চারমাত্রা

চারমাত্রা


বাবার শরীরের ঘ্রাণ

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০১৯      

বিউটি ইজাজ

বাবা,

তোমার শরীরের গন্ধটা কেমন ছিল? খুব শুঁকতে ইচ্ছা করে। কিন্তু ঈশ্বর সে সুযোগ আমাকে দেয়নি। কেড়ে নিয়েছে। বাবা, তোমাকে ঈশ্বরের কাছ থেকে ক'টা দিনের জন্য ধার আনব। তুমি রাজি থেকো! আমার যন্ত্রণার কথা বলব, তোমার গায়ের গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে বুকে মাথা পেতে ঘুমিয়ে যাব। বাবা নামক বটের ছায়া শরীরে মেখে কাঠফাটা রোদে পথ চলব। বাবার পরশ নাকি খুব শীতল হয়। সেই অনুভবটা গায়ে মাখার প্রবল ইচ্ছা করছে। গত চব্বিশ বছর ধরেই তোমার স্নেহ পাওয়ার প্রতীক্ষায় আছি। আসবে কি বাবা?

বাবারা নাকি স্বার্থহীন হয়। কিন্তু তুমি এত স্বার্থপর কেন? দিব্যি ভুলে আছো আমাকে। তোমার একবারও কি মনে পড়ে না! আমার শরীরের ঘ্রাণ নিতে কি একবারও তোমার ইচ্ছা হয় না! এক আশ্বিনের বিকেলে উত্তাল জলের সঙ্গে খেলতে গেলে। খেললে ইচ্ছামতো। দিব্যি ভুলে গেলে আমার কথা। তারপর আর তোমার নৌকা ঘাটে নোঙর করেনি। স্রোতের সঙ্গে এক অজানায় ভেসে গেলে। আমি তখন তিন বছরের শিশু। তোমার কায়াও মনে পড়ে না এখন আর। কিন্তু অনুভবে থাকো সবসময়। মা এখনও রাতে দরজা খুলে বসে থাকেন তুমি আসবে বলে। গত চব্বিশ বছরে একবারের জন্যও মাকে বিশ্বাস করানো যায়নি- তুমি ভেসে গেছো। মা প্রায়ই বলে, তুমি যে দিনটায় বরিশালের উদ্দেশে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলে, সেদিন আমি তোমাকে এগিয়ে দিয়ে এসেছিলাম কিছু দূর। আমার কপালে চুমু খেয়ে সেই যে গেছো- চব্বিশটা বছর গত হলো। একবার আসো না! হলো তো! কী এত অভিমান তোমার ভেতরে? মায়ের বিশ্বাসটাই সত্য হোক। ঈশ্বরকে বলেছি, ক'টা দিনের জন্য তোমাকে ধার আনবো। ঈশ্বর নিশ্চয়ই আমাকে নিরাশ করবে না। তা না হলে এই চিঠিটা অবশ্যই তুমি পাবে। চিঠি পেয়ে হাসছ নাকি কাঁদছ? আমার ছেলেরা যখন তাদের নানার কথা জানতে চায়, তখন নীরব থাকি। চোখের জল ওদের জবাব দেয়। চব্বিশ বছরের জমানো স্নেহ আমাকে এক সঙ্গে দেবে। কথা দাও, দেবে তো? তোমার সঙ্গে আমার সুখের কিংবা দুঃখের কোনো স্মৃতিই নেই। অন্তত একটা স্মৃতি তৈরি করার জন্য হলেও এসো। 

ছোট্ট বেলায় যখন দেখতাম কেউ বাবার কাঁধে চড়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে, তখন খুব মন খারাপ হতো। মনে হতো আমিও যদি ...। সবার বাবা যখন বাজার থেকে বাড়ি ফিরত, সন্তানরা দৌড়ে বাবার কাছে যেত আর মজা হাতে তুলে দিত। কিন্তু আমার কপালটা পোড়া। চেয়ে চেয়ে দেখা ছাড়া আর কিছুই করার ছিল না। মা মিথ্যা আশা দিয়ে রাখত। বলত, তোর বাবাও মজা নিয়ে আসবে। চব্বিশ বছরে একবারও তো এলে না? এবার আসো। তোমার শরীরের নাকি অদ্ভুত একটা গন্ধ আছে- মা বলে। আমি শুঁকতে চাই সেই গন্ধ, প্রাণভরে তোমার গায়ের ঘ্রাণ নেব। হে ঈশ্বর, তুমি আমার বাবাকে ধার দাও। তা না হলে এই চিঠি বাবার কাছে পৌঁছে দাও।

শ্রীপুর, গাজীপুর