দিন রাত্রি

দিন রাত্রি


সময়ের স্লোগান

প্রকাশ: ২৫ জুন ২০২০      

ইলমা আজাদ

সময়ের স্লোগান

চিরকুট ব্যান্ডের সদস্যরা

জগৎ সংসারের রূপরেখা তৈরি করেছে মানুষ। সময়ের সঙ্গে পালল্গা দিয়ে সেই মানবজাতিই প্রতিনিয়ত বদলে দিচ্ছে পৃথিবীকে। আবেগ, অনুভূতির প্রকাশ, মানবতার নিদর্শন তুলে ধরার কারণেই বলা হয়, মানুষ হলো সৃষ্টির সেরা জীব। যুগ যুগ ধরে তাই একটি কথাই প্রচলিত- 'সবার ওপর মানুষ সত্য, তার উপরে নাই'। আর এ কথাগুলো মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন বলেই এই করোনা মহামারিতে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন চিরকুট ব্যান্ডের সদস্যরা। নিজেদের ব্যবহূত শখের জিনিস থেকে শুরু করে শিল্পী জীবনের সঙ্গী প্রিয় বাদ্যযন্ত্রকেও নিলামে তুলতে দ্বিধা করেননি তারা। মানুষের সেবায় প্রাণ বিসর্জন দেওয়া সিলেটের এমএজি ওসমানী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মঈন উদ্দীনসহ করোনা যুদ্ধের লড়াকু সৈনিকদের স্যালুট জানিয়েছেন গানে গানে। এখানেই শেষ নয়, সাধারণ মানুষকে করোনায় সচেতন করে তুলতে সংগীতকে বেছে নিয়েছেন চিরকুটের শব্দসৈনিকরা। 'চলো একসাথে দূরে থাকি/ বিশ্বাসে কাছাকাছি/ দূরে দূরে কাছে থেকে/ দেশটাকে ভালো রাখি- এমন কথায় সাজানো গানটি লিখেছেন গাউসুল আলম শাওন। গানে সুর বসিয়েছেন চিরকুটের কণ্ঠশিল্পী শারমিন সুলতানা সুমি। সংগীতায়োজন করেছেন ব্যান্ডের ড্রামার ও সাউন্ড ডিজাইনার পাভেল আরিন। একই সঙ্গে সুমির গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছেন বরেণ্য রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সাদী মহম্মদ এবং তারকা শিল্পী তাহসান, এলিটা, মিলন মাহমুদ, নীরব ও সন্ধি। অন্যদিকে চিরকুটের গিটার ও ম্যান্ডেলিন বাদক এবং স্বনামধন্য সংগীতায়োজক ইমন চৌধুরীও বসে থাকেননি। ওয়ান ম্যান্ড ব্যান্ড হিসেবে সংগীতায়োজন করে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সবাইকে। আর এ সবই করেছেন এই দুঃসময়ে মানুষের মনে সাহস জোগাতে। আর তাই চিরকুটের সমকালীন প্রতিটি আয়োজন হয়ে উঠেছে সময়ের স্লোগান। ব্যান্ডের সাম্প্রতিক আয়োজন ও বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে চিরকুটের কণ্ঠশিল্পী শারমিন সুলতানা সুমি বলেন, 'সুখে-দুঃখে মানুষের পাশে মানুষ থাকবে- এটাই আমরা বিশ্বাস করি। সেই বিশ্বাস থেকেই করোনার এই মহামারিতে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। নিলাম থেকে পাওয়া অর্থ অসহায় মানুষের কাজে লাগলেই আমাদের এই চেষ্টা কিছুটা হলেও সার্থক হয়ে উঠবে।'

এতদিন সবাই জানতো চিরকুট একটি ব্যান্ড যাদের পরিবেশনা অন্য সবার চেয়ে কিছু হলেও ভিন্ন ধাঁচের। তাদের গানের কথায় মিশে থাকে জীবনের নির্যাস। সুরে খুঁজে পাওয়া যায় মনের গহিনে লুকিয়ে থাকা ভালোবাসার আকুতি কিংবা আর্তনাদ। কখনও তাদের সংগীত-মূর্ছনা পরিভ্রমণ করায় কল্পলোকে। কিন্তু এর বাইরেও চিরকুটের যে আরেকটি পরিচয় থাকতে পারে, তা নতুন করে জানা গেল এ সময়ে। বিশ্বমানবতার পক্ষে যারা ঝান্ডা উঁচিয়ে রেখেছেন, আওয়াজ তুলেছেন পরিবেশ আন্দোলনে, গেয়েছেন তারুণ্যের জয়গান, তারা সময়ের কথা বলবেন এটাই স্বাভাবিক। একটু খেয়াল করলে দেখা যাবে চিরকুটকে রক, র‌্যাপ, জ্যাজ, ব্লুজ, ফোক কিংবা অন্য কোনো সংগীত ঘরানার ব্যান্ড হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেওয়া যায় না। তেমনি নামের মতো একচিলতে কাগজে তুলে ধরা যায় না ব্যান্ডের ইতিহাস লেখা। কেননা দিনের পর দিন নতুন খবরে চিরকুট পরিণত হয়েছে এক বিশাল পাণ্ডুলিপিতে। সেখানে লেখা নানা আয়োজনের যোগ-বিয়োগের হিসাব-নিকাশ। অবশ্য চিরকুটের বিয়োগের তালিকায় তেমন কিছুই নেই। তবে সৃষ্টির তালিকা অনেক বড় না হলেও তার বেশির ভাগই প্রশংসিত। 'চিরকুটনামা', 'যাদুর শহর', 'উধাও' অ্যালবামের পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক একক গান এবং 'টেলিভিশন', 'পিঁপড়াবিদ্যা', 'ডুব', 'আয়নাবাজি', 'ভয়ংকর সুন্দর' ছবিতে গাওয়া তাদের গানগুলো তার বড় প্রমাণ। যে গানগুলো দেশ-বিদেশের মঞ্চে পরিবেশনের মধ্য দিয়ে চিরকুট সদস্যরা কুড়িয়েছেন অগণিত শ্রোতার ভালোবাসা।

এখানেই শেষ নয়, প্রথম বাংলাদেশি ব্যান্ড হিসেবে চিরকুট প্রতিনিধিত্ব করেছে মার্কিন মুলল্গুকে অনুষ্ঠিত বিখ্যাত সংগীত উৎসব সাউথ বাই সাউথওয়েস্ট ২০১৬-এর ৩০তম সেশনে। আমেরিকার প্রখ্যাত ব্যান্ড টোয়েন্টিফোর হোরাসের সঙ্গে যুক্ত হয়ে করেছে লাতিন ঘরানার বাংলা গান। এমন আরও অনেক খবর আছে চিরকুট ব্যান্ডের সৃষ্টি আর অভিজ্ঞতার তালিকায়।

এসব অভিজ্ঞতা আর ব্যান্ডের বিভিন্ন আয়োজন নিয়ে ব্যান্ডের ড্রামার পাভেল আরিন বলেন, 'আমরা শ্রোতার মনের তৃষ্ণা মেটাতে ভিন্ন আমেজের গান করেছি। খ্যাতি বা জনপ্রিয়তাকে বড় করে দেখিনি। গানের সুবাদে অনেকের ভালোবাসা পেয়েছি।' তার এ কথার সঙ্গে একমত পোষণ করেছেন ব্যান্ডের অন্যান্য সদস্য নিরব, দিদার, ইমন ও সুমী। তাদের কথায় একটা বিষয় স্পষ্ট যে, চিরকুটের চালিকাশক্তি হলো ভক্ত শ্রোতারা। তারপরও জনপ্রিয়তার জোয়ারে গা ভাসিয়ে শ্রোতার জন্য যে কোনো কিছু করতে তারা নারাজ। এ কথার সত্যতা নিয়েও সন্দিহান হওয়ার কিছু নেই। কেননা সবাই জানেন, সাম্প্রতিক সময়ে চিরকুট যে জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে, তার সুবাদে তারা যখন-তখন নতুন গান প্রকাশ করতে পারেন। যার প্রকাশনা নিয়েও ভাবতে হবে না। কিন্তু গানের বাণিজ্যিকীকরণ নিয়ে তারা মোটেও ভাবেন না। কারণ সংগীত তাদের কাছে এক ধরনের সাধনা, যার জন্য তারা জীবনের নির্যাস থেকে কথা, সুরের অনুসন্ধান করেন। আর এভাবেই চিরকুট হয়ে উঠেছে সমকালীন অন্যান্য ব্যান্ড থেকে আলাদা।