যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড কলেজ স্কলারশিপ পেয়েছে সিয়াম হোসেন শিমুল

বস্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রে

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০১৯      

রায়েরবাজার বস্তির ছোট্ট ছেলে সিয়াম হোসেন শিমুল। ১২ বছর পড়েই বদলে গেছে তার জীবন। পেয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতামূলক ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড কলেজে পড়ার সুযোগ। পরিপূর্ণ স্কলারশিপ নিয়েই এই কলেজে পড়তে যাচ্ছে সিয়াম। ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড কলেজ ১৫৫টি দেশ থেকে যাচাই-বাছাই করে এই স্কলারশিপ দিয়ে থাকে। বাংলাদেশ থেকে ১৩৭ জনকে প্রাথমিক বাছাইয়ের পর ৩০ শিক্ষার্থীকে এই কলেজে পড়ার আমন্ত্রণ জানানো হয়। সেই ৩০ জনের মধ্যে দু'জন পেয়েছে পরিপূর্ণ স্কলারশিপ। তাদেরই একজন শিমুল। চলতি মাসেই শুরু হচ্ছে তার ক্লাস। স্কলারশিপ দৌড়ের নানা অভিজ্ঞতার পাশাপাশি শিমুল তার বস্তিজীবনের অজানা অনেক কথা শোনাল আলোর পথযাত্রীকে। শুনেছেন আশিক মুস্তাফা

শিমুল পেঁজা তুলোর মতো উড়ে বেড়াচ্ছে তার স্বপ্নের আকাশে। এমন ভেসে বেড়ানো যে তারই মানায়। তার আনন্দে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেন না বাবা বিল্লাল হোসেন। আষাঢ়ের ঢলের মতো পানিতে ভেসে যায় মুখ, ভেসে যায় জামা। এই জলে ভেসে চলুন, একটু পেছনে যাই-

২০০৭ সালের কথা। রায়েরবাজার বস্তি এলাকায় থাকতেন বিল্লাল হোসেন। স্ত্রী শিউলী বেগম রোজ তাড়া দিতেন বাজারের জন্য। নুন আনতে পান্তা ফুরানো অবস্থা পরিবারের। দিন আনে দিনে খায় অবস্থাও বলা যেতে পারে! এমন কষ্টের দিনে দুই ছেলেমেয়ে কেমন করে মানুষ করবেন, তা নিয়েও ভাবনায় ডুবে থাকতেন বিল্লাল হোসেন। শেষমেশ ঠিক করেছেন, ছেলেটার একটু মাথা তোলা হলেই কাজে দিয়ে দেবেন। কিন্তু সেই ভাবনা ভাবনাতেই থেকে গেল! একদিন পেলেন জাগো ফাউন্ডেশনের স্কুলের খোঁজ। শহরে কিছু তরুণ বস্তিতে গিয়ে তাদের বুঝিয়ে স্কুলে নিয়ে আসেন।

স্বপ্ন মানে লেগে থাকা

ছোট্ট শিমুলের স্কুল শুরু। এর আগে বাবাও ভাবেননি, ছেলেকে পড়াবেন। বিশ্ববিদ্যালয়পড়ূয়া তরুণরা বস্তির ছেলেমেয়েদের পড়ানোর পাশাপাশি খাবারও দেন। শুরুতে এই খাবারের লোভেও অনেক ছেলেমেয়ে আসতে থাকে। কিন্তু যে একবার এসেছে, সে-ই পড়ায় মুগ্ধ হয়ে থেকে গেছে এই আনন্দ স্কুলে। শুরু হলো নতুন বিপ্লব। বস্তিঘর থেকে পড়তে আসা ছেলেমেয়ে কিংবা তাদের মা-বাবারা তখনও স্বপ্ন দেখতে শেখেননি। ভাবেন, এমন তো কত প্রতিষ্ঠানই আসে! একদিন হারিয়েও যায়। তারাও যেন আড়ালে-আবডালে থেকে এই হারিয়ে যাওয়ার দিনক্ষণ গুনছেন! কিন্তু না, তরুণ এই পড়ূয়া ছেলেমেয়েরা তাদের ভিত শক্ত করেই আসন গাড়লেন।

বস্তির ছেলেমেয়েদের পড়ানোর দায়িত্বটা খুব মুনশিয়ানায় পালন করে যাচ্ছেন। মা-বাবারা তখন লেগে থাকাটাকেই স্বপ্ন ধরে নিয়েছেন।

প্রথম ব্যাচের প্রথম ছাত্র

জাগো ফাউন্ডেশনের রায়েরবাজার স্কুলের প্রথম ব্যাচের প্রথম ছাত্র শিমুল। সাদেক খান রোডের বস্তিতে বেড়ে ওঠা শিমুলের দিন কাটত নিবিড়, আরাফদের সঙ্গে। তবে অন্যদের মতো পাড়া বেড়ানো স্বভাব নেই বললেই চলে শিমুলের। কিছুটা আনমনা ছিল শিমুল। সেই আনমনা শিমুল স্কুলে যাওয়া শুরু করতেই বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে রাহাত, ফাতেমা, মুক্তা ও লিলিদের সঙ্গে। দিন কাটে তাদের সঙ্গে আড্ডা ও গল্পে। এভাবে মায়া আর ভালো লাগা গড়ে ওঠে স্কুলের সঙ্গে। ঘর আর ভালো লাগে না। ছুটির দিনেও স্কুলের গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়ে থাকে। দারোয়ান গেট খুলে দেয়। তারা দলবেঁধে স্কুলে খেলে, গল্প করে আবার বাসায় ফিরে যেত। সেই যে স্কুলের প্রতি মায়া তৈরি হয়, সেই মায়া কাটেনি আজও। তাই তো স্কুলদিনের কথা বলতে গিয়ে চোখ ভিজে ওঠে শিমুলের। পাশ থেকে সেই কান্নাটাকে আরও উস্কে দেন বাবা বিল্লাল হোসেন। মা শিউলী বেগমও কম যান না!


নাচ, গান আর ডিবেটিং ক্লাব...

পিএসসি পরীক্ষার পর শিমুল যুক্ত হয় ডিবেটিং ক্লাবের সঙ্গে। এই ক্লাব থেকে পায় আত্মবিশ্বাসের নতুন মন্ত্র। যে কারও সামনে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে কথা বলতে শিখে যায় শিমুল! তবে সেটা অবশ্যই ইতিবাচক দিক থেকে। আস্তে আস্তে যোগ দেয় নৃত্যদলেও। একক নৃত্যে তাক লাগিয়ে দেয় শিক্ষক-অভিভাবক ও ছাত্রছাত্রীদের। ডিবেট করে পেয়েছে অনেক অ্যাওয়ার্ড। যুক্ত হয় অন্যান্য কালচারাল ক্লাবের সঙ্গেও। তবে ক্লাসের রেজাল্টও তার ঈর্ষণীয়।

লিডারশিপ মন্ত্রণা

জাগো স্কুল বিভিন্নজনের অর্থায়নে চলে। তাই বিভিন্ন সময় দেশি-বিদেশি অনেকেই আসে স্কুল পরিদর্শনে। জাপান, জার্মানি, সুইডেনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আসা ভিজিটরদের সঙ্গে সখ্যও গড়ে ওঠে শিমুলের। দেশি সফল তরুণরাও এসে শোনাতেন তাদের সফলতার গল্প। এই গল্পগুলো আর মানুষের সঙ্গে মেশা এবং তাদের অভিজ্ঞতা শিমুলের সফলতার বড় হাতিয়ার বলে মনে করে সে। জাগো ফাউন্ডেশনসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নানা আয়োজনে ভলান্টিয়ার হিসেবেও কাজ করেছে শিমুল। আর সমাজের অবহেলিত মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ তো তার জন্ম থেকেই। রেজাল্টের পাশাপাশি এসব কাজ তার স্কলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করে শিমুল।

স্কলারশিপের লাইনে এগিয়ে

বিদেশি কলেজে আবেদনের জন্য প্রয়োজন রাজ্যের যোগ্যতা। শুধু রেজাল্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়, শিক্ষক ও কাউন্সিলরও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সঙ্গে রাখতে হয় ভালো সম্পর্ক। এই সম্পর্ক গড়ে ওঠে ভালো কাজের মাধ্যমেই। অনেকে মনে করে, অন্যান্য কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেই চলে। আসলে তা নয়। প্রতিযোগী কোন বিষয়ে পড়তে চায়, সে বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞতা এখানে বেশি গুরুত্ব পায়। এ ছাড়া প্রতিযোগীর ইনিশিয়েটিভও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ঠিকঠাক থাকলেই স্কলারশিপের লাইনে এগিয়ে থাকা যায়। আর এর সবই ভালো ছিল শিমুলের।

ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড কলেজের ডাক

এক বছর আগেও জানত না শিমুল বিদেশে পড়তে যাচ্ছে! বিদেশের সেরা কলেজে স্কলারশিপ তো পরের কথা। তাকে এই স্বপ্ন দেখায় জাগো ফাউন্ডেশন। এ ক্ষেত্রে বড় অনুপ্রেরণা পায় জাগো ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা করভী রাসকান্দের কাছ থেকে। শুরুর দিকে তিনিও পড়াতেন শিমুলদের। এ ছাড়া শিক্ষকদের অনুপ্রেরণা তো আছেই। প্রতিষ্ঠান থেকেই আবেদন করা হয় বিভিন্ন কলেজে। জাগো ফাউন্ডেশন থেকে একমাত্র শিমুলই পেয়ে যায় স্কলারশিপ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতামূলক মেধাবৃত্তিগুলোর অন্যতম। এই স্কলারশিপ পাওয়া মানে ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড কলেজে পড়ার সুযোগ পাওয়া। ইউনাইটেড ওয়ার্ল্ড কলেজের ক্যাম্পাস বিশ্বের ১৭টি দেশে থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র ক্যাম্পাসে বাংলাদেশ থেকে সুযোগ পেয়েছে শিমুলসহ আরেকজন।

দেশের সম্ভাবনার শেষ নেই!

কলেজ শেষ করে হার্ভার্ডে পড়তে চায় শিমুল। তবে পড়াশোনা শেষে ফিরে আসতে চায় দেশে। একসময় ভালো ডাক্তার হওয়ার স্বপ্ন দেখলেও সেই স্বপ্ন বদলে গেছে এখন! শিমুল কমিউনিকেশন সেক্টরে ভালো কাজ করতে চায়। আর তার মতো বস্তিেেত বেড়ে ওঠা মানুষের জন্য কাজ করার স্বপ্ন তার দু'চোখে। এমন তরুণদের নিয়েই তো আমরা স্বপ্ন দেখি!

অন্যান্য