হাঁটুর ব্যথার চিকিৎসা

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০১৯      

ডা. সামনুন এফ তাহা, এমআরসিপি (ইউকে) ডিপ্লোমা ইন জেরিয়াট্রিক মেডিসিন (লন্ডন), জেরিয়াটিক মেডিসিন বিশেষজ্ঞ

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটুর ক্ষয় হতে থাকে, যা অস্টিও আর্থ্রাইটিস নামে পরিচিত। মূলত এ কারণেই হাঁটুতে ব্যথা অনুভূত হয়। বেশিরভাগ বয়স্ক লোকের হাঁটুতে ব্যথা অনুভূত হয়, যা তাদের জন্য মারাত্মক এক সমস্যা। অনেক সময় এর তীব্রতা এত বেশি হয় যে, ব্যথার কারণে তারা বিছানা থেকে ওঠার সামর্থ্যও হারিয়ে ফেলে। বাংলাদেশে আনুমানিক প্রায় ১ কোটি লোক অস্টিও আর্থ্রাইটিসে ভুগছে।

আক্রান্তদের মধ্যে নারীদের সংখ্যা বেশি। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ৬৫ বছর বয়সের ঊর্ধ্বে প্রতি ৩ জন নারীর মধ্যে ২ জন অস্টিও আর্থ্রাইটিসে বা হাঁটুতে ব্যথায় ভুগছেন। তা ছাড়া এই রোগে আক্রান্ত পুরুষদের অর্ধেকেরই বয়স ৬৫ বছরের ঊর্ধ্বে। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে হাঁটুর চারদিকের জয়েন্ট বা সন্ধির ক্ষয়জনিত কারণে সাধারণত অস্টিও আর্থ্রাইটিস হয়ে থাকে। হাঁটু ছাড়াও শরীরের ভার বহনকারী অন্যান্য প্রধান জয়েন্ট যেমন কোমর ও গোড়ালির গিঁট প্রভৃতি জায়গায়ও অস্টিও আর্থ্রাইটিস হতে পারে। এ ধরনের আর্থ্রাইটিস ধীরে ধীরে অস্থি সদৃশ্য যে অংশ জয়েন্ট গঠনে সহায়তা করে তার ক্ষতিসাধন করে। অস্টিও আর্থ্রাইটিস হলে হাড়ের মসৃণ পৃষ্ঠদেশ এবড়োখেবড়ো হয়ে পড়ে এবং কোথাও কোথাও গহ্বরের সৃষ্টি হয়। হাড়ের এরূপ ক্ষয়সাধনের ফলেও স্বাভাবিক পৃষ্ঠ অমসৃণ হয়ে যাওয়ায় অস্থি সন্ধিতে ব্যথা অনুভূত হয়ে থাকে।

এ ছাড়া কখনও কখনও ওই জায়গা ফুলে যেতে পারে। হাঁটুর স্বাভাবিক নড়াচড়া ব্যাহত হতে পারে, জয়েন্টের অভ্যন্তরে মড় মড় শব্দ হতে পারে, এমনকি অনেক সময় হাঁটু বেঁকেও যেতে পারে। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হাড়ের ক্ষয়জনিত কারণ ছাড়াও অ্যাথলেটস, শ্রমিক এবং যারা অত্যধিক শারীরিক পরিশ্রম করে, তাদের হাঁটুতে মাত্রাতিরিক্ত স্ট্রেস বা চাপ পড়ায় আর্থ্রাইটিস হওয়ার ঝুঁকি অনেক বেশি। জয়েন্ট ইনজুরি বা সন্ধি আঘাতপ্রাপ্ত হওয়া বা ফ্যাকচার হওয়া প্রভৃতির সঙ্গে আর্থ্রাইটিস সম্পর্ক যুক্ত এবং এর ফলে জয়েন্টের অভ্যন্তরীণ টিস্যু বা কোষের ক্ষতিসাধিত হতে পারে। যে সব ব্যক্তির কয়েকবার হাঁটুতে আঘাত পাওয়ার অভিজ্ঞতা রয়েছে, বয়স বাড়লে তাদেরই অস্টিও আর্থ্রাইটিস হওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যায়। যে সব ব্যক্তির শরীরের ওজন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি তাদের অতিরিক্ত ওজনের কারণে হাঁটুতে মাত্রাতিরিক্ত চাপ পড়ায় অস্টিও আর্থ্রাইটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যে সব ব্যক্তি তরুণ বয়সে মাত্রাতিরিক্ত ওজনের অধিকারী হন তাদেরও বয়সকালে আর্থ্রাইটিস হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি থাকে। অনেক সময় দেখা যায়, হাঁটুতে রসের পরিমাণ বেড়ে গিয়ে জায়গাটা ফুলে গেছে এবং এর কারণে খুঁড়িয়ে বা থেমে থেমে হাঁটতে হচ্ছে। অর্থাৎ স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে না পারা, আক্রান্ত হাঁটুর স্বাভাবিক গতি কমে যাওয়া বা হাঁটু স্বাভাবিক অবস্থায় যতটুকু বাঁকানো যায় তা করতে না পারা অথবা হাঁটু সম্পূর্ণ সোজা করতে পারার সামর্থ্য হারিয়ে ফেলা, অবশেষে অবস্থা যখন খুব খারাপের দিকে যায় তখন প্রচণ্ড ব্যথা অনুভূত হওয়া প্রভৃতিই এই রোগের উল্লেখযোগ্য লক্ষণ। এ ছাড়া অন্য প্রধান উপসর্গগুলো হলো- হাঁটুতে বার বার ব্যথা অনুভূত হওয়া। হাঁটু কিছুক্ষণ নড়াচড়া বা সক্রিয় থাকার পর এর অবস্থা আরও শোচনীয় হওয়া। আবার একটানা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে থাকলে হাঁটুর স্টিফনেস বা আড়ষ্টতা বেড়ে যাওয়া, তখন হাঁটু স্বাভাবিকের মতো সোজা করা বা বাঁকানো যায় না। এ ছাড়া অতিরিক্ত কাজ করলে হাঁটু ফুলে যায় এবং অস্টিও আর্থ্রাইটিসের মাত্রা তীব্রতর হলে হাঁটু অনেক সময় ধনুকের মতো বেঁকে যায়। অস্টিও আর্থ্রাইটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের বেশিরভাগকেই নন-সার্জিক্যাল চিকিৎসা যেমন ওষুধ সেবন, ফিজিওথেরাপি, জীবনযাপন প্রণালির পরিবর্তন বা ইঞ্জেকশন প্রভৃতির মাধ্যমে চিকিৎসা করা যেতে পারে। এতেও যদি ব্যথা নিরাময় না হয় তবে সেই ক্ষেত্রে সার্জারির মাধ্যমে চিকিৎসার বিষয় বিবেচনা করা হয়। এ ছাড়া সম্পূর্ণ হাঁটুর জয়েন্ট প্রতিস্থাপন বা টোটাল নী রিপ্লেসমেন্ট সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি, যা বর্তমানে দেশের অত্যাধুনিক হাসপাতালগুলোয় অভিজ্ঞ ও দক্ষ হাঁটু বা নী সার্জনদের তত্ত্বাবধানে করা সম্ভব।

অন্যান্য