ঘাস ফড়িং

ঘাস ফড়িং


বইমেলায় টোনা ও টুনি

প্রকাশ: ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২০      

রুবেল হাবিব

একদেশে ছিল এক টোনা আর টুনি।

টোনা টুন করে গান গাইলে টুনি গাইতো টিন করে।

সেই গানে সারাক্ষণ দেশে বাজতো সুর টুনটুন টিনটিন। টুনটুন টিনটিন।

এভাবে চলছিলো গান।

সকাল থেকে দুপুর, দুপুর থেকে বিকেল, বিকেল থেকে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা থেকে রাত। টোনা গায় টুনি গায়। গানে গানে মেতে থাকে দেশ, গ্রাম, নগর ও বন।

একদিন সকালে কী হলো। টোনা টুন করে না। টুনি করে না টিন। গান হয় না টুনটুন টিনটিন। সেই দেশে সকাল থেকে কোনো আওয়াজ নেই, গান নেই, সুর নেই, তাল নেই।

টোনা-টুনির এই চুপ করে থাকাতে সবাই অবাক হয়ে যায়। শহর থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে বন। সবখানে এক আলাপ। এক কথা। কোথা টুনি, কোথা টোনা, কোথা তাদের গান।

কেউ বলে টোনা-টুনি রাগ করেছে। কেউ বলে ওরা পণ করেছে আর গান ধরবে না। কেউ আবার একটু বাড়িয়ে বলে তারা ভীষণ অসুস্থ। তাই তারা গান করছে না।

বনের সব পশুপাখি ছুটে এলো। সবাই গাছতলায় হাজির। জিরাফ ঘাড় উঁচু করে ডাকল- ও টোনা, ও টুনি তোমারা কোথায়, সাড়া দেও এক্ষুনি।

জিরাফের ডাকেও তাদের সাড়া নেই।

শিয়াল মামা হুক্কাহুয়া করে বলে- ও টোনা, ও টুনি আমরা তোমাকে দেখতে এসেছি, একটু দেখা দেও, সাড়া দেও।

এবারও সাড়া নেই টোনা আর টুনির।

কোকিল কুহু কুহু করে গানের সুরে বললো-

কোথায় টোনা কোথায় টুনি

একটু দেখা দেও এক্ষুনি

কী হয়েছে শুনি?

বনের যত পশুপাখি

আদর নিয়ে যাচ্ছে ডাকি

কোথায় টোনা-টুনি।



বানর বলে- বনের রাজা এসেছে, বনের সব পশুপাখি এসেছে। কেউ যদি কোনো অন্যায় করে থাকে এখনই বিচার হবে। দয়া করে আমাদের দিকে সাড়া দেও।

নিশ্চুপ টোনা, নীরব টুনি।

শেষমেশ কাঠবিড়ালি গাছ বেয়ে বেয়ে উঠে গেল টোনা-টুনির বাড়িতে। দরজায় টোকা দেয়; কোনো সাড়া নেই, শব্দ নেই। জোরে ঠেলা দেওয়াতে দরজা খুলে গেল। দরজা খুলে যা দেখে তাতে কাঠবিড়ালি 'থ'। টোনা গালে হাত দিয়ে বসে আছে। টুনিও গালে হাত দিয়ে বসে আছে।

কাঠবিড়ালি যেই টোনাকে ধাক্কা দিল অমনি টোনা নড়ে বসলো। গাল থেকে হাত নামালো।



টুনিও হাত নামালো, নড়েচড়ে বসলো।

এতক্ষণে তাদের হুঁশ ফেরত আসলো।

তাদের এই চুপ হওয়ার কাহিনি শুনে টোনা 'থ', টুনি 'থ'।

তাড়াহুড়া করে কাঠবিড়ালির সঙ্গে নিচে নেমে এলো।

সবাই টোনা-টুনিকে বলতে থাকে, কী খবর তোমাদের? শরীর খারাপ করেছে নাকি? রাগ করেছ নাকি? গান করো না কেন?

মুখ ভার করে টোনা বলে গেল- আমাদের মাফ করবেন।

টুনি বলে আমরা একটা বিষয় নিয়ে খুব ভাবছিলাম।

সবাই বলে, কী ভাবনা?

টোনা বলে- মেলা

টুনি বলে- বইমেলা।

শিয়াল পণ্ডিত বলে, সে তো বইমেলা ঢাকায়। তো এর সঙ্গে তোমাদের এমন গভীর ভাবনা কেন?

টোনা একটু হাসি দিয়ে বলে, সেখানেই তো আমাদের ভাবনা।

টুনি বলে, সেখানে যাবার জন্যই তো আমাদের উপায় খোঁজার ভাবনা।

বাঘ মামার আর তর সইছিলো না, তিনি হালুম হালুম করে বলে বসলেন- একটু খোলাসা করে বলো দেখি।

এবার টোনা একটু ভাব নিয়ে বলা শুরু করলো- তোমরা সবাই জানো আমরা পশুপাখিরা কেউ পড়তে জানি না। আমরা লিখতে জানি না। শিয়াল মামার পাঠশালা ছাড়া আমাদের শেখার কোনো জায়গা নেই। তাও আবার পাঠশালা বন্ধ দিনের পর দিন।

শিয়াল মামা মাথা নেড়ে সায় দেয়।

টুনি এবার বলা শুরু করে, আমরা পড়তে না জানলেও আমরা বইয়ের পাতায় পাতায় আছি।

সবাই বলে, ঠিক-ঠিক।

টোনা বলে, আমাদের ভাবনা সেখানেই। সবাই আমাদের নিয়ে লিখে। সবাই আমাদের নিয়ে নানা কাহিনি পড়ে। সেইসব কাহিনি নিয়ে মজার মজার বই মেলায় আসে। অথচ আমরা মেলায় যেতে পারি না। আমাদের কেউ নিয়ে যায় না।

আমরা গোঁ ধরেছি, এখন থেকে আমাদেরকেও বইমেলায় নিয়ে যেতে হবে। খুব জোরে জোরে বলে ওঠে টুনি।



টোনা-টুনির কথা শুনে সবাই ঠিক, তাই ঠিক বলে ওঠে।

মিছিল ওঠে- মেলায় যাব, মেলায় যাব, বইমেলায় আমরাও যাব।

বনের রাজা সিংহ এতক্ষণ চুপচাপ শুনছিলেন। এবার তিনি ধমক দিয়ে মিছিল থামিয়ে দিলেন। তিনি মুখ অতি ভার করে বলা শুরু করলেন- তোমরা মনোযোগ দিয়ে শোন। টোনা আর টুনি যা ভাবছিল তা আমারও ভাবনা। তোমাদেরও ভাবনা।

সবাই জোরে জোরে বলে ওঠে- ঠিক ঠিক ঠিক। আমাদেরও ভাবনা এ কথাটা সত্যি ঠিক।

রাজা আবার বলা শুরু করেন, আমরা শিশুদের বইয়ে আছি, আমাদের গল্প পড়ে শিশুরা আনন্দ পায়, আমাদের নিয়ে ছড়া পড়ে মজা করে অথচ আমরা সে শিশুদের কাছে গিয়ে আনন্দ দিতে পারি না। আমরাও তাদের কাছে গিয়ে আনন্দ দিতে চাই। আদর করতে চাই। আমরাও বইমেলায় যেতে চাই। কী বলো তোমরা?

সবাই বলে হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ।

আমরাও যাব বইমেলায়। আমরাও যাব বইমেলায়।



সিংহ বলে, ঠিক আছে চলো তাহলে আমরা রওনা দিই। তবে একটা শর্ত, আমরা কেউ যেন কারও ক্ষতি না করি। কাউকে যেন আঘাত না করি। কাউকে যেন অপমান না করি।

সবাই বলে, আমরা শর্ত মেনে নিলাম।

এবার রাজা বলেন- ঠিক আছে তাহলে। চলো আমরা বইমেলায় যাই। বইমেলায় যাই।

যেই কথা সেই কাজ।

যে যার মতো বইমেলায় ছুটলো।

টোনা আর টুনি টুনটুন টিনটিন করে গান গাইতে গাইতে ছোটে।



হাতি ছুটে হেলেদুলে শুঁড় নাচিয়ে।

ঘোড়া ছোটে টাটাক টাটাক করে।

শিয়াল ছোটে হুক্কাহুয়ার সুরে।

একে একে বনের সবাই ছুটে যায়। কেউ দলবেঁধে, কেউ নেচে নেচে কেউবা আবার একা একা।

মেলায় ঢুকেই একেকজন একেক বইয়ে নানা ঢঙে নানা, রূপে ঠাঁই নেয়।

আর শিশুরা তাদের আদর করে বুকে তুলে নেয়। মজার মজার ছড়া কাহিনি পড়ার আশায়। হ