দিন রাত্রি

দিন রাত্রি


প্রিয়দর্শিনীর সময়

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২০      

রাসেল আজাদ বিদ্যুৎ

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে সবার বয়স বাড়ে, জয়ার বয়স কমে! যতদিন যাচ্ছে তিনি ততই সুন্দর হয়ে উঠছেন। হয়েছেন সবার প্রিয়দর্শিনী। সে কারণেই জয়া আহসানের কাছে দর্শকের প্রত্যাশা অনেক। সে প্রত্যাশা পূরণের জন্য নিবেদিত নন্দিত এই অভিনেত্রী। নিজেকে ভেঙে প্রতিবার তাই নতুন রূপে পর্দায় তুলে ধরেন তিনি। একই সঙ্গে অভিনীত চরিত্রও দর্শকের কাছে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলেন। কী কারণে জয়ার অভিনীত চরিত্রগুলো বাস্তব বলে মনে হয়? পাওয়া গেল এ প্রশ্নের উত্তর। জানা গেল, অভিনয়ের জগতের বাইরে পদচারণা, যোগাযোগ আর মতবিনিময় তার শিল্পী সত্তাকে শক্তিশালী করতে বড় ভূমিকা রেখেছে। অবশ্য এই শিল্পী পরিচয় প্রতিষ্ঠিত করতে অনেকটা পথ পাড়ি দিতে হয়েছে জয়াকে। জীবনের এপিঠ-ওপিঠ উল্টে দেখে নিতে হয়েছে। পরিচিতের পাশাপাশি ভাবতে হয়েছে দূরের মানুষগুলোকে নিয়ে। অভিজ্ঞতার বাইরেও জেনে নিতে হয়েছে নানা শ্রেণির সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার অনুভূতি ও তার প্রকাশের ধরন। এক কথায়, একটি মানুষের মাঝে কীভাবে হাজার পেশা, নেশা, ধর্ম-বর্ণের মানুষের সত্তা ধারণ করা যায়- শিখতে হয়েছে জয়াকে। যা শিখে নিতে জয়া ব্যর্থ হননি- এ কথা স্বীকার করেছেন নাটক ও চলচ্চিত্রবোদ্ধা অনেকে। জয়াকে নিয়ে অভিনয়বোদ্ধা আর সহকর্মীদের মতামত যে ভুল নয়, তার প্রমাণ জয়া অভিনীত নাটক, চলচ্চিত্র ও বিজ্ঞাপনগুলো। 'ডুবসাঁতার', 'গেরিলা', 'চোরাবালি', 'জিরো ডিগ্রী', 'দেবী', 'খাঁচা', 'একটি বাঙালি ভূতের গপ্পো', 'বিসর্জন', 'বিজয়া', 'রাজকাহিনী', 'আবর্ত', 'ঈগলের চোখ', 'পূর্ণদৈর্ঘ্য প্রেমকাহিনী', 'এক যে ছিল রাজা', 'কণ্ঠ', 'রবিবার'সহ বাংলাদেশ ও ভারতের প্রতিটি ছবিতেই জয়া নিজেকে নতুনরূপে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন। তারও অনেক আগে থেকে বিভিন্ন বিজ্ঞাপনের ছোট ছোট গল্প আর ঘটনার সঙ্গে নিজেকে আলাদাভাবে তুলে ধরা রপ্ত করেছেন। মঞ্চে কাজ না করলেও অভিনয়ের গুরুত্বপূর্ণ পল্গ্যাটফর্ম হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন টেলিভিশনকে। যেখানে দশকের পর দশক অভিনয়ের মাধ্যমে পরিপূর্ণ এক শিল্পী হওয়ার চেষ্টায় রত ছিলেন।

'সংশয়', 'বিকল পাখির গান', 'আঁটকুড়া', 'শঙ্খবাস', 'চৈতা পাগল', 'গ্রহণকাল', 'অফবিট', 'পাঞ্জাবীওয়ালা', 'অতঃপর আঙ্গুরলতা নন্দকে ভালোবেসেছিল', 'কফি হাউস', 'কুহক', '৫১বর্তী', 'হাসপাতাল', নির্জন স্বাক্ষর', 'জাল', 'ইন্টারভিউ'সহ আরও অনেক নাটক ও টেলিছবি তার অন্যতম উদারহরণ। যা দেখার পর দর্শককে ভাবতে বাধ্য করেছেন, কীভাবে জয়া তার অভিনয় এত বাস্তব করে তোলেন, মন্ত্রটা কী? সে প্রশ্ন ছিল জয়া আহসানের কাছে আমাদেরও। তাই জয়ার কাছে যখন এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলো, তিনি হেসে বললেন, 'কোনো মন্ত্র নেই। যে যাই করুক না কেন, সবার আগে নিজেকে জানার চেষ্টা করা উচিত। এটা আবিস্কার করা দরকার, নিজের কাছে নিজেকে প্রত্যাশা কী এবং সেই প্রত্যাশা পূরণের জন্য কী কী করতে পারে। যখন এ বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যায়, তখনই মানুষ কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য নির্ধারণ করতে পারে। এরপর আসে সাফল্যের জন্য লড়াই-সংগ্রামের পর্ব। সবশেষে মানুষ এবং পৃথিবী আর সমাজ-সংসারকে জানা আর কাজের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে সাফল্যের পথ রচনা করা। এও মনে রাখতে হবে যে, এ সবের কোনো কিছু থেকেই কেউ বিচ্ছিন্ন নয়। কোনো কিছুর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করা মানেই নিজেকে হারিয়ে ফেলা। এসব জেনে এবং মেনেই অভিনয় ভুবনে আমার পথচলা। তবে শুরু থেকে লক্ষ্য একটাই- অভিনয়ের মধ্যদিয়ে মানুষের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে নেওয়া, যেজন্য প্রতিটি কাজ ভালোবেসে করি। যার প্রতি কোনো ভালোবাসা বা আকর্ষণ নেই, সেদিকে হাত বাড়াই না।' জয়ার কথা থেকে জানা গেল, কাজের প্রতি তার ভালোবাসাই মুখ্য। যেজন্য খ্যাতির মোহ পেয়ে বসেনি। অভিনয় নেশায় পরিণত হলেও আলেয়ার মতো অভিনয়ের ভুবনে ছুটে বেড়াননি। জীবন থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন না করেই নিজ অঙ্গনে কাজ করে যাচ্ছেন। একটু খেয়াল করলেই এর প্রমাণ পাওয়া যাবে। এই তো ক'দিন আগে পালিত হলো বাবা দিবস। যেদিন জয়া খুঁজে ফিরেছেন বাবার স্নেহের ছায়া। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ করেছেন বাবা তার জীবনের সঙ্গে কীভাবে মিশে আছেন। লিখেছেন, 'আমার ভাবনায়, আমার হৃদয়ে, আমার জীবনের প্রতিটি অংশে তুমি আমার সঙ্গে আছ এবং সব সময় থাকবে, বাবা। শুভ বাবা দিবস।' তার আগে শোক প্রকাশ করে বলিউড অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের আত্মহত্যা নিয়ে লিখেছেন অনেক কথা। যার মূল বক্তব্য তিনি মানুষকে একা নয়, সম্মিলিতভাবে সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করে চলতে বলেছেন। জয়ার কথায়, 'আমরা প্রত্যেকেই হয়তো এক একটা সমস্যায় থাকি। ঘটনাক্রমে সেগুলো হয়তো না চাইতেও ঘটে যায়। সেগুলোই নিজের মধ্যেই হয়তো চেপে রাখি ভাবি এর থেকে বেরোনোর হয়তো আর কোনো সমাধান নেই। এগুলোই আমাদের তিলে তিলে শেষ করে দেয়। এগুলো বরং আমরা কাছের মানুষের সাথে শেয়ার করতে পারি।

অন্তত কিছুটা হালকা হওয়াই যায়। লড়াই করার রসদ খুঁজে পাওয়া যায়। কারোর মন খারাপ হয়েছে শুনলে প্লিজ তাকে একা ছেড়ে দেবেন না। যতটা সম্ভব পাশে থাকার চেষ্টা করুন। অন্তত এই কঠিন সময়ে তো বটেই। একইভাবে সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রে বর্ণবৈষম্যের বলি হওয়া জর্জ ফ্লয়েডের পক্ষেও আওয়াজ তুলেছেন জয়া। সায়ানের 'কালো মানুষ' গানের প্রশংসা করতে গিয়ে মনের ক্ষোভও চেপে রাখেননি দেশ-বিদেশে সাড়া জাগানো এই অভিনেত্রী। এ নিয়ে ফেসবুকে লিখেছেন, 'গায়ের রঙ কালো, শুধু এই অপরাধে জর্জ ফ্লয়েডকে শ্বাসরোধ করে মেরেছে আমেরিকার সাদা চামড়ার পুলিশ। এতগুলো সভ্যতা পার হয়েও কত নিষ্ঠুর পথ ধরে যে বিভেদ আসে! এই বিভেদ ধর্মের, বর্ণের, রঙের, জাতির, শ্রেণির, নারী-পুরুষের। এই ভেদরেখা আমরা পার হবো নিশ্চয়ই, একদিন।' জয়া এই লেখা থেকে কারও বুঝতে অসুবিধা হবে না, চারপাশের ঘটনা তার মনে কীভাবে প্রভাব ফেলে। তার আবেগ-অনুভূতি যে রক্ত-মাংসের মানুষের- এটাও বুঝতে অসুবিধা হয় না। তাই তো আমরা জয়াকে দেখি, ছোটবেলায় শেখা রবি ঠাকুরের কবিতা তার অনুসারীদের শোনাতে। মা ও বোনের সঙ্গে অন্য সবার মতোই আড্ডা, খুনসুটিতে মেতে উঠতে। এবং নিজের ভুবনে স্বাধীন বিহঙ্গের মতো ডানা মেলতে। তারকা হয়েও যে থেকে যায় সাধারণ মানুষের দলে। এটাই জয়া, পর্দার ভেতর আর বাইরে যাকে আবিস্কার করতে হয় আলাদা আলাদাভাবে।