ডাক্তারবাড়ি

ডাক্তারবাড়ি


করোনায় হৃদরোগী

বাড়তি সচেতন থাকুন

প্রকাশ: ১১ জুলাই ২০২০      

ডা. আব্দুল্লাহ শাহরিয়ার

করোনায় আক্রান্ত রোগীরা বা এ রোগের কারণে যারা দেশ-বিদেশে মৃত্যুবরণ করেছেন, তাদের ইতিহাস নিলে দেখা যাবে, এদের অধিকাংশ অন্যান্য রোগের চেয়ে হৃদরোগে অধিক হারে আক্রান্ত ছিলেন। তাহলে কি হৃদরোগীদের করোনার ভয়ংকর ছোবল থেকে বেঁচে থাকা আসলেও কঠিন ব্যাপার? যাদের হার্টের পাম্প করার ক্ষমতা কম, তাদের শরীরে এমনিতেই অক্সিজেনের কিছুটা ঘাটতি থেকে যায়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাও কম থাকে। তাহলে কি তারা অধিক হারে ঝুঁকিতে রয়েছেন?

হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, কিছু হার্টের অসুখের রোগী আছেন, যাদের পেসমেকার বা ভাল্‌ভ রিপ্লেসমেন্ট হয়েছে। এদের সংক্রমণের ঝুঁকি তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি। তাই বাড়ির কোনো সদস্যের জ্বর-সর্দি-কাশি হলে এদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। একই সঙ্গে চিকিৎসকের নির্দেশিত ওষুধ সেবনে যেন কোনো ধরনের গাফিলতি না হয়। অল্পবিস্তর অসুখে চিকিৎসকের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে পরামর্শ নেওয়া বাঞ্ছনীয়। বাড়ির বাইরে যাওয়ার কোনো ঝুঁকি নেবেন না। তবে যদি রোগীর হার্টে বড় ধরনের কোনো সমস্যা হয় বা হার্ট অ্যাটাক হয়, কিংবা শ্বাসকষ্ট ও জ্ঞান হারিয়ে ফেলার মতো অবস্থা হয়, সে ক্ষেত্রে হার্টের চিকিৎসার সুবিধা রয়েছে এমন কোনো হাসপাতালে রোগীকে নিয়ে যেতেই হবে।

কভিড-১৯-এর সংক্রমণে মূলত শ্বাসনালি ও ফুসফুস আক্রান্ত হয়। এর ফলে শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যায়। অক্সিজেন কমে গেলে স্বাভাবিকভাবেই হার্টের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে। তাই হার্টের সমস্যায় কভিড-১৯ ভাইরাসের সংক্রমণ হলে শরীরে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে গিয়ে অ্যাকিউট রেসপিরেটরি ডিসট্রেস সিনড্রোম বা 'এআরডিএস'-এর ঝুঁকি অত্যন্ত বেড়ে যায়। এর ফলে সেপটিসিমিক শকে চলে যেতে পারে। তখন রোগীকে ভেন্টিলেটর ব্যতীত সেবাদান করা সম্ভব হয় না। আর এ ক্ষেত্রে রোগীর জীবন-সংশয়ের সম্ভাবনা বাড়ে। সুতরাং হৃদরোগীদের আপৎকালীন সময়টিতে শরীরের দিকে বাড়তি নজর দিতে হবে।

আমেরিকান কলেজ অব কার্ডিওলজি কভিড-১৯ করোনাভাইরাস আক্রান্ত হার্টের অসুখের রোগীদের জন্য একটি গাইডলাইন মেনে চলার কথা বলেছে। এই গাইডলাইন অনুযায়ী কারও মায়োকার্ডিয়াল ইনফ্যাকশন অর্থাৎ হার্ট অ্যাটাক হলে প্রাইমারি পিটিসিএ বা এনজিওপ্লাস্টি করতে বারণ করা হয়েছে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণের পাশাপাশি হার্ট অ্যাটাক হলে থ্রম্বোলাটিক থেরাপি স্ট্রেপ্টোকাইনেজ বা এটিলেপেটেজ বা নিদেনপক্ষে এসপিরিন সহকারে চিকিৎসা করার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা।

যেভাবে শরীরের সেবা-যত্ন নেবেন

- আমাদের দেশে প্রথম কভিড-১৯ করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী মারা যান হার্ট অ্যাটাক এবং ডায়াবেটিসজনিত জটিলতায়। তাই হার্টের অসুখ থাকলে শরীরের বাড়তি যত্ন নেওয়াও দরকার। লকডাউনে বাড়িতে থাকতে হচ্ছে বলে শরীরচর্চা করা বন্ধ করলে চলবে না। উপায় থাকলে ভোরে বা সন্ধ্যার সময় ছাদে হাঁটা যেতে পারে। বাসায় ট্রেডমিল বা জিম বাইক থাকলে তার সদ্ব্যবহার করুন

- নিয়মিত প্রাণায়াম ও হালকা ব্যায়াম করতে হবে। প্রয়োজনে অভিজ্ঞ প্রশিক্ষকের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করে হার্ট ভালো রাখার ব্যায়াম অভ্যাস করে নিন।

- নির্দিষ্ট সময় ওষুধ খেতে ভুলবেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হার্টের অসুখের রোগীদের উচ্চ রক্তচাপ, কোলেস্টেরেলের আধিক্য, ডায়বেটিস, কিডনির রোগ থাকে। এসব সমস্যার জন্য নির্দিষ্ট ওষুধ খাবার পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবার খেতে হবে। ভিটামিন সি, ভিটামিন এ এবং ভিটামিন ই সমৃদ্ধ খাবার খেতে হবে। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বা ইমিউন শক্তি জোগাতে জিংক ট্যাবলেট ২০ মি. গ্রাম খেতে পারেন।

- এ ছাড়া বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন মেনে বাড়িতে থাকলেও মুখে-চোখে হাত দেবেন না। খাবার আগে-পরে তো বটেই, কিছুক্ষণ পর পর ভালো করে হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে নিন। মনে রাখবেন, এই দুঃসময়ে দামি এবং দুষ্প্রাপ্য স্যানিটাইজারের চেয়ে এই সাবান পানিই আপনার জন্য অধিক কার্যকর ভূমিকা পালন করবে।

- অকারণে মাস্ক পরে বসে থাকার দরকার নেই। বরং সাধারণ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। কোনো দরকারি কাজে বের হলে সামাজিক দূরত্ব অর্থাৎ ৬ ফুট দূরত্ব বজায় রাখুন। এই মরণঘাতী ভাইরাস প্রতিরোধের একমাত্র উপায় ঘরের বাইরে না যাওয়া।

[সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান শিশু বিভাগ, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল]