দিন রাত্রি

দিন রাত্রি


প্রিয় দেবেশ'দা, আমি আকণ্ঠ পিপাসায় ভুগছি

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২০      

হাসান আজিজুল হক

প্রিয় দেবেশ'দা, আমি আকণ্ঠ পিপাসায় ভুগছি

দেবেশ রায় [১৭ ডিসেম্বর, ১৯৩৬-১৪ মে, ২০২০]

প্রতিষ্ঠিত লেখক এবং চিন্তক যারা আছেন, যাদের বয়েস হয়েছে, তারা একে একে বিদায় নিচ্ছেন। আমাকে যখন এঁদের নিয়ে বলতে বলা হয়, তখন কেউই হিসেব করে না, খরচের খাতায় এই লোকটাও তো আছে, বয়স আশি তারও তো পেরিয়েছে। আমি চলে গেলে আমার সম্বন্ধে কে বলবে, কে বলবে না, কে ভালো বলবে, কে মন্দ বলবে, তাতে আমার কি'বা আসবে-যাবে। তেমনি দেবেশ রায়, আমার দাদা, তাঁকে দেবেশ'দা বলে ডাকতাম, উনি চলে গেলেন; তাঁর জীবৎকালে এসব কথা লিখলে, উনি অসম্ভব রাগ করতেন, হয়তো বলতেন, তোমাদের চোখে আমি কী তবে মৃত, আমি কী আর নেই।

জীবনটা হলো ফুটবল খেলার মতো, খেলতে যখন নেমেছি, যতই ফাউল করা হোক না কেন, পড়ে যাবো, কিন্তু মাঠ ছাড়বো না- এই অদ্ভুত কথাটা আমাকে দেবেশ রায় বলেছিলেন। অনেক বছর আগে একবার কলকাতায় গিয়েছিলাম, তখন দেবেশ রায়ের সঙ্গে আমার পরিচয় ছিলো না। প্রখ্যাত কবি ও প্রাবন্ধিক অরুণ সেনের ছেলের সঙ্গে দেবেশ রায়ের কন্যার বিয়ে হয়েছিলো। সেবার কলকাতায় যাওয়ার পর একদিন অরুণ সেনকে টেলিফোন করি, কিন্তু ভুলবশত সেই ফোন চলে যায় দেবেশ রায়ের কাছে। ওই প্রান্ত থেকে হ্যালো বলার পর আমি বলি, 'অরুণদা কেমন আছেন', উনি বলেন, 'কোন নাম্বারে করেছেন', আমি বলি, 'এই নাম্বারেই করেছি', তিনি তখন 'এই নাম্বারে অরুণ সেন বলে কেউ থাকে না' বলে ফোন রেখে দিলেন। পরে যখন বুঝতে পারি উনি দেবেশ রায় ছিলেন, মনে হলো, মানুষটি তো অসম্ভব কটুভাষী! তার সম্পর্কে খারাপ ধারণা হলো, কোন সৌজন্যবোধের ধার তিনি ধারেন না। দেবেশ'দা প্রতিক্ষণ নামে একটি পত্রিকায় কাজ করতেন, তারা একবার আমার একটি সাক্ষাৎকার নিয়েছিলো। সেখানে দেবেশ'দাও ছিলেন। আমি যখন কথা বলছিলাম, তিনি একটি কথাও বলেননি, গভীর মনোযোগ দিয়ে চুপ করে শুনে গিয়েছিলেন। তখন তাকে বেশ রুক্ষ প্রকৃতির মানুষ মনে হয়েছিলো। এরপর কলকাতার একটি শিল্প-সাহিত্য সংগঠনের ডাকে একটি সভায় অংশ নিয়েছিলাম। আমি ছাড়াও আমার স্যার বদরুদ্দিন উমর, হুমায়ুন আজাদ, সুভাষ মুখোপাধ্যায়সহ অনেকেই ছিলেন। সেখানে আমি একটি বক্তৃতা করি। সভা চলাকালীন সময়ে হঠাৎ করেই দু'জন মানুষ এসে ঢুকলেন। তাদের একজন দেবেশ রায়। তারা বলতে লাগলেন, আপনারা বাংলা সংস্কৃতি নিয়ে কথা বলার জন্য বাংলাদেশ থেকে লোক নিয়ে এসেছেন, কলকাতার কাউকে নিমন্ত্রণ করেননি, এর উত্তর পাবেন একদিন, এমন নানা কথা বলে তারা চলে গেল। সেদিনও মনে হয়েছিলো, লোকটি আসলেই অত্যন্ত রূঢ় ও কটুভাষী। ততদিনে তার 'আপাতত শান্তি কল্যাণ হয়ে আছে', 'দুপুর', 'আহ্নিক গতি ও মাঝখানের দরজা'সহ বেশ কয়েকটি লেখার সঙ্গে পরিচিত হই।

পরবর্তীতে ঢাকায় একটি অনুষ্ঠানে তাঁর সঙ্গে আমার দেখা হয়। সেখানে একটি আসরে তার সঙ্গে আমিও ছিলাম। আরেকবার, একটি অনুষ্ঠানের আড্ডায় তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিলো, রবীন্দ্রনাথ নাকি ওয়ার্ডসওয়ার্থ? দেবেশ'দা তখন খাচ্ছিলেন, খাওয়া মুখে নিয়েই তিনি উত্তর দিলেন, রবীন্দ্রনাথের নাম তোমরা করবে না, তোমরা কিছুই জানো না তার সম্পর্কে। কেন এমন কথা বলো। সেদিনও মনে হয়েছিলো, লোকটি অত্যন্ত স্পষ্টবাদী ও রূঢ়ভাষী মানুষ। কিন্তু ধীরে ধীরে তাকে নিয়ে আমার ধারণা বদলে যায়। আমার মনে হয়, দেবেশ'দা ছিলেন ঝুনো নারিকেলের মতো। উপরটা ভীষণ কঠিন, কিছুতেই ভাংগা যাবে না। কিন্তু একবার যদি ভাংগা যায়, দেখা যাবে ভেতরটা নরম, সেটা একটা সম্পূর্ণ খাদ্য। দেবেশ রায়ের ভেতরটাও ছিলো তেমনি।

আমার 'বিধবাদের কথা' উপন্যাস বলি বা বড় গল্প বলি, এটির একটি সংস্করণ বেরিয়েছিলো কলকাতা থেকে, 'পাঠে-অন্তর্পাঠে বিধবাদের কথা' শিরোনামে। উপন্যাসের শেষে দেবেশ রায়, সাধন চট্টোপাধ্যায়, পৃথ্বীশ সাহা, ইমতিয়ার শামীমসহ অনেকের গদ্য ছিলো। সেখানে দেবেশ রায় চমৎকার একটি আলোচনা লিখেছিলেন। তার শেষ প্যারায় তিনি লিখেছিলেন, পাঠকদের মনে এ কথাটি আমি দাগিয়ে দাগিয়ে বলতে চাই, বাংলাদেশের একজন মানুষ, আমাদেরই মতো বাংলাভাষী, যিনি আমাদের ভাষাতেই কথা বলেন, মাত্র সাড়ে বারো হাজার শব্দের মধ্যে এই রকম একটি এপিক লিখেছেন, যা আমরা এতকাল জানি না। এপিকের সমস্ত গুণাবলি, এপিকের সমস্ত লক্ষণ তার মধ্যে পাওয়া যায়। আমি এই রচনাকে অতুলনীয় বলতে চাই। এই অতুলনীয়র বন্দনা করতে চাই। কিন্তু আমার বন্দনার ভাষা তো একটাই, আমি যে ডাকতে ভালোবাসি, হাসান ভাই। দেবেশ রায়, আমার দেবেশ'দা আর আমাদের মাঝে নেই। তার কথা ভাবলে আমি অশ্রুসজল হয়ে পড়ি।

দেবেশ রায়ের সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের এখানে আমাদের সবার প্রিয় মানুষ অধ্যাপক আনিসুজ্জামানও প্রয়াত হলেন। বলতে চাই, দুটি বিশাল বটবৃক্ষ প্রায় একই সঙ্গে উৎপাটিত হলো, উন্মূল হলো। আমাদের মাথার ওপর এখন আর ছায়া নেই। দুপুরের রৌদ্র দহনে আমরা এখন পুড়ছি। এই দুটি মানুষের শূন্যতায় আমরা আকণ্ঠ পিপায় ভুগছি।

বাংলা ভাষায় আমরা আর কিছু না পাই, কয়েকজন কথাসাহিত্যিক পেয়েছি, কবি পেয়েছি। বিশ্বসাহিত্যের সঙ্গে তুলনীয় সাহিত্য আমাদের আছে। কথাসাহিত্যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ, তারাশংকরের নাম করবো। পরবর্তীকালে সতীনাথ ভাদুড়ীর নাম নিতে চাই। তারই ধারাবাহিকতায় আমরা দেবেশ রায়কে পেয়েছি, পেয়েছি তার তিস্তা পাড়ের বৃত্তান্ত, মফস্বলি বৃত্তান্ত, মানুষ খুন করে কেনসহ অসাধারণ বেশ কিছু গল্প। আরও পেয়েছি একজন মানুষ, যিনি অকাতরে অপরের প্রশংসা করতে পারেন। এবং এমন করেই তিনি প্রশংসা করতেন, যা অত্যন্ত যুক্তিসিদ্ধ, অত্যুক্তি বলে মনে হবে না কখনো। সেই মানুষটি, দেবেশ রায়, তিনি চলে গেলেন। আমি বাকরুদ্ধ। শেষ দিকে তিনি প্রায় বধির হয়ে গিয়েছিলেন, কিছুই শুনতে পেতেন না। কিন্তু জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে সচল ছিলেন। পুরো জীবনে যা কিছু লিখেছেন অত্যন্ত যত্ন নিয়ে, পরিশ্রমসহ লিখেছেন। এবং সেই লেখা যতক্ষণ পর্যন্ত না সাহিত্যের মানদণ্ডে উন্নীত হতো, ততক্ষণ পর্যন্ত তিনি কাটাকুটি করতে থাকতেন। এমন অসাধারণ অধ্যবসায়ী, স্নেহশীল, সার্বজনীন, উদার এবং মানবিক মানুষ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। তার বিদেহী আত্মার প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা।