দিন রাত্রি

দিন রাত্রি

সুখরাজ্যের আনন্দ আর সুখ

প্রকাশ: ৩০ জুন ২০২০

গল্প লিখেছেন নিশাত সুলতানা। ছবি এঁকেছেন রজত

এক যে আছে মজার রাজ্য; নাম তার সুখরাজ্য। সুখরাজ্যে আছে শুধু সুখ আর সুখ। মজার ব্যাপার হলো, সুখরাজ্যে কোনো কিছু নিয়ে কেউ কখনও জোর করে না। এখানে যার যা ভালো লাগে, সে তাই করে। তবে অবশ্যই কাজটি হতে হবে ভালো কাজ। সুখরাজ্যের রাজা সুখবল, রানী কঙ্কাবতী। রাজা ও রানীর এক ছেলে আর এক মেয়ে। রাজপুত্রের নাম আনন্দ আর রাজকন্যার নাম সুখবতী। যমজ ভাইবোন ওরা।

আনন্দ রান্না করতে খুব ভালোবাসে। সুখবতীও রান্না করতেশিখেছে। কিন্তু রান্না করতে খুব একটা ভালো লাগে না তার। আনন্দ প্রায়ই মজার মজার রান্না করে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয়। অন্যদিকে সুখবতী ভালোবাসে ঘোড়ার পিঠে ছুটে বেড়াতে। সুখবতীর ঘোড়ার নাম রঙলাল। রঙলালের যেমন সাহস, তেমনি গতি। বাতাসের গতিও যেন হার মানে তার কাছে। এমন ঘোড়াকে সামলানো চাট্টিখানি কথা নয়। প্রজারা রাজকন্যার সাহস দেখে খুব অবাক! রাজপুত্র আর রাজকন্যার বয়স এখন পনেরো। সুখবতী ঘোড়া চালনা আর যুদ্ধবিদ্যায় আরও পাকা হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে রাজপুত্র আনন্দ এরই মধ্যে শিখে ফেলেছে প্রায় ২০০টি রান্না। রাজপুত্র আনন্দ একদিন রাজ দরবারের সবার জন্য রান্না করেছে মুরগির মসলিনী বিরিয়ানি, খাসির গুলাবি রেজালা, আনারসের দোলমা, জাফরানি জর্দা, শরবত-ই শাহি মালাই। সেসব খাবার খেয়ে তো একেবারে মুগ্ধ সবাই।

সুখরাজ্যের তিনটি রাজ্য পর পলাশনগর রাজ্য।পলাশনগর রাজ্য রান্নার জন্য বিখ্যাত। প্রতিবছর ফাল্কগ্দুন মাসে সেখানে আয়োজন করা হয় রান্না প্রতিযোগিতা। সেখানে অংশ নেয় আশপাশের রাজ্যের সেরা রাঁধুনিরা। সেরা রাঁধুনিকে দেওয়া হয় কোহিনূর হীরা বসানো স্বর্ণের মুকুট। সুখরাজ্য কখনও এই প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়নি। আনন্দ ঠিক করল সে নিজেই এবার পলাশনগর রাজ্যের রান্না প্রতিযোগিতায় অংশ নেবে। ফাল্কগ্দুন মাসের বিশ তারিখে রান্না প্রতিযোগিতা। রাজপুত্র আনন্দ রান্নার প্রয়োজনীয় উপকরণ নিয়ে একেবারে তৈরি। রাজপুত্র আনন্দ রাজহাতি নীলবাহারের পিঠে চড়ে পলাশনগর যাবে। নীলবাহারের তার গজদন্তের জন্য বিখ্যাত! নীলবাহারের গজদন্ত যেমন সাদা, তেমনি মসৃণ! অন্ধকারে আলো ঠিকরে বের হয় এগুলো থেকে! তবে নীলবাহারের একটাই সমস্যা। কোনো কারণে একবার কষ্ট পেলে নীলবাহারের কান্না চলতেই থাকে। রাজপুত্রের হাতির বহরে আছে আরও চারটি হাতি। প্রতিযোগিতার তিন দিন আগে যাত্রা শুরু করল আনন্দ।

রাজপুত্র আনন্দের হাতির বহর চলছে। যাত্রা থামিয়ে মাঝেমধ্যে খাওয়া-দাওয়া করছে তারা। দ্বিতীয় দিন দুপুরে এক শালবনে খাওয়া-দাওয়া সেরে সবাই বিশ্রাম নিচ্ছিল। হঠাৎ নীলবাহারের আর্তচিৎকার। সবাই ছুটে এলো। দেখল, নীলবাহার মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে কাঁদছে। তার একটি গজদাঁত ভেঙে মাটিতে পড়ে আছে। শালগাছের ডালে লেগে একেবারে ভেঙেই গেছে দাঁতটি। নীলবাহারের কান্না দেখে কাঁদছে বাকি হাতিগুলো। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। কিন্তু নীলবাহারের কান্না থামে না। কী ভয়ংকর সমস্যা ! রাত পেরিয়ে ভোর হলো। কিন্তু নীলবাহারের কান্না থামে না। হঠাৎ রাজপুত্রের মনে পড়ল, বিদায় নেওয়ার সময় সুখবতী তার হাতে তুলে দিয়েছিল তার প্রিয় কবুতর। বলেছিল, 'কোনো বিপদে পড়লেই একে পাঠিয়ে দিবি আমার কাছে। আমি আর রঙলাল দ্রুত পৌঁছে যাব তোর কাছে।' আনন্দ বুঝল, একমাত্র রঙলালই পারে তাকে ঠিক সময়ে পলাশনগরে পৌঁছে দিতে। আর রঙলালকে সামলাতে পারে একমাত্র সুখবতী। তখনই কবুতরটিকে সুখের কাছে পাঠিয়ে দিল আনন্দ।

দুপুরের মধ্যেই রাজকন্যা সুখবতী পৌঁছে গেল ভাইয়ের কাছে। দেখল, রাজপুত্রসহ সবার মন খারাপ। নীলবাহার তখনও কেঁদেই চলেছে। সুখবতীকে দেখে যেন আশার আলো দেখতে পেল আনন্দ! কিন্তু দেরি করা চলবে না। রাজপুত্রকে রঙলালের পিঠে তুলেই পলাশনগরের উদ্দেশে ছুটল সুখবতী। অবশেষে তারা পৌঁছল পলাশনগর রাজ্যে। ততক্ষণে শুরু হয়ে গেছে রান্না প্রতিযোগিতা। সাতটি রাজ্য থেকে প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে মোট একুশজন রাঁধুনি। আনন্দ লক্ষ্য করল, প্রতিযোগীরা সবাই বয়সে তার চেয়ে অনেক বড়। একটু ভয় হচ্ছে আনন্দের! সে কি পারবে এত অল্প সময়ে ঠিকঠাক রান্না করতে! কিন্তু তাকে সাহস দিল সুখবতী। বলল, 'কোনো ভয় নেই, ভাই। তুই শুধু মাথা ঠান্ডা রেখে রান্না শুরু কর। আমি জানি তুই পারবি।' মনে সাহস ফিরে পেলো আনন্দ। সে ঝাঁপিয়ে পড়ল রান্নার কাজে। হাতে আছে মাত্র একটি ঘণ্টা। সে আজ রান্না করবে মোরগের মখমলি মোসাল্লাম। ঠিক পঞ্চান্ন মিনিটের মাথায় রান্না শেষ হলো রাজপুত্রের। শুরু হলো বিচারপর্ব। রান্নার বিচারকার্য করছেন রানী প্লাবতী, প্রধান রাজপাচক টোডরমল আর গত বছরের সেরা রাঁধুনি গুলবাহার হর্ষনন্দ। একে একে বিশজনের খাবারের স্বাদ নিলেন তারা। সবশেষে এলেন রাজপুত্র আনন্দের কাছে। রানী বললেন, 'রাজপুত্র, তুমি এই বয়সেই রান্না করতে এত দূর থেকে ছুটে এসেছ! তুমি দেখছি দারুণ সাহসী!'

এবার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করা হবে। উত্তেজনায় কাঁপছে সবাই। রাজা হীরককান্তি বলতে শুরু করলেন, 'পলাশনগর রাজ্যে বছরের পর বছর ধরে চলছে রান্না প্রতিযোগিতা। তবে এই বছর ঘটেছে এক বিস্ময়কর ঘটনা। প্রতিযোগিতায় এবারই প্রথম অংশ নিয়েছে এক কিশোর। এমন নবীন প্রতিযোগী এর আগে আমরা কখনও পাইনি। সেই ক্ষুদে রাঁধুনির রান্না যেন এক বিস্ময়! পলাশনগরে এমন মজার মোরগ মোসাল্লাম আগে কেউ কখনও খায়নি।'

অবশেষে রাজা বিজয়ী হিসেবে ঘোষণা করলেন সুখনগর রাজ্যের রাজপুত্র আনন্দর নাম। রানী প্লাবতী রাজকুমার আনন্দের মাথায় মুকুট পরিয়ে দিলেন। ছুটে এসে ভাইকে অভিনন্দন জানাল সুখবতী। চারদিকে ধন্য ধন্য পড়ে গেল। রাজপুত্র বোনকে বলল, 'ভাগ্যিস তুই আমার পাশে ছিলি!'

তারা পলাশনগরে দু'দিনের রাজ আতিথেয়তা গ্রহণ করল।ওদিকে রাজহাতি নীলবাহার এরই মধ্যে গজদন্তের শোক কাটিয়ে উঠেছে। সে বুঝতে পেরেছে, তার ভেঙে যাওয়া দাঁতটি আবার বড় হবে। নীলবাহারসহ বাকি হাতিরা এরই মধ্যে পৌঁছে গেছে পলাশনগর রাজ্যে। এবার তাদের নিজ রাজ্যে ফেরার পালা। রাজা ও রানী নিশ্চয়ই তাদের পথ চেয়ে আছেন। তাদের জন্য পথ চেয়ে আছে সুখনগর রাজ্যের সকল প্রজা। রাজপুত্র ঠিক করল, সুখরাজ্যে ফিরেই সে রাজ্যের সব প্রজাকে নিজ হাতে রান্না করে খাওয়াবে।