আনন্দ বেদনার শ্নোক

প্রকাশ: ০৩ আগস্ট ২০১৯      

জোবায়ের রাজু

প্রিয় খোরশেদ স্যার,

ছোটবেলায় আপনি যখন রোজ বিকেলে কালো ছাতা মাথায় দিয়ে আমাকে প্রাইভেট পড়াতে আসতেন, অনেকক্ষণ আগ থেকে আমি জানালার পাশে দাঁড়িয়ে চেয়ে থাকতাম। শৈশবের ওই বয়সে সাধারণত ছাত্ররা শিক্ষকের ভয়ে সারাক্ষণ তটস্থ হয়ে থাকে, কিন্তু আপনাকে আমার বড্ড ভালো লাগত। সুন্দর করে আমাকে অঙ্ক বুঝিয়ে দেওয়া, ইংরেজি শব্দার্থ শেখানো, হাতের লেখা কীভাবে সুন্দর করতে হয়, তা জানানো- আপনার এসব গুণ আমাকে মুগ্ধ করত।

আম্মার কাছে শুনেছি, আপনি আমাদের পাশের মহল্লার মানুষ। আম্মা যখন কোনো কোনো বিকেলে আপনার জন্য নাশতা পাঠাতেন, সেখান থেকে ভাগ করে কিছু নাশতা জোর করে আমাকে খাইয়ে দিতেন। আমি না খেতে চাইলে হো হো করে হেসে বলতেন, 'খাও খাও, আমার দুই ছেলে রনি আর জাবেদকেও জোর করে খাওয়াতে হয়। হা-হা-হা।'

শারীরিক অসুস্থতার জন্য একসময়ে আপনি টিউশনি থেকে অব্যাহতি নিলেন। ততদিনে ক্লাসের পর ক্লাস অতিক্রম করে আমি চলে গেলাম হাইস্কুলে। স্কুলে আসতে যেতে প্রায়ই আপনার সঙ্গে আমার দেখা হতো। জানতে চাইতেন আমার পরিবারের কথা, পরীক্ষায় কেমন রেজাল্ট আসে। খুব স্নেহ মাখানো কণ্ঠে এসব জানতে চাইতেন।

জানেন স্যার, আমি এখন অনার্সে পড়ি। জীবনে অনেক শিক্ষকের সান্নিধ্য পেয়েছি, কিন্তু আপনার সঙ্গে কারও তুলনা হয় না। আপনার দুই ছেলে রনি আর জাবেদের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়েছে অনেক আগেই। ফেসবুকেও ওদেরকে দেখি। হাটে ঘাটে ওদের সঙ্গে দেখা হলে আপনার কথা জিজ্ঞেস করি। ওরা কেমন জানি প্রসঙ্গ পাল্টানোর পথ খোঁজে। একদিন হাবীব নামে আপনার এলাকার এক ছেলের কাছে শুনেছি আপনি নাকি সংসারে ভালো নেই। আপনার ছেলেরা চাকরিজীবী হয়ে এখন আর আপনার খবর রাখে না। দুটোই বউ নিয়ে আলাদা হয়েছে। আপনার প্রতি যথেষ্ট মূল্যায়নের অভাব ওদের। অর্থের অভাবে ওষুধও কিনে খেতে পারেন না। কিন্তু এমন হলো কেন! ছেলেদের কীভাবে আদর- যত্নে বড় করেছেন, সেটা তো আমি জানি। আজ ওরা আপনার দায়িত্ব পালনে এত অকৃতজ্ঞ কেন! ফেসবুকে তো দেখি ওরা মহাপুরুষের মতো নিজেদের সবার সামনে তুলে ধরে।

স্যার, সেদিন দেখলাম আপনি লাঠিতে ভর করে রাস্তা পার হচ্ছেন। পায়ের তলার ক্ষয়ে যাওয়া স্যান্ডেল আর মুখের সাদা দাড়িতে আপনাকে এত অসহায় লাগছিল যে আমার বুকটা হু হু করে উঠল। আপনার ভেঙে যাওয়া শরীরটা কংকালসার। দেখে মনে হলো, রনি আর জাবেদ আপনাকে দু'বেলা ভাত দেওয়ার দায়িত্বেও হেলাফেলা করে। এটা ভাবতে গিয়ে আমার মনটা ভেঙে গেল। বাড়িতে এসে বাবাকে খুলে বললাম সব। বাবা বললেন, 'যা, উনাকে নিয়ে আয়। আমাদের সঙ্গে থাকবেন।' আমি এক পৃথিবী আনন্দ নিয়ে আপনাকে আমাদের পরিবারের একজন বানাতে ছুটলাম আপনাদের বাড়ি। গিয়ে দেখি ঘরের দুয়ারের সামনে রনি আর জাবেদ আপনার পা জড়িয়ে ধরে ব্যাকুল হয়ে কেঁদে কেঁদে আপনার কাছে ক্ষমা চাইছে। আপনি ওদের ক্ষমা করে দিয়ে বুকে তুলে নিলেন। উঠানের পাশের মোটা কাঠ গাছটির আড়ালে দাঁড়িয়ে দূর থেকে এই দৃশ্য দেখে আমার মন খুশিতে নেচে উঠল। আপনি রনি আর জাবেদকে ঘরে নিয়ে গেলেন। নীড়ের পাখি দুটো আবার নীড়ে ফিরেছে। ঘরই হলো মানুষের বড় শান্তির জায়গা। রাতে ফেসবুকে ঢুকে দেখি জাবেদ আপনার অনেক ছবি ফেসবুকে ছেড়ে ক্যাপশনে লিখেছে, 'আমার বাবা আমার স্বর্গ।' ছবিতে আপনাকে বেশ স্নিগ্ধ দেখাচ্ছিল। আপনি হেসে আছেন। আপনার হাসিতে যেন পৃথিবীর সব বাবা হাসছে। ছেলেরা ফিরে এসেছে, এ জন্য মনে হয় এত আকুল হয়ে হাসছেন। স্যার, আবার যখন আপনার সঙ্গে চলতি পথে আমার হঠাৎ দেখা হয়ে যাবে কোনো এক নিরিবিলি প্রহরে, সেদিন আমি আপনার সঙ্গে একটা ছবি তুলব।

আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

অন্যান্য