দিন রাত্রি

দিন রাত্রি


বলি নারীশক্তির কথা...

প্রকাশ: ২৮ জুন ২০২০      

নাসরীন মুস্তাফা

পুরুষ সবল। তাদের পেশিশক্তি আছে। ভাবেন মেধাশক্তিও তাদের বেশি। কিন্তু যুগে যুগে নারী প্রমাণ করেছে মেধাশক্তিতে পিছিয়ে নেই নারীরা। জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প করোনাভাইরাস টাস্কফোর্স গঠন করেছিলেন। আমেরিকাকে কভিড-১৯ থেকে রক্ষা করবেন টাস্কফোর্সের ১২ জন, যাদের একজনও নারী নন।

আমেরিকাতে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার মূল সর্বনাশটা ঘটল জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারিতে। সর্বনাশ ঠেকাতে পুরুষ নেতৃত্ব কাজে এলো না। এরপর, মার্চের প্রথম দিকে, বহু দাবির মুখে দুইজন নারী কর্মকর্তাকে এই টিমে সংযুক্ত করা হয়। কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে গেছে খুব।

আমেরিকার থেকে শক্তি-সামর্থ্যে বহু গুণ পিছিয়ে থাকা বাংলাদেশে শুরু থেকে করোনাভাইরাস প্রতিরোধ যুদ্ধে নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জেন্ডার ভারসাম্য বজায় রাখার নীতি তিনি মেনে চলেন। করোনাভাইরাস মহামারি ঠেকাতে বাংলাদেশ যে টাস্কফোর্স গঠন করেছিল, তাতেও এর ব্যত্যয় ঘটেনি। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরাকে সদস্য সচিব করে ১৭ সদস্যের যে টাস্কফোর্স গঠন করা হয়, তাতে যোগ্যতার ভিত্তিতে সদস্য হিসেবে পুরুষ বিশেষজ্ঞদের পাশাপাশি নিযুক্ত হয়েছেন প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক শায়লা খাতুন এবং অবসট্রেরিক্যাল অ্যান্ড গাইনোকলজিক্যাল সোসাইটি অব বাংলাদেশের প্রাক্তন সভাপতি অধ্যাপক রওশন আরা বেগম।

বিশ্বব্যাপী স্বাস্থ্য খাতের শতকরা ৭০ ভাগ নারীর সেবায় চললেও সিনিয়র অবস্থানে আসতে পেরেছেন এর মাত্র তিন ভাগের এক ভাগ। এই হিসাব বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থারই। যেসব দেশে নারী নেতৃত্ব দিচ্ছেন মহামারি প্রতিরোধে, সেসব দেশ সত্যিই দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সংক্রমণ যতটা সম্ভব না ছড়িয়ে, জনকল্যাণমুখী স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ও মহামারির সময়ে বিপদে পড়ে যাওয়া জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে। সাধারণ পোশাকে নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আর্ডেন ফেসবুক লাইভে এসে চার স্তরের লকডাউন প্ল্যানের কথা যখন বলছিলেন, তার ঠিক আগেই ঘুমিয়ে পড়া মেয়েটিকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে এসেছেন। নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী এরনা সলবার্গ কেবল শিশুদের সাথে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে স্পষ্ট বার্তা দিয়েছিলেন যে নির্বাচিত দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের কাছ থেকে তথ্য পাওয়ার অধিকার শিশুদেরও বিন্দুমাত্র কম নয়। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকেই ভিডিও কনফারেন্স করে সরাসরি বুঝতে চেয়েছেন কোথায় কোন্‌ ধরনের ঘাটতি পূরণ করা দরকার, কাকে উৎসাহ দিতে হবে, দুর্নীতি প্রতিরোধে হুঁশিয়ার করতে হবে, শাস্তি দিতে হবে, জনবহুল দেশটাতে সামগ্রিক ব্যবস্থাপনাকে স্মার্ট সল্যুশনের মাধ্যমে জনকল্যাণমুখী করতে অক্লান্ত পরিশ্রম করছেন।

আসলে নারী পরিবার সামলাতে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, তার আলোকে তিনি বৃহত্তর পরিসরে নেতৃত্ব দেন। পুরুষ কি এই অভিজ্ঞতা অর্জন করেন না? এই প্রশ্নের উত্তরে পাল্টা প্রশ্ন আসে, পরিবার সামলানোর অভিজ্ঞতা কি নারীর মতো পুরুষের নেওয়া হয় না? হয় না। তবুও পুরুষতান্ত্রিকতার জোরে পুরুষ নেতৃত্ব নিয়ে ফেলে এবং যথারীতি নারীশক্তির প্রতি অবহেলা প্রদর্শন করে।

সোশ্যাল ডিসটেন্সিং না মানার কারণে, ধূমপায়ী হওয়ার জন্যও পুরুষের বিপদ বেশি ঘটছে, মৃত্যুহারও বেশি। আক্রান্ত পুরুষ বুঝে কিংবা না বুঝে পরিবারের নারী ও শিশুদের আক্রান্ত করছেন। আক্রান্ত্ম পুরুষটিকে সেবা দিচ্ছেন নারী, তিনি নিজে আক্রান্ত হলেও গোটা পরিবারকে সেবা-শুশ্রূষার মূল কাজটি নারীকেই করতে হচ্ছে। পরিবারের আয় কমে গেছে, সীমিত খাদ্যের সুষ্ঠু ব্যবহার করে পরিবারের সদস্যদের রোগ-প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে বুদ্ধি করে কত কিছুই না করছেন নারী। তাহলে এই পরিস্থিতিতে কী করতে হবে, সে পরামর্শ দেওয়ার সময় শুধু পুরুষের মতটাকেই গ্রহণ করা হবে? নারীও যে ভালো পরামর্শ দিতে পারেন, সেটা বুঝতে তো রকেট সায়েন্টিস্ট হওয়া লাগে না। লাগে কি?