দিন রাত্রি

দিন রাত্রি


মাথাব্যথার রকমফের

প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২০      

ডা. শহীদুল্লাহ সবুজ

ক্লাস্টার মাথাব্যথা হঠাৎ করেই শুরু হয়, তবে আস্তে আস্তে এর তীব্রতা বাড়ে। ব্যথা এক পাশে শুরু হয়ে অনেক সময় চোখের পেছনের দিকেও প্রবাহিত হয়ে তীব্র আকার ধারণ করে। এ সময় নাক, চোখ বা ব্যথার স্থান লাল বর্ণও ধারণ করতে পারে। তীব্র আলো, ঘ্রাণ বা গন্ধ এবং শব্দে এ ধরনের মাথাব্যথা বেড়ে যায়



মাথাব্যথায় ভোগেননি এমন লোক হয়তোবা খুজে পাওয়া যাবেনা। মাথাব্যথা নানা কারণে হতে পারে। তবে বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, প্রায় ৫০ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ মাথাব্যথায় ভুগে থাকেন, যার মধ্যে টেনশন টাইপ মাথাব্যথার রোগী বেশি। যেসব কারণে মাথাব্যথা হয়ে থাকে তা হলো-

মাইগ্রেন, সাইনাসের প্রদাহ, ক্লান্তি, পানিশূন্যতা, পর্যাপ্ত ঘুমের অভাব, দুশ্চিন্তা ও অতিরিক্ত মানসিক চাপ, এপিলেপ্সি বা মৃগী রোগ, অতিরিক্ত ব্যথানাশক ব্যবহার বা ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া, মাথায় আঘাত, ব্রেনের টিউমার, দাঁতের রোগ, ধূমপান ইত্যাদি।

ব্যথার ধরন ও চিকিৎসা

টেনশন

বেশির ভাগ মাথাব্যথাই হয় টেনশন বা অতিরিক্ত দুশ্চিন্তার কারণে। টেনশনের কারণে মস্তিস্কে অতিরিক্ত চাপ পড়ে, মাথাব্যথা শুরু হয়।

করণীয় :সুশৃঙ্খল পারিবারিক জীবনাচরণ ও আনন্দময় ঝামেলাহীন জীবনই পারে টেনশন ও এর থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে।

মাইগ্রেন

মাথাব্যথার মধ্যে মাইগ্রেনের ব্যথা অধিকতর তীব্র। এ ধরনের ব্যথা মাথার এক পাশ দিয়ে শুরু হয় এবং আস্তে আস্তে অস্বস্তিকর অবস্থা তৈরি করে। এই ব্যথা শুরু হলে তা কয়েক ঘণ্টা, এমনকি কয়েক দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। মাথাব্যথার পাশাপাশি বমি ভাব এ রোগের প্রধান লক্ষণ।

করণীয় :চিকিৎসকের অধীনে এবং নিয়মিত চেক আপের মাধ্যমে মাইগ্রেনের চিকিৎসা করা উচিত। তবে মেডিটেশন, নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমানো, অতিরিক্ত বা কম আলোতে কাজ না করা, কড়া রোদ বা তীব্র ঠান্ডা, উচ্চশব্দ ও কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ পরিহার, পিসি ও টিভির সামনে বেশিক্ষণ না থাকা, প্রচুর পানি পান ইত্যাদি মাইগ্রেনে বেশ উপকারী।

ক্লাস্টার

ক্লাস্টার মাথাব্যথা হঠাৎ করেই শুরু হয়, তবে আস্তে আস্তে এর তীব্রতা বাড়ে। ব্যথা এক পাশে শুরু হয়ে অনেক সময় চোখের পেছনের দিকেও প্রবাহিত হয়ে তীব্র আকার ধারণ করে। এ সময় নাক, চোখ বা ব্যথার স্থান লাল বর্ণও ধারণ করতে পারে। তীব্র আলো, ঘ্রাণ বা গন্ধ এবং শব্দে এ ধরনের মাথাব্যথা বেড়ে যায়।

করণীয় :মাইগ্রেনের চিকিৎসা এবং ক্লাস্টারের চিকিৎসা একই। তবে তীব্র ব্যথা হলে স্নায়ু বিশেষজ্ঞ 'ভেরাপামিল' জাতীয় ওষুধ খেতে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। এ ছাড়া অ্যালকোহল, ধূমপান ত্যাগ করা, সঠিক সময়ে ঘুমানোর অভ্যাস ইত্যাদি এসব সমস্যা থেকে মুক্ত রাখতে সহায়তা করে।

সেকেন্ডারি

ব্যথার উৎস যখন মাথার বাইরে থাকে, তখন তাকে সেকেন্ডারি মাথাব্যথা বলে। যেমন- গল্গুকোমা, দাঁতের সমস্যা, আঘাত, মস্তিস্কের টিউমার, এপিলেপ্সি বা মৃগী রোগ, ব্রেনের রক্তনালিতে ইনফেকশন ইত্যাদি।

করণীয়

কারও এ ধরনের মাথাব্যথা থাকলে বিলম্ব না করে একজন স্নায়ু বা মেডিসিন বিশেষজ্ঞের পরামর্শে যেসব কারণে মাথাব্যথা হচ্ছে, তা শনাক্ত করে চিকিৎসা নেওয়া উচিত। বিলম্ব করলে বরং জটিলতা বাড়ে।

সাইনাসের প্রদাহ

মাথার হাড়ের মধ্যে অবস্থিত কিছু ফাঁকা জায়গা থাকে, যাকে বলে সাইনাস। চোখের পেছনে, নাকের হাড়ের দুই পাশে এ রকম ফাঁকা জায়গা রয়েছে, যাতে সর্দি জমে সাইনোসাইটিস বা প্রদাহ হয়। ফলে বাতাস আটকে যায় এবং মাথাব্যথা করে। এ মাথাব্যথা কপালে বা গালের দুই দিকে কিংবা চোখের পেছনে হয় এবং কিছুটা জ্বরবোধ হয়।

করণীয়

সাইনাসজনিত মাথাব্যথায় অ্যান্টিবায়োটিকের পাশাপাশি অ্যান্টিহিস্টামিন জাতীয় ওষুধ ভালো কাজ করে। এ ছাড়া গরম পানি দিয়ে গোসল করলে অথবা গামলায় গরম পানি নিয়ে নাক দিয়ে বাষ্প টেনে নিলে আরাম পাওয়া যায়। খুব বেশি মাথাব্যথা করলে এক টুকরো কাপড় গরম পানিতে ভিজিয়ে কপাল, চোখের ওপর বা নাকের দুই পাশে সেঁক দিলে সাইনাসের বদ্ধতা কাটার পাশাপাশি আরাম পাওয়া যায়।

হরমোনাল

নারীদের ঋতুকাল, গর্ভধারণ এবং মেনোপজের সময় হরমোনের মাত্রার পরিবর্তন হয়। তখন মনমেজাজ পরিবর্তন, এমনকি মাথাব্যথাও হতে পারে। জন্মনিয়ন্ত্রণের ট্যাবলেট সেবনের পর হরমোনের পরিবর্তনগুলোর কারণেও অনেকের মাথাব্যথা বেড়ে যায়।

করণীয়

নারীদের মেনোপজের সময় হরমোনের পরিবর্তনের জন্য বিভিন্ন ধরনের মাথাব্যথা হতে পারে। এর চিকিৎসায় হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি উপকারী ফল বয়ে আনতে পারে। এ সময় টেনশনমুক্ত দৈনন্দিন জীবন নিশ্চিত করা, পর্যাপ্ত ঘুম, পানি পান ইত্যাদি বেশ সহায়ক।

পরামর্শ

অতিরিক্ত ধূমপান, মদ্যপান, মাদক সেবন, চা-কফি, অনিয়মিত এবং অতিরিক্ত ঘুমের ওষুধ সেবন, রোদ বা অতিরিক্ত গরম আবহাওয়ায় বেশিক্ষণ থাকা, অতিরিক্ত শারীরিক, মানসিক পরিশ্রম, ক্ষুধার্ত থাকা ও সময়মতো না খাওয়া, যে কোনো ধরনের মানসিক চাপ ইত্যাদি মাথাব্যথার কারণ। তাই এসব ব্যাপারে সতর্ক থাকলে মাথাব্যথা বেশির ভাগ কমে আসবে।



[নিউরোলজি বিভাগ, বিএসএমএমইউ]