চারমাত্রা

চারমাত্রা


নাজমা আপা...

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০১৯      

রহিমা আক্তার মৌ

প্রিয় নাজমা আপা,

আশা করি ভালো আছিস। পুরো এক বছর এগারো মাসের বড় তুই। তবুও তুই বলেই কথা বলি, এটা শুধু অভ্যাস নয়, এটা ভালোবাসা।

তুই ছিলি লেখাপড়ায় খুবই মেধাবী আর আমি ধাক্কাতে ধাক্কাতে পাস করতাম। তুই যে শুধু এসএসসি ফার্স্ট ডিভিশন তা নয়, এইচএসসি অনার্স, মাস্টার্স সব ক্ষেত্রেই ফার্স্ট ক্লাস আছে। শুধু আমার প্রিয় মুখের নয়, পুরো পরিবার, পুরো স্কুল, আর এলাকার প্রিয় মুখ ছিলি; আছিস এখনও। আমাদের দুই বোনের ছোটবেলার মধুর স্মৃতি লিখলে কাগজ শেষ হবে, কলমের কালি ফুরিয়ে যাবে। আমরা দুই বোন অনেকটাই ভিন্ন স্বভাবের। তুই খুব শান্ত, আর আমি চঞ্চল। তুই মেধাবী আর আমি ঠনঠন!

১৯৯৯ সালে তোর কিডনি সমস্যা শুরু, এ যেন আমাদের পরিবারের সবার বুকফাটা কষ্ট। দীর্ঘদিন চিকিৎসা করার পর ২০০৯ সালে কিডনি প্রতিস্থাপন। কিডনি প্রতিস্থাপনের এক মাস পর তুই ভীষণ অসুস্থ। হাসপাতালে তুই ভর্তি। প্রতিদিন না হলেও একদিন পরপর যেতাম তোকে দেখতে। তোর কষ্ট দেখে বুক ফেটে যেত। কিন্তু আমি কাঁদতে পারতাম না। আমি কেমন জানি পাথর হয়ে গেছি। অথচ এখন চিঠি লিখতে গিয়ে খুব কাঁদছি। তুই সুস্থ হয়েছিস।

এখনও দু'বোন একসঙ্গে হলে একটু বাইরে বের না হলে ভালো লাগে না। সেই ছোটবেলার মতো একসঙ্গে ঘুরতে ঘুরতে, গল্প করতে করতে। আমাদের বড় ভাই ছিল না, ছোট দুই ভাই। বাবা শহরে চাকরি করতেন। সপ্তাহে দুই দিন দু'জনের বাজারে যাওয়া। বাজারের ব্যাগ বহন করতে তোর কষ্টই হতো। কিন্তু আমি তো জেদি ছিলাম, অর্ধেক পথ তোকে নিতে হবে, বাকি অর্ধেক আমি। এখন মনে হলেই খুব কষ্ট হয়, আমি এত পাজি ছিলাম কেন রে! তবে যখন চালের মেশিনে ধান নিয়ে যেতাম ভাঙাতে, তখন কিন্তু মা তোর বস্তায় কম করেই ধান দিত। মা আমায় বলত-

'তোর শক্তি বেশি তুই বেশি নিবি, ওর শক্তি কম ও কম নেবে।'

দেখছিস, মা ঠিকই বুঝেছে, অথচ আমি...

ছোটবেলায় আমি খুব ঘুমপ্রিয় ছিলাম। পড়তে বসে চেয়ারে মাথা দিয়ে মুখ হাঁ করে ঘুমিয়ে যেতাম। তুই লবণ, পানি এসব আমার মুখে দিয়ে দিতি। আমি লাফ দিয়ে উঠে সে কী কান্না শুরু! মা দৌড়ে আসলে, তুই বলতি- 'মা, পড়তে বসলেই ওর ঘুম, আর সারাদিন পাড়া বাড়ানি করে তখন তো ঘুম আসে না।'

খুব হাসি পায় এসব মনে করে। ভালো থাকিস, ইদানীং আবার তোর শরীর ভালো যাচ্ছে না। দোয়া করি তুই সুস্থ থাক, ভালো থাক।

ইতি, তোর পাগলি বোন।

তেজগাঁও, ঢাকা