বাঘা ও কাঠঠোকরা

প্রকাশ: ২৩ জুলাই ২০১৯      

অনুবাদ করেছেন হাসান হাফিজ।। ছবি এঁকেছেন রজত

এক ছিলো বাঘ। যেমন দশাসই তার চেহারা, তেমনি তার হম্বিতম্বি ও চোটপাট। কাউকে দেখলেই রাগে গরগর করে। বনের সব পশু-পাখি তাকে রীতিমতো ভয় পায়। ভয় না পেয়ে তারা করবেই বা কী? 'বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা' বলে একটা কথা আছে না? তো সেই বাঘ মশাই একদিন পড়লো মহাবিপদে। যেমন তেমন বিপদ নয়, যাকে বলে জান নিয়ে টানাটানি!

হয়েছে কী, বাঘ একটা বড়োসড়ো পশু শিকার করেছিলো একদিন। প্রচণ্ড খিদে পেয়েছিলো তার। একটা ঝাঁকড়া গাছের নিচে পশুটাকে রেখেছিলো। খাবলে খুবলে মাংস খেতে গিয়ে একটা হাড় আটকে গেলো গলায়। বেকায়দা জায়গায় গিয়ে বিঁধেছে চোখা এই হাড়টি। মর জ্বালা! হাড়ের যন্ত্রণায় বাঘের গলা এখন প্রায় বন্ধ। অনেক চেষ্টা করেও বাঘ মামা তার গলায় আটকে থাকা হাড়টা বের করে আনতে পারলো না। ফলে যা হওয়ার তা-ই হলো। সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেলো খাওয়া-দাওয়া।

ওই ঝাঁকড়া গাছে বাস করতো একটা কাঠঠোকরা পাখি। মগডালে বসে পাখিটা বাঘের গাপুস গুপুস খাওয়া দেখছিলো। এক পর্যায়ে কাঠঠোকরা দেখে, বাঘের খাওয়া বন্ধ। সে কেমন যেন গোঙাচ্ছে। কাঠঠোকরা তারপর কোথায় যেন উড়ে গেলো। জঙ্গলের এক প্রান্তে একটা গাছে সে ফোকর তৈরি করছিলো। কাজ সামান্য বাকি। পরের দিন সে দেখলো বাঘ একই জায়গায় গোঙাচ্ছে। এভাবে দিন যায়, রাত যায়। বাঘ ওই জায়গা থেকে নড়ে না, চড়ে না। কয়েক দিন না খেয়ে খেয়ে সে কাহিল হয়ে পড়েছে। কী ব্যাপার? কাঠঠোকরা মনে মনে নিজেকেই প্রশ্ন করে। কোনো উত্তর পায় না। অগত্যা সে গাছের নিচে নেমে আসে। দরদি গলায় বাঘকে জিগ্যেস করে-

'ভাই রে, তোমার কী হয়েছে বলো তো? কয়েকদিন ধরে দেখছি, তুমি সারাক্ষণ মুখটা হাঁ করে রাখছো। কোথাও যাচ্ছও না। বলি, কী হয়েছে একটু খুলে বলো না আমাকে।'

বাঘ একটা থাবা দিয়ে ইশারা করে দেখানোর চেষ্টা করে তার মুখের ভেতরের করুণ হাল।

কাঠঠোকরা সমস্যাটা বুঝে সঙ্গে সঙ্গে। বলে- 'আহা রে! তোমার নিশ্চয়ই খুব কষ্ট হচ্ছে। আমি তোমার এই যন্ত্রণা দূর করে দিতে পারি। কয়েক মিনিটের ব্যাপার মাত্র। তবে কি-না একটা শর্ত আছে। তুমি যা রোজ শিকার করবে, তার থেকে আমাকে খানিকটা অংশ দিতে হবে। প্রতিবারই। তুমি যদি রাজি থাকো, তাহলে ভাই আমি কাজ শুরু করতে পারি।'

মরণ যন্ত্রণায় বাঘ কাতরাচ্ছিলো। কাঠঠোকরার প্রস্তাবে সে মাথা নাড়ে। অর্থাৎ রাজি। মাথা নেড়েই সম্মতি দেয়। কারণ, গলায় হাড় আটকে থাকার কারণে সে কথা বলতে পারছে না।

কাঠঠোকরা সাঁই করে উড়ে গিয়ে বাঘের মুখে ঢুকে গেলো। চোখা ঠোঁট দিয়ে হাড়টাকে শক্ত করে ধরলো। তারপর বের হয়ে এলো হাড়টা নিয়ে। হাড় নিয়ে সে গাছের মগডালে গিয়ে বসে। তারপর হাড়টা টুপ করে বাঘের মাথায় ফেলে কাঠঠোকরা।

দুই.

হাড়ের জ্বালা যন্ত্রণা থেকে বাঘ এখন মুক্ত। জানে বেঁচে গেছে সে। বাঘ ভাবলো, এই ক'দিনে শরীর ভীষণ দুর্বল হয়ে পড়েছে। শিগগিরই কিছু খেতে হবে। শিকার ধরতে হবে আগে। না খেয়ে খেয়ে শরীরটা ভীষণ কাহিল হয়ে পড়েছে। যেই ভাবা সেই কাজ। কয়েক ঘণ্টার চেষ্টায় একটা শিকার পাকড়াও করলো। সেটাকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে এলো সেই ঝাঁকড়া গাছের তলায়। মহানন্দে খাওয়া শুরু করলো। কাঠঠোকরা তখুনি উড়ে এলো তার কাছে। শর্ত অনুযায়ী শিকারের ভাগ চাইলো। বাঘ তাকে পাত্তাই দিলো না। এমন একটা ভাব করলো, যেন কাঠঠোকরাকে সে চেনেই না। কোনো দিন দেখেইনি। উল্টো সে চোখ রাঙিয়ে জানতে চায়-

'তা বাপু, কে হে তুমি? তোমাকে কেন আমার কষ্টের করা শিকারের ভাগ দিতে যাবো আমি?

এই কথা শুনে কাঠঠোকরা ভীষণ অবাক। ব্যাটা অকৃতজ্ঞ বলে কী? আমাকে সে চিনতেই পারছে না। এতো বড় উপকার করলাম ওর। জানই বাঁচালাম বলতে গেলে। আর প্রতিদানে কি-না এই? নিজেকে কোনোমতে সামলেসুমলে নিয়ে সে বলে, 'তুমি আমাকে চিনতে পারছো না? তোমার মনে নেই কী বড় বিপদ থেকে আমি তোমাকে উদ্ধার করেছি। তোমার গলায় যে হাড় আটকে গিয়েছিলো, সেটা ছাড়িয়ে দিয়েছে কে?'

বাঘ এ কথা শুনে হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে। বলে, 'দ্যাখো বাপু, আমি হচ্ছি গিয়ে বন্যপ্রাণী। তুমি যখন আমার মুখের ভেতরে ঢুকেছিলে, তখন তোমাকে খুব সহজেই খেয়ে ফেলতে পারতাম! খেয়ে যে ফেলিনি, সেটা তোমার সাত পুরুষের পুণ্যি। তুমি উল্টো আমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকো। কারণ, আমি তোমাকে বাগে পেয়েও খেয়ে ফেলিনি।'

এ কথা শুনে ভীষণ চটে গেলো কাঠঠোকরা। বাঘটা এতো পিশাচ ও নিচু মনের হতে পারে, এটা সে কল্পনাও করেনি। আপন মনে সে বিড় বিড় করে, 'রোসো বাছা। তোমাকে আমি আজ উচিত শিক্ষা দেবো। এমন শিক্ষা, যা জন্মেও ভুলতে পারবে না। হতে পারে বাঘের চেয়ে আমার গায়ে জোর কম। কিন্তু আমার তো শক্তপোক্ত সুচোলো দুটি ঠোঁট রয়েছে। সেগুলোই আমার ভরসা।

নিজের মনে এই কথাগুলো বলে সে অপেক্ষা করতে থাকে। পেট পুরে খেয়ে বাঘ ঘুমিয়ে পড়ে। নাক ডাকতে থাকে আয়েশে। কতোদিন এমন খাওয়া হয়নি। গভীর ঘুমে অচেতন হয়ে পড়ে কিছুক্ষণের মধ্যেই।

কাঠঠোকরা দেখে, এখনই বদলা নেওয়ার উপযুক্ত সময়। অকৃতজ্ঞ বাঘটা নাক ডেকে ঘুমোচ্ছে। ছোঁ মেরে সে বাঘের চোখে হামলা চালায়। আঘাতে আঘাতে ছিন্ন ভিন্ন করে ফেলে বাঘের একটা চোখ। বাঘ ধড়মড় করে জেগে ওঠে। চোখ থেকে দরদর করে রক্ত ঝরছে। এতোক্ষণে একটা চোখ পুরোপুরি অন্ধ হয়ে গেছে তার। প্রচণ্ড গর্জন করতে করতে সে চিৎকার করে ওঠে, 'নচ্ছার কাঠঠোকরা! তুই আমার একটা চোখ গালিয়ে দিয়েছিস। এতোটা পাষণ্ড তুই কীভাবে হতে পারলি? তোর প্রাণে কী একটুও মায়াদয়া নেই?' কাঠঠোকরা নির্বিকার। মনের মতো বদলা নিতে পেরে তার মনটা খুশি খুশি। মুচকি হেসে সে বলে, 'তুমি তো বেশ ভালো করেই জানো, আমার ঠোঁট কতোটা ধারালো। আমিও তো চাইলে তোমার দ্বিতীয় চোখটিও অন্ধ করে দিতে পারতাম। সেটা আমি করিনি। তার জন্যে আমার কাছে কৃতজ্ঞ থাকো। আর, ফালতু ফালতু গর্জন করো না। ব্যাটা অকৃতজ্ঞ কোথাকার!' হ

পরবর্তী খবর পড়ুন : সাদুল্যাপুরে নতুন কমিটি

অন্যান্য