ঘাস ফড়িং

ঘাস ফড়িং


ছোট্ট মিলার বন্ধু করোনা

প্রকাশ: ১০ মার্চ ২০২০      

গল্প লিখেছেন নওশিন রোদেলা।। ছবি এঁকেছেন রজত

ছোট্ট মিলা। বাংলাদেশে তার জন্ম। তবে জন্মের এক বছর পর তার বাবার ট্রান্সফার হয়ে গেলো। চলে গেলো চীন। সেই ছোট্ট মিলা এখন প্রথম শেণিতে পড়ে। চীনেই। মিলার বাসায় কে কে থাকে? বাবা-মা আর মিলা। ছোট্ট মিলা কার্টুন দেখতে খুব ভালোবাসে। সারাদিনই সে কার্টুনে ডুবে থাকে। একদিন মিলা টিভি দেখছিলো। কার্টুন চ্যানেল। কিছুক্ষণ পরপরই একটা ভাইরাসের কথা বলে টিভিতে। সারাদিন ওই ভাইরাসের কথা বার বার বলেছে। কী যেন নাম বললো? হ্যাঁ, করোনাভাইরাস। মিলা ভাবলো, এই ভাইরাস তো খুব সাংঘাতিক। এটা তো আমার টিভি দেখা বন্ধ করে দিচ্ছে। সে তার মাকে বললো, মা জানো, একটা ভাইরাস এসেছে। করোনাভাইরাস। সে শুধু আমাকে জ্বালায়।

মা বললেন, 'তোকে? কীভাবে জ্বালায় রে?'

তুমি তো জানো না, সে শুধু আমার কার্টুনের বিজ্ঞাপনে আসে। তা ছাড়া টিভিতে এখন কার্টুন দেখায় না বললেই চলে। দিনমান শুধু এই ভাইরাসের বিজ্ঞাপন দেখায়।

মা বলেন, 'ও; তা এই ব্যাপার! তবে করোনাভাইরাস অনেক বড় ক্ষতি করে মানুষের।'

মিলা বলে, আচ্ছা, তার মানে, এটা কেবল দুষ্টুই না, দুষ্টুর বড়ো ভাই!

মা বলেন, 'করোনাভাইরাস নিঃশ্বাসের সঙ্গে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে, আর এতে মানুষ অসুস্থ হয়ে যায়।'

মিলার তখনই জেদ চাপলো ঘাড়ে। যে করেই হোক, সে করোনাভাইরাসকে খুঁজে বের করবেই। মা সবটা দেখলেন। দেখেও কিছু বললেন না। সারাদিন টিভি দেখলে মিলার চোখ নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তার চেয়ে ভালো করোনাভাইরাসই খুঁজুক। অনেক খুঁজলো সে। একসময় মনে হলো, করোনা ভাইরাস তো খালি চোখে দেখা যাবে না। সে একবার স্কুলে বার্ষিক পরীক্ষায় প্রথম হয়ে উপহার হিসেবে একটা ম্যাগনিফাইং গ্লাস পেয়েছিলো। অই গ্লাস দিয়ে করোনাভাইরাসকে খোঁজার চেষ্টা করলো। টানা তিন দিন খুঁজলো। একদিন ম্যাগনিফাইং গ্লাসটা স্কুলেও নিয়ে গেলো। বন্ধুদের গায়ে দেখলো ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে। কিন্তু কোথাও করোনাভাইরাস পেলো না।

এক বিকেলে মিলা ঘুমুচ্ছে। হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে দেখে, তার হাতের ওপর কী যেন ঘুরে বেড়াচ্ছে। সে ভাবলো, কোনো পোকা হয়তো হবে। সে চোখ খুললো। ঝাপসা চোখে দেখলো, কী রকম যেন একটা ভাইরাস তার হাতে। সে এক হাত দিয়ে চোখ চুলকালো। দেখলো, কে যেনো তার নাম ধরে ডাকছে। সে আশপাশে তাকালো। কেউ নেই। নিচে তাকিয়ে দেখলো। অই পোকাটা মিলাকে ডাকছে। পোকা কি কথা বলতে পারে? মিলা নিজেকে একটা চিমটি কেটে দেখলো। না, এটা তো সত্যি। মিলা বলে, তুমি কে? 'আমি করোনি। করনুর মেয়ে। করনু আমার বাবা। আমার দাদার ছেলে। আমার দাদার নাম হলো করোনা। তুমি তো আমার দাদাকে বিজ্ঞাপনে দেখেছো।'

মিলা বলে, ও তুমিই তবে সেই করোনা?

করোনি বললো, 'না গো আমি করোনা নই, আমি করোনি।'

মিলা বললো, আমার কাছে নামগুলো কেমন জানি গুলিয়ে যাচ্ছে। আবার বলো তো।

করোনি বললো, 'আমি করোনি। আমার মা কারিনি, আমার বাবা করনু। আমার দাদা করোনা। আমার একটি ছোট ভাই আছে, তার নাম করন। এবার বুঝছো?'

মিলা বললো, এবার সব পরিস্কার। কিন্তু তুমি মানুষের ক্ষতি করো কেন?

'আমি বড়ো মানুষের ক্ষতি করি না। তোমার মতো বাচ্চাদের ক্ষতি করি। আর আমার ভাই করন; সে খুব ছোট্ট বাচ্চাদের ক্ষতি করে। আমার বাবা ছেলেদের ক্ষতি করে, মা ক্ষতি করে মেয়েদের। আর আমার দাদা সবচেয়ে শক্তিশালী। সে সবার ক্ষতি করে।'

মিলা বলে, হুম, তোমরা মানুষের ক্ষতি করো কেন?

করোনি বলে, 'তোমরা যেমন ভাত-তরকারি খাও, তেমনি আমরা মানুষের সুস্থতা খাই।'

মিলা বলে, কেন, ভাত-তরকারি খেতে পারো না?

করোনি বলে, 'না'।

মিলা বলে, একবার খেয়েই দেখো না; ভাত, মাছ, মাংস কতো মজা!

করোনি বলে, 'আচ্ছা, তুমি যখন বলছো, তবে একটু খেয়ে দেখতে পারি।'

তখনই রান্নাঘর থেকে মা খেতে ডাকলেন মিলাকে। মিলা তার একটা খেলনা বাটি নিলো। তাতে কিছু ভাত, মাছ, তরকারি আর একটু মাংস দিলো। তারপর বললো, নাও, এটা তুমি খেয়ে নিও। আর তোমার পরিবারকেও খেতে দিও। কিছুক্ষণ পর করোনি এসে বললো, খাবারটা খুব মজা হয়েছে। তারপর থেকে ওরা সবাই মানুষের খাবারই খেতে থাকলো। আস্তে আস্তে পৃথিবীতে করোনাভাইরাস কমতে লাগলো। এরপর থেকে মিলা আর সারাদিন কার্টুন দেখতো না। রোজ বিকেলে করোনির সঙ্গে খেলতো।