দিন রাত্রি

দিন রাত্রি


শহরগুলো করোনার পরে

প্রকাশ: ২৭ জুন ২০২০      

তানভীর অপু

করোনাভাইরাসের থাবায় থমকে গেছে পুরো পৃথিবী। ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশের অপার সৌন্দর্যে ভরা শহরগুলো একটা সময় পর্যটকদের পদচারণায় মুখরিত ছিল, সেই শহরগুলোই প্রাণঘাতী মহামারির প্রতাপে মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। সেখানে আজ নেই কোলাহল, ভর করেছে শুধুই সুনসান নীরবতা। বিশ্বের ৭৭টি দেশের আটশ'র বেশি শহর ঘুরেছেন তানভীর অপু। তার দেখা সেই শহরগুলো কেমন আছে এখন, স্মৃতির পৃষ্ঠা উল্টে এখনকার পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনা করে জানাচ্ছেন তিনি...



এই করোনার সময় ঘরে বসে বসে খুঁজে ফিরছি আমার পুরাতন ভ্রমণ, সেই সব দেশ আর শহর, যেখানে গিয়ে আনন্দ পেয়েছি, মুগ্ধ হয়ে দেখেছি প্রকৃতির রূপ দেখে, কখনো ছুঁয়েছি সেসব স্থানের ইতিহাস আর ঐতিহ্য। করোনা মহামারির থাবায় সেই সব শহর, সেই সব দেশ, আজ মানুষের উপস্থিতি, মানুষের পদধ্বনি ছাড়া কেমন সুনসান অবস্থা, ভাবতেই মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে।

প্রথমে বলি আমেরিকার কথা। এখানে আমি ৩২টি অঙ্গরাজ্য ঘুরেছি। নিউইয়র্ক, নিউজার্সি, সানফ্রান্সিসকো, অ্যারিজোনা, ওয়াসিংটন ডিসি, মনটানা, উটাহ; এখানে গিয়েছি বিভিন্ন মিউজিয়াম, ও পার্কে। তাদের মধ্যে ইয়োলোস্টোন ন্যাশনাল পার্কের সৌন্দর্য ও বিগউড ট্রি দেখে আমি যারপর নেই অভিভূত হয়েছি। গ্রান্ডক্যানিয়নের সৌন্দর্যে আমার চোখ রাঙিয়ে দিয়েছে, তৃণভূমি বা প্রেইরির সৌন্দর্য, তার মাঝে ছোট একটা ঘর, কখনও কখনও আমার কাছে যেন রূপকথার সেই দেশের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছে। দুঃখের কথা হচ্ছে, আমেরিকায় করোনার থাবায় এক লাখের বেশি মানুষ মারা গেছে। ভাবতেই কেমন যেন লাগছে, কষ্ট হচ্ছে। এই অবস্থা থেকে তাড়াতাড়ি সেরে উঠবে দেশটি, আবার প্রকৃতি ঘিরে বসবে হাজারো দর্শনার্থীর মেলা, এটাই একমাত্র কামনা।

এরপর বলি বিখ্যাত রোমান্টিক শহর প্যারিসের কথা। এখানকার ভবনখ্যাত আইফেল টাওয়ারে উঠে আমি যেন আকাশ ধরতে পেরেছিলাম। ভের্সার বাগানে গিয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখেছি প্রকৃতির অপার্থিব সৌন্দর্য। লুভ্যর মিউজিয়ামে গিয়ে দেখেছি পেছনে ফেলে আসা অতীত দিনের কত কত ইতিহাস, ঐতিহ্য আর পৃথিবীর মহান শিল্পীদের দারুণ সব চিত্রমালা। সেই প্যারিসের অবস্থাও এখন খারাপ। ২৮ থেকে ৩০ হাজার মানুষ মারা গেছে এই প্রিয় দেশটিতে, আমি ভাবি আবারও কি উঠতে পারব সেই আইফেল টাওয়ারে, যেতে পারব কি আবার ভের্সার বাগানে কিংবা লুভ্যর মিউজিয়ামে। অন্যান্য দেশের মতোই প্যারিসও ঘুরে দাঁড়াবে, দেশটির জন্য অনেক শুভকামনা।

স্পেনেরও খারাপ অবস্থা এই করোনা সময়ে। স্পেনে গিয়েছি আমি বার্সেলোনা, মাদ্রিদ শহরে। গিয়েছি দেড়শ' বছরের পুরোনো চার্চে, প্রার্থনা করেছিলাম শান্তিময় সবুজ এক পৃথিবীর জন্য। জুয়াড়িদের মতো দেখেছি ঘোড়দৌড়, স্বাদ নিয়েছি কত কত বিখ্যাত স্প্যানিশ খাবারের। আজ মনে হয়, এত সুন্দর একটি দেশ আর সে দেশের শহরগুলো; কিন্তু প্রিয় সেই শহর এখন কেমন যেন মৃত্যুপুরী হয়ে আছে। জানি না আবার কবে ফিরবে সেখানে প্রাণের স্পন্দন, ভাবতেই মনটা বিষণ্ণ হয়ে যায়, কেমন উতলা হয়ে ওঠে।

গিয়েছিলাম ইতালিতেও, ভেনিস নামক এই জলশহরের গন্ডোলায় ঘুরেছি। কলোসিয়াম দেখেছি, মজা করে সেই গ্ল্যাডিয়েটর যোদ্ধা সেজেছি, ঘুরেছি পুরোনো কত শহর, ছুঁয়ে দেখেছি রোমান আর গ্রিকের পুরোনো ইতিহাস। সেই দিনগুলোয় স্বপ্নে নেমে এসেছিল স্বপ্নের রাজকন্যারা। কিন্তু সেই ইতালি করোনার করালগ্রাসে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। মলিন চোখে তাকিয়ে দেখি ইতিহাসের প্রাচীনতম শহরগুলো, তার রাস্তাগুলো, স্থাপনাগুলো, তার অতীত আর ঐতিহ্য; মৃত্যুপুরী হয়ে যাওয়া শহরগুলো কেমন নীরব হয়ে গেছে এখন, কোনো কোলাহল নেই, নীরবতা ভর করেছে সবখানে। কামনা করি সুস্থ হয়ে উঠুক আবার পৃথিবী নামক গ্রহটি।

আমার চোখে উত্তরের শুভ্র স্বর্গরাজ্য হেমারফেস্ট, আমি তিনবার গেছি এ শহরে, পাহাড় আর আটলান্টিকের নীল ফ্রিয়ডে সাজানো এ শহরটি যেন আমার ছোট্টবেলার কল্পনার শহর। এখানে ১০ হাজার লোকের বাস, করোনার আক্রমণে এ শহরটিও এখন পুরোপুরি লকডাউন। এখানকার জেলেপল্লিতে গিয়েছিলাম কয়েকবার, কত শত স্মৃতি আজ মনের কোণে উঁকি দিচ্ছে, লকডাউনে শহরটিতে এখন নেই পর্যটকের ভিড়, হয়তো সুনসান নীরবতা নিয়ে শহরটা আরও শীতল হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে এই করোনা সময়ে।

আর কী বলব, ঘরবন্দি হয়ে স্মৃতি হাতড়ে বেড়াই এখন, মন খারাপ হয়, তবুও আশাবাদী দ্রুত সেরে উঠবে পৃথিবী আবার, ফিরে পাবে তার চিরচেনা রূপ। আবারও আমরা সবাই ডানা মেলে ঘুরতে পারব প্রিয় সব শহরে। া

ছবি : লেখক