দিন রাত্রি

দিন রাত্রি


সীমিত বাজেটে সংসার

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২০      

জোহরা শিউলী

আয় বুঝে ব্যয়। এ প্রবাদবাক্যটি এতদিন কাগজে-কলমেই ছিল অনেকের কাছে। ঠিক যতটুকু দরকার ততটুকু মেনে জীবনযাপন করেননি অনেকেই। কিন্তু কভিড-১৯ আমাদের নাড়িয়ে দিয়ে গেল। অপব্যয়ের জীবন আর নয়। এখন সময় সীমিত বাজেটে চলার। দেশের অর্থনীতির বাজেট যখন পরিকল্পনা করা হয় তখন পরিবার প্রধানকেও বসতে হয় সংসারের হিসাব-নিকাশে। কভিড-১৯-এর কারণে অনেকের আয় সীমিত হয়ে গেছে। তাই সংসারের বাজেটটাও করতে হবে সীমিত পরিসরে।

প্রথম যে কাজটি করতে হবে গৃহকর্ত্রীকে তা হলো, শক্ত হাতে খরচের লাগাম টেনে ধরা। আয়, ব্যয়, ধার এবং সঞ্চয়ের একটা হিসাব করে ফেলতে হবে। মাসের প্রথম ছুটির দিনে পরিবারের সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে পরিবারের বাজেট ঠিক করতে হবে। সেই বাজেট করার সময় বাড়ির বড়দের সঙ্গে সন্তানরাও থাকবে। একটি নির্দিষ্ট ডায়েরি মেনে চলতে হবে। যেখানে শুধুই মাসের খরচের হিসাব লেখা থাকবে। খরচের একটা খসড়া করতে হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস এবং মেইনটেন্যান্সের খাতে কতটা খরচ হতে পারে এমন একটা প্রাথমিক ধারণা রাখতে হবে।।

প্রতি মাসের নিয়মিত খরচ যেমন যেমন- বিদ্যুৎ বিল, বাজার খরচ, ঘরের কাজে সাহায্যকারীর বেতন, ফোনের বিলের টাকা, ছেলেমেয়ের স্কুল, টিউশন ফি এবং আরও অন্যান্য খরচ আলাদা ভাগ করে নিতে হবে। সম্ভব হলে আলাদা আলাদা খামে ভরে, ওপরে নাম লিখে রাখুন। এতে বাড়তি খরচ হওয়ার সম্ভাবনা কমে যাবে।

পারিবারিক খরচে সবচেয়ে বেশি খরচ সাধারণত হয়ে থাকে খাওয়া-দাওয়ায়। এই খাওয়া-দাওয়ার বিষয়টিতে খেয়াল রাখতে হবে কোনো অপচয় যেন আমরা না করি। পরিবারের সবার পছন্দ হয় তেমন একটি তরকারি রান্না করতে হবে। সেইসঙ্গে ভাজি কিংবা ডাল। পুষ্টির বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে।

কেনাকাটা করতে গেলে আমাদের এতদিনের অভ্যাস, চোখের সামনে যা পড়ে কিনে নেওয়া। বাজার করতে যাওয়ার আগে প্রয়োজনীয় জিনিসের একটি নির্দিষ্ট লিস্ট বানিয়ে নিন। এতে দোকানে গিয়ে অযথা বাড়তি খরচ করা হবে না। দোকানে গিয়ে দেখা যায় যে জিনিসের প্রয়োজন আপনার একেবারেই নেই, তাও হয়তো হুট করে কিনে ফেলেন। অবশ্যই লিস্ট সঙ্গে রাখুন।

বাজার করুন একসঙ্গে। আপনি যদি মাসের বাজার লিস্ট ধরে একবারে করে ফেলেন তাহলে কিছু পণ্য দামে কম পাবেন। এতে বেশ কিছু টাকা থেকে যাবে হাতে। মাসের শুরুতেই ঠিক করে নিন মোটামুটি আপনাকে কী কী কিনতে হবে। শুকনো বাজারগুলো পাইকারি বাজার থেকে মাসে একবার কিনে ফেলবেন। আর তরকারি, সবজি, মাছ, গোশত, ডিম জাতীয় জিনিস সপ্তাহে একবার কিনুন।

কার্ডে বা মোবাইল ব্যাংকিংয়ে কেনাকাটা করার অভ্যাস অনেকের। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের মাধ্যমেও অনেকে অতিরিক্ত খরচ করেন। যে খরচটুকু না করলেও নয়। এবার সময় আপনার লাগাম টেনে ধরার। ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার কমাতে হবে। নগদ আদান-প্রদানে আপনি বুঝতে পারবেন যে টাকা খরচ হচ্ছে। ক্রেডিট কার্ডে নয়।

এসি ব্যবহারেও সীমিত হতে হবে। কারণ এতে বিদ্যুৎ বিল আসে খুব। এসি কেনার সময় ইনভার্টার এসি কেনার চেষ্টা করুন। এসি ব্যবহার করলে এসির তাপমাত্রা ২৫-এর নিচে দেবেন না। ২৫-এ দিয়ে হালকা করে সিলিং ফ্যান চালু করে দিন।

রাতে ঘুমানোর আগে বাড়ির সব ঘরের লাইট বন্ধ করেছেন কিনা দেখে নিন। বাসায় এলইডি বাল্ক্ব ব্যবহার করতে পারেন। এতে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে। ঘরে সাধারণ বাল্ক্বের পরিবর্তে এলইডি বাল্ক্ব লাগালে বিদ্যুৎ সাশ্রয় হয়। বিদ্যুতের জায়গায় অনেকে সৌরশক্তি ব্যবহার করেন। এটি লাগাতে প্রাথমিকভাবে বেশ খরচ হয়। তবে বাকি জীবনের জন্য অনেকটা সাশ্রয়ও পাওয়া যায়।

খুব শপিং করার অভ্যাস থাকলে তাতে রাশ টানুন। আসলে শপিং নেশার মতো। শপিংয়ে অহেতুক অপ্রয়োজনীয় জিনিস কেনা হয়, খরচও হয় বেশি। অনলাইন শপিং অ্যাপে প্রায়ই সেল বা ডিসকাউন্ট দেওয়া হয়। কাজে লাগাতে পারেন সে সবও।

ঘরে রাখুন মাটির ব্যাংক। সারাদিন খরচের পর যে খুচরা পয়সাগুলো থাকবে, তা এই ব্যাংকে রেখে দিতে পারেন। প্রয়োজনের সময় কাজে আসবে।

খুব প্রযোজন না হলে সংসারে বাড়তি কিছু কেনা কমিয়ে ফেলুন। এতেই সংসারের বাজেট ধরে রাখতে পারবেন। ধার করে তো অবশ্যই কিনবেন না। কিছু কেনার পরিকল্পনা করে নিন আগেই। কয়েক মাস ধরে টাকা জমিয়ে সেই জমানো টাকা দিয়ে প্রয়োজনের জিনিসটি কিনুন। সাধ্যের মধ্যেই বেঁধে রাখুন সাধ। আয় যতটুকু হবে ব্যয়ের হিসাবও তেমন হবে। তাহলে অর্থনৈতিক টানাপোড়েনে পড়তে হবে না।