা জানিয়ে এসেছে? ওদিকে নিজের বানানো প্রিয় পতাকাটা মতির হাতে। রাবেয়ার দু'চোখ ফেটে কান্না আসছিলো। তখনই হঠাৎ রাবেয়া দেখলো চার পাকিস্তানি সৈন্য। মতির ঠিক পেছনে। নিশ্চয়ই মতির কাছ থেকে খবর পেয়ে ওরা এসেছে।

কিন্তু এ কী! হঠাৎ চার পাকি সৈন্যের আট চোখ উঠে গেলো কপালে। মতির হাতে বাংলাদেশের পতাকা!

'ছি: মতি, ছি:! সাচ্চা পাকিস্তানি হয়ে কিনা জয় বাংলার পতাকা তোমার হাতে!'

'মতি, তুমি তো আচ্ছা গাদ্দার! মুক্তির হাতে জয় বাংলার পতাকা থাকলেও মানা যেত। তোমার হাতে!'

মতি নিজেও অবাক। কিছু একটা বলতে চাইল মতি। কিন্তু সুযোগ পেলো না। হঠাৎ রাইফেলের বাঁটের একটা বাড়ি খেলো মতি। এক বাড়িতেই কুপোকাত। মতি পড়ে গেলো মাটিতে। অজ্ঞান। অজ্ঞান মতিকে এরপর টেনে-হিঁচড়ে চার পাকি সৈন্য নিয়ে গেলো ক্যাম্পে। এলাকার সবার চোখের সামনে দিয়ে। হ