দেহঘড়ি

দেহঘড়ি


ঘরের পুরনো ধুলাবালি থেকে অ্যালার্জি

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০১৯      

অধ্যাপক ডা. গোবিন্দ চন্দ্র দাস

বছরব্যাপী মানুষ ভোগে নাক থেকে পানি ঝরায়, চোখ চুলকানি, চোখ থেকে পানি ঝরায়। এর কারণ, ঘরের ধুলার জীবাণু। ধুলার কারণে অ্যাজমা রোগীদের শ্বাসকষ্ট বেড়ে যায়, নিঃশ্বাসের সঙ্গে সঙ্গে কাশি হয়।

ঘরের ধুলা থেকে অ্যালার্জি হয় কেন

ঘরের ধুলা প্রকৃতপক্ষে অনেকগুলো জিনিসের মিশ্রণ। এর উপাদানগুলো কমবেশি হতে পারে, এক ঘর থেকে আরেক ঘরের ফার্নিচারের প্রকারভেদে, ঘর তৈরির উপাদানের কারণে, পোষা প্রাণীর উপস্থিতির কারণে, আর্দ্রতার কারণে। ধুলার মধ্যে থাকতে পারে সুতার আঁশ, মানবদেহের ত্বকের মৃত কোষ, প্রাণীর লোম, আণুবীক্ষণিক জীবাণু, তেলাপোকার প্রত্যঙ্গ, ছত্রাকের জীবাণু, খাদ্যকণা এবং আরও অনেক পরিত্যক্ত ক্ষুদ্র জিনিস। এগুলোর মধ্যে প্রাণীর লোম, তেলাপোকা এবং ধুলার জীবাণু হচ্ছে প্রধান তিন বিপজ্জনক বস্তু। কোনো ব্যক্তি এগুলোর যে কোনোটির কারণে ভুগতে পারেন এবং তিনি যখন ধুলার সংস্পর্শে আসেন, তখন অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া ঘটে।

ধুলার অ্যালার্জি হলে কি বলা চলে যে এটি একটি  নোংরা বাড়ি

নোংরা বাড়ির কারণে অ্যালার্জি সমস্যা বেড়ে যেতে পারে যদিও, স্বাভাবিক ঘর পরিস্কারের প্রক্রিয়া ধুলার অ্যালার্জি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। কারণ ধুলার সব উপাদান এভাবে দূর করা সম্ভব নয়। যেমন আপনি ভ্যাকুয়াম ক্লিনার দিয়ে যত চেষ্টাই করেন না কেন, কার্পেট, মাদুর এবং বালিশ থেকে ধুলার জীবাণু দূর করতে পারবেন না। বরং এতে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে পড়তে পারে।

ধুলার জীবাণুগুলো কী কী

অতি ক্ষদ্র আণুবীক্ষণিক এই প্রাণীগুলো আট পায়ের অ্যারাকনাইর পরিবারের অন্তর্গত। আঁটুলি পোকা এবং চিগার একই পরিবারভুক্ত। এগুলো শক্ত দেহের অধিকারী।

এরা ৭০০ ফারেনহাইট বা তার উচ্চ তাপমাত্রায় ভালোভাবে বাঁচতে পারে। ৭৫-৮০ শতাংশ আর্দ্রতাই এদের পছন্দ। আর্দ্রতা ৪০-৫০ শতাংশের কম হলে এদের বংশ বৃদ্ধি হয় না। শুস্ক আবহাওয়ায় এদের দেখা যায় না।

দেখা গেছে, শতকরা ১০ ভাগ মানুষ এদের কারণে আক্রান্ত হয়। অ্যাজমা রোগীদের মধ্যে শতকরা ৯০ জনই এদের সংস্পর্শে এলে অ্যালার্জি প্রতিক্রিয়ায় আক্রান্ত হয়।

এই জীবাণুদের দেহ-মুখমণ্ডলের সংস্পর্শে এলে মানুষের অ্যালার্জি হয়। এদের সবচেয়ে বেশি দেখা যায় বালিশে, মাদুরে, কার্পেটের ভাঁজে এবং আসবাবপত্রের তলায়। ঝাড়ূ দিলে বা ভ্যাকুয়াম ক্লিনার প্রয়োগ করলে এরা বাতাসে ভাসতে থাকে অথবা হেঁটে হেঁটে অন্য প্রান্তে সবে যায়। অ্যালার্জি রোগীদের শ্বাসের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করে এবং উপসর্গ বাড়িয়ে দেয়। প্রকৃতপক্ষে যে ব্যক্তি দিনে আট ঘণ্টা ঘুমান তার জীবনের এক-তৃতীয়াংশ সময় বালিশে বাসা বেঁধে থাকা জীবাণুগুলোর প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে থাকে। এক প্রান্তের ধুলার মধ্যে সর্বোচ্চ ১৯ হাজার পর্যন্ত জীবাণু থাকতে পারে। গড়ে এই সংখ্যা প্রতি গ্রামে ১০ হাজার। প্রত্যেক জীবাণু দিনে ১০টি নতুন সৃষ্টি করে। এদের বেঁচে থাকার মেয়াদ ৩০ দিন।

এদের খাদ্য মূলত পশুর লোম এবং ত্বকের মৃত কোষ। সুতরাং যেখানে মানুষের বাস, সেখানেই এদের বসবাস। এরা কামরায় না, অন্য কোনো রোগ ছড়ায় না এবং মানুষের শরীরে বাসা বাঁধে না। এরা শুধু সেই মানুষগুলোর প্রতি ক্ষতিকর, যাদের এই জীবাণুদের প্রতি অ্যালার্জি রয়েছে। সাধারণত বাড়িতে যেসব জীবাণুরোধ ব্যবহার করা হয়, সেগুলো দিয়ে এদের অপসারণ করা যায় না। ফলে ঘরে ধুলার জীবাণুর পরিমাণ কমানো সম্ভব হয় না।

ঘরের ধুলাতে ছত্রাক থাকে কেন?

ছত্রাক থাকে সাধারণ বাইরের বাতাস। তবে যে কোনো বাড়িতেই ছত্রাক কলোনি তৈরি হওয়া সম্ভব। বাড়ির বাসিন্দারা হয়তো দেয়ালে ছত্রাকের কলোনি দেখতে পায় না, কিন্তু সেটি ঠিকই তৈরি হতে থাকে। দুটি জিনিস ঘরের মধ্যে ছত্রাকের কলোনি গড়তে বিশেষ ভূমিকা রাখে। এক, বেশি আর্দ্রতা শতকরা ৫০-এর বেশি। পানির পাইপে ক্ষুদ্র ফুটা বা যে কোনো পানির প্রবাহ এতে ভূমিকা রাখে। দুই, দেয়ালে কোনো বোর্ড থাকলে বা স্যাঁতসেঁতে আসবাব থাকলে সেখানে ছত্রাক জন্মায়। ছত্রাকের স্পোর কাপড়ের মাধ্যমে ছড়ায়। এই স্পোর থেকে সুনির্দিষ্ট জীবনচক্রের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ছত্রাক তৈরি হয় অনুকূল পরিবেশে। যেসব রোগীর ছত্রাকে অ্যালার্জি আছে, তারা ছত্রাক অধ্যুষিত বাড়িতে থাকলে নিশ্চিতভাবে ছত্রাকজনিত অ্যালার্জির শিকার হন। কারণ তারা নিঃশ্বাসের সঙ্গে ছত্রাক গলাধকরণ করেন।

[দি অ্যালার্জি অ্যান্ড অ্যাজমা সেন্টার
৪৩ আর/৫ সি পশ্চিম পান্থপথ, ঢাকা