আপনার সঙ্গে আর একবার দেখা করতে চাই

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০১৯      

আহমদ মেহেদী

প্রিয় মতিন স্যার,

আশা করি ভালো আছেন। বর্ষার পানি দেখে আপনার কথা মনে পড়ে গেল। এই তো সেদিনের কথা, ১৯৯৮ সালে তখন আমি ক্লাস ফোরে পড়ি। আপনি যে বাড়িতে লজিং থাকতেন সে বাড়ি থেকে নৌকায় করে স্কুলে যাওয়ার সময় আমাকেও সঙ্গে করে নিয়ে যেতেন। আপনার বেতের বাড়ি খেয়ে আর স্কুল কামাই করিনি কোনোদিন। একজন পরিপাটি মানুষ হিসেবে আমার জীবনের আদর্শ ছিলেন আপনি। তখন আমাদের স্কুলে আমরা দু'জন মাত্র বৃত্তি দিয়েছিলাম। স্কুলের অফিস রুমে আপনি আমাকে পরম যত্নে পড়াতেন। আমি বৃত্তিও পেয়েছিলাম। বৃত্তি পাওয়ার খবর শুনে মিষ্টি কিনে আমাদের বাড়ি হাজির হয়েছিলেন। তারপর নানাবাড়ি চলে গেলাম। বাবার দোকান পুড়ে গেল। কে জানত; স্যার এভাবে আমার স্বপ্নগুলোও পুড়তে শুরু করবে! এসএসসি ভালোভাবে পাস দিতে পারলেও স্থানীয় এক নেতা জোর করে আমাদের স্কুলের সবাইকে তার কলেজে ভর্তি করিয়ে নেন। বাবার আর্থিক অবস্থার কথা চিন্তা করে ওই কলেজেই ভর্তি হই। আমরা যারা সায়েন্সে ছিলাম, মেহরাব বাদে সবাই ফেল করি। আপনি অবাক হচ্ছেন আপনার প্রিয় ছাত্রটি এই প্রথম কোনো পরীক্ষায় ফেল করল। আপনি তো আমার বাবার সম্পর্কে জানেন স্যার, আমার বাবার জীবন হচ্ছে উইদআউট সুদ। তাই দোকান পুড়ে যাওয়ার পর আর সোজা হতে পারেননি তিনি। তবুও বাবার এই আদর্শে আমি নিজেকে নিয়ে গর্ব করি স্যার। তারপর বিদেশ গিয়ে বাবার দুঃখ ঘুচাতে চাইতে গিয়ে আরও দুঃখ বাড়িয়ে দিলাম তার। বিদেশ আর যাওয়া হয়নি। আবার পরীক্ষা দিলাম। এবার রেজাল্ট পজিটিভ। ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে বিএ পাস করলাম। বন্ধু সাঈদের কারণে এনজিওতে চাকরি পেলাম। এই চাকরিতে এসে চুলগুলো পাকতে শুরু করছে। তারপর বিয়ে, সংসার ও টানাপড়েন তো আছেই। আমার প্রথম সন্তান হাসপাতালেই মারা গেল। সেদিন খুব কষ্ট পেয়েছিলাম স্যার আমি। কার কাছে নালিশ করব? কার কাছে বিচার চাইব? সেদিনও কানে আপনার পাঠ করানো শপথবাক্য শুনতে পাই- 'আমি শপথ করিতেছি যে... বাংলাদেশের সেবায় নিজেকে সবসময় নিয়োজিত রাখিব।' সে শপথের মর্মের ছিটেফোঁটা আজ কোথাও দেখি না স্যার। এক সময় আমি মাস্তান হতে চেয়েছিলাম।

আপনাকে একবিন্দু মিথ্যা বলিনি। সমাজের অবস্থা দেখলে আমারও ডিআইজি হতে ইচ্ছা করে। আশি লাখ টাকার আট ভাগের এক ভাগ আমার হলে চলবে। স্যার, ডেঙ্গুর ভয়ে আছি। আপনিও সাবধানে থাকবেন। এই জীবনে আরও একবার আপনার সঙ্গে দেখা করতে চাই স্যার। কেন জানি মনের অজান্তে চোখ বেয়ে পানি আসছে স্যার। আপনার সেই ভালো ছাত্রটিকে আমি আজও খুব মিস করি। বইগুলো কাঁধে নিয়ে টিটু, তাহমিনার সঙ্গে স্কুলে যাচ্ছে- সে দৃশ্যের ছবি আজও আঁকি কখনও সকালের আকাশে, ভরদুপুর-আকাশে কখনও বা স্নিগ্ধ বিকেলের আকাশে।

দেবীদ্বার, কুমিল্লা

পরবর্তী খবর পড়ুন : অজানা চিঠি

অন্যান্য