ঘাস ফড়িং

ঘাস ফড়িং


সিংহাসনে সিংহরাজ

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২০      

গল্প লিখেছেন আরাফাত শাহরিয়ার ছবি এঁকেছেন রজত

সে অনেক অনেক আগের এক পশুরাজ্যের কথা। রাজ্যের সব ভালোই চলছিলো। বনের রাজা সিংহমশাই। বয়সের ভারে খানিকটা ন্যুব্জ। সিংহমশাই নিজে পরিচ্ছন্ন থাকেন, বনের অন্যদেরও নোংরা হওয়া বারণ! আর এটাই হচ্ছে সমস্যা। অনেকেই নাখোশ। ফলে তারা রাজার পরিবর্তন চাইতে শুরু করলো। একদিন রাজাকে বাদ দিয়েই সভা আহ্বান করলো অন্য রাজ্যে। মিটিং হলো, ইটিংও হলো। ঠিক হলো শুয়োরকে রাজসিংহাসনে বসাবে। সিংহরাজকে কোনোমতেই সিংহাসনে থাকতে দেবে না রাজ্যের এই সভ্যরা। গোপন সভার খবর সিংহরাজের কানে গেলো। তিনি বুঝতে পারলেন, অনুগত অনেকেই তার বিরুদ্ধে চলে গেছে। পরিস্থিতিও খানিকটা প্রতিকূল। সেই সুযোগে পালে হাওয়া লাগালো অনেকেই। রাজা সব শুনলেন, বুঝলেন, অবলোকন করলেন। তার কী বা করার আছে!

পরিকল্পনামাফিক সব ঠিকঠাক এগুলো। এলো সেই দিনক্ষণ! চারদিকে বাদ্যি বাজলো। আলোকসজ্জা হলো। ফুলের মালা গলায় পরে শুয়োর বসলো সিংহাসনে। অবশ্য একটি শর্ত জুড়ে দেওয়া হলো। ভালোভাবে রাজ্যশাসন না করতে পারলে শুয়োরকে রীতিমতো অপমান করে বের করে দেওয়া হবে রাজ্য থেকে। পশু সাম্রাজ্যের সম্রাটের এ আদেশের বিষয়ে রাজ্যের কেউ টু শব্দটি করার সাহস পেলো না। সম্রাট জানতেন, কী হতে যাচ্ছে। তিনি মনে মনে হাসলেন।

রাজ্যের অনেকে বলাবলি করতে লাগলো, এবার বনের উন্নতি হবে। কিন্তু রাজা উন্নতি করবে কী, উল্টো রাজ্যের বারোটা বাজালো। রাজ্যে মারামারি, কাটাকাটি, হানাহানি লেগেই থাকলো। এসব দিকে রাজার মন দেওয়ার সময় কোথায়! তিনি কেবল একটি বিষয় নিয়েই ব্যতিব্যস্ত। যতো সুখাদ্যই দেওয়া হোক না কেন, রাজা ছুটে যান নর্দমায়। সেখান থেকে খাবার না খেলে তার মন ভরে না।

রাজামশাইয়ের কাণ্ড-কারখানায় রাজ্যের অনেকেই বিব্রত হলো, লজ্জাও পেলো। শিয়ালপণ্ডিত বিষয়টির সুরাহায় উদ্যোগ নিলেন। রাজসভায় ডেকে আনলো বাঘবাহাদুরকে। এতোদিন প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব পালন করে এসেছে বাঘবাহাদুর। নতুন রাজসভায় তার বদলে নিয়োগ পেয়েছে এক শুয়োর। তাতেও তার ক্ষোভ নেই। রাজ্যের সুনাম ও শৃঙ্খলা বজায় থাকলেই হয়। বাঘবাহাদুর বললো, 'রাজামশাই, আপনি যা বলবেন, তাই সই। শুধু নর্দমার দিকে যাওয়া যাবে না। রাজ্যের সম্মান যে যায় যায়!'

খবর শুনে হাতিও ছুটে এলো। বললো, 'রাজামশাই, আপনার যা যা লাগে, তা বহন করার জন্য এই বান্দা সবসময় হাজির! কিন্তু নর্দমামুখো হবেন না দয়া করে।'

একদিন যায়। দু'দিন যায়। এভাবে দিনকয়েক চললো। কিন্তু নর্দমা না ঘাটলে নতুন রাজা শুয়োরের জিভ নিশপিশ করে। অবস্থা এমন, রাজামশাইকে রাজসিংহাসনে বেঁধেও রাখা যায় না। শুয়োররা বললো, 'রাজা রাজাই। রাজা যা খাবে, সেটাই রাজখাদ্য। সেটা হরিণের গোশতই হোক বা নর্দমার পচা খাদ্য।' 'আমাদের রাজাই সেরা'- রীতিমতো ঘোষণা দিয়ে বসলো রাজ্যের এক শুয়োর।

রাজদরবারে রাজাকে ঘিরে থাকে শুয়োররা। অথচ আগে সেখানে সবার প্রতিনিধি থাকতো। রাজ্যজুড়ে রাজার অবিচার, অনিয়ম আর স্বেচ্ছাচারিতা। রাজ্যের কোনো সমস্যা সমাধানে রাজার মন নেই। উল্টো তার কারণে রাজ্যে সমস্যা বাড়তেই থাকলো। এসব খবর ছড়িয়ে গেলো আশপাশের রাজ্যে। এই অনিয়মের খবর সম্রাটও শুনলেন। তিনি মুচকি হাসলেন। মনে মনে বললেন, 'বোকারা, ভুল সিদ্ধান্তের ফল তো পেতেই হবে।'

রাজার পরিবর্তনে হনুমানরা ছিলো বেশ সোচ্চার। তারাও দেখলো বিপদ। রাজা যে তাদের শেষ সম্বল সম্মানটুকুও রাখলো না। কারণ বন পাহারাদারের দায়িত্ব এতোদিন তাদেরই ছিলো। সিংহরাজের কাছ থেকে সম্মানও জুটতো বেশ। এখন রাজার প্রতিশ্রুতি কথাতেই থেকে যায়।

বনের সবাই দেখলো, কেবল শুয়োরদেরই স্বার্থরক্ষা হয়। রাজদরবারে কেবল তাদেরই প্রতিনিধিত্ব। সব খবর সম্রাটের কানে গেলেও তিনি এতদিন চুপ ছিলেন। এবার তিনি আর নীরব থাকলেন না। একদিন তিনি রাজাকে বরখাস্ত করলেন। রাজার হয়ে অনেক চেষ্টা-তদবির করলো শুয়োররা। তার পক্ষে বানিয়ে অনেক কথা বলা হলো। 'তার মতো রাজাই হয় না', 'তিনিই সেরা' ইত্যাদি ইত্যাদি। সম্রাট তো আর বোকা নন! তিনি অপমান করে রাজ্য থেকে বের করে দিলেন শুয়োর রাজাকে।

সম্রাট বললেন, 'কয়লা ধুলে ময়লা যায় না অর্থাৎ স্বভাব কখনও বদলায় না।' তিনি ঘোষণা দিলেন, 'সিংহরাই রাজা হবে, শুয়োরদের রাজসিংহাসনে মানায় না।' তিনি সিংহরাজকে ফের সিংহাসনে বসার অনুরোধ করলেন। সিংহরাজ আর সিংহাসনে বসতে রাজি হলেন না। তিনি বললেন, 'যোগ্য সিংহদের মধ্য থেকে নতুন কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হোক।' সেই থেকে বনে সিংহরাই রাজ্যশাসন করে আসছে। হ