দেহঘড়ি

দেহঘড়ি


শিশু-কিশোরদের ডায়াবেটিস

প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০১৯      

আব্দুলল্গাহ শাহরিয়ার,সহযোগী অধ্যাপক, শিশু কার্ডিওলজি বিভাগ এনআইসিভিডি, ঢাকা

অনেকের ধারণা ডায়াবেটিস মেলাইটাস শুধু বড়দের হয়। ধারণাটি মোটেও ঠিক নয়। বিভিন্ন কারণে শিশুরা ডায়াবেটিস রোগে আক্রান্ত হতে পারে। অধিকাংশ শিশুর ডায়াবেটিস হয় মূলত অগ্ন্যাশয়ের প্রয়োজনীয় পরিমাণ ইনসুলিন তৈরি করতে ব্যর্থ হওয়ার কারণে। যাকে চিকিৎসার পরিভাষায় টাইপ-১ ডায়াবেটিস বলা হয়ে থাকে। আবার অনেক শিশুর শরীরে ইনসুলিন যথেষ্ট পরিমাণে নিঃসৃত হওয়ার পরও ঠিক মতো তা কাজ করতে পারে না। এ অবস্থাকে টাইপ-২ ডায়াবেটিস বলা হয়। আবার কোনো কোনো শিশু টাইপ-১ ও টাইপ-২ উভয় প্রকার ডায়াবেটিসেই একসঙ্গে আক্রান্ত হতে পারে।

টাইপ-১-এর ধরন

টাইপ-১ ডায়াবেটিসের প্রবণতা বিশ্বব্যাপী এক ধরনের নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ, এলাকা বা জনগোষ্ঠী ভেদে ডায়াবেটিসের প্রবণতা ভিন্নতর। সাধারণত এক বছর বয়সের কম বয়সী শিশুদের ডায়াবেটিস হতে দেখা যায় না। ১০ থেকে ১৪ বছর বয়সীদের ডায়াবেটিসে অধিক হারে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা পরিলক্ষিত হয়। টাইপ-১-এর কারণ হিসেবে জিনঘটিত (বংশগতির ধারক ও বাহক) অটোইমিউন রোগ, পরিবেশগত কারণ (মাম্পস ভাইরাস, কক্সাসাকি বি ভাইরাস ইত্যাদি) কাজ করে।

টাইপ-২-এর ধরন

শিশুদের সাধারণত টাইপ-২ ডায়াবেটিস হয় না। তবে উন্নত দেশগুলোর মানুষের দৈহিক স্থূলতা বৃদ্ধির সঙ্গে টাইপ-২ ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। এসব দেশে টাইপ-২ ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যা টাইপ-১ ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যার আট গুণ। ফাস্টফুড জাতীয় খাবারের প্রতি ক্রমবর্ধমান আসক্তি, কর্মবিমুখতা, আয়েশি জীবনযাত্রা, দৈহিক পরিশ্রম বা ব্যায়াম না করায় দেহের আকার-আকৃতি ও ওজন বেড়ে যায় এবং পরিণামে টাইপ-২ ডায়াবেটিক রোগীর সংখ্যাও বাড়ছে।

রোগের লক্ষণ

আমাদের দেশে যেসব কিশোরের ডায়াবেটিস শনাক্ত করা গেছে, সেটি পিডিপিডি (প্রোটিন ডেফিসিয়েন্সি প্যানক্রিয়েটিক ডায়াবেটিস) শ্রেণির এবং তাদের অগ্ন্যাশয়ে পাথর ছিল। ইদানীং আমাদের দেশে শিশু-কিশোরদের মধ্যে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। শিশুর ডায়াবেটিসের লক্ষণ ও প্রকৃতি বড়দের মতোই। এর মধ্যে সবচেয়ে প্রকট হলো ঘন ঘন প্রস্রাব হওয়া, অধিক পিপাসা বা ক্ষুধা পাওয়া, দৈহিক দুর্বলতা ও খাওয়ার রুচি বেশি থাকা সত্ত্বেও ওজন কমতে থাকা ইত্যাদি। শিশুর বেড়ে ওঠার সময়ের মধ্যে একবার যদি ডায়াবেটিস হয়, তবে তা যেমন তাকে সারাজীবন বহন করতে হবে, তেমনি এই ডায়াবেটিস তার দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধিকে ব্যাপকভাবে বাধাগ্রস্ত করবে। ফলে তার বয়োঃসন্ধিকালও বিলম্বিত হতে পারে। পরিবেশজনিত কারণগুলো ছাড়াও গর্ভকালীন মায়ের অপুষ্টি, কম ওজন নিয়ে জন্মানো ইত্যাদি ডায়াবেটিসের কারণ হিসেবে গণ্য হচ্ছে।

ডায়াবেটিসের জটিলতা

ডায়াবেটিস একটি দীর্ঘস্থায়ী রোগ। শিশু-কিশোরদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস হলে বয়স্কদের মতো তারাও হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকসহ আরও কিছু ভয়াবহ পরিণতির শিকার হয়। এসব জটিলতা কম বয়সেই দেখা দেয়। বাংলাদেশে অভিজাত শ্রেণির স্থূলকায় শিশুরা টাইপ-২ ডায়াবেটিসে অনেক বেশি হারে আক্রান্ত হয়। নাদুস-নুদুস হওয়া ও শারীরিক পরিশ্রম না করা আভিজাত্য ও সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ- এরূপ ভ্রান্ত ধারণা আমাদের শিশুদের প্রতিনিয়ত ভয়ঙ্কর পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে।

ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসা

শিশু-কিশোরদের ডায়াবেটিস চিকিৎসা করার আগে ৪টি লক্ষ্য স্থির করা হয়। (১) ডায়াবেটিস কিটো এসিডোসিসের ক্ষেত্রে নিরাপদ ও জটিলতামুক্ত জীবনের ব্যবস্থা করা, (২) রক্তের গ্লুকোজ খুব বেশি যেন না কমে যায় সে ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া, (৩) দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা যতটা কমানো যায় তার ব্যবস্থা করা ও (৪) শিশুর স্বাভাবিক দৈহিক ও মানসিক বৃদ্ধির জন্য যতটা সম্ভব প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া।

ডায়াবেটিসের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পর্যাপ্ত পুষ্টি। প্রথমবার যাদের ডায়াবেটিস আছে বলে শনাক্ত করা হয়, তাদের অন্তত পক্ষে অর্ধেক সঠিক পুষ্টি এবং সুষ্ঠু উপযোগী জীবনযাপনের ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করেই ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। বাকি অর্ধেকের জন্য রক্তের গ্লুকোজ কমানোর ট্যাবলেট প্রয়োজন হতে পারে। তাদের সবার জন্যই পরিমিত ও নিয়মিত ব্যায়াম অপরিহার্য। কারও কারও ডায়াবেটিস নিয়ন্ত্রণের জন্য ত্বকের ভেতর ইনসুলিন ইনজেকশনের প্রয়োজন হতে পারে। আমাদের দেশে যেসব শিশু-কিশোর ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হয়, তাদের বেশিরভাগই ডায়াবেটিসজনিত জটিলতা নিয়েই প্রথমবার চিকিৎসকের কাছে যায়- এদের সঠিক চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয় না। তাই এ ব্যাপারে অভিভাবকদের মাঝে তো বটেই, সব স্তরে সচেতনতা গড়ে তোলা জরুরি।