যুক্তরাজ্যের সেরা শিক্ষক আমাদের আবেদ

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ২১ জুলাই ২০১৯     আপডেট: ২০ জুলাই ২০১৯      
যুক্তরাজ্যের সেরা শিক্ষক আমাদের আবেদ

আবেদ আহমেদ- ছবি :টুইটার

যুক্তরাজ্যের সেরা শিক্ষক নির্বাচিত হয়েছেন ব্রিটিশ বাংলাদেশি  আবেদ আহমেদ। ব্রিটেনের ন্যাশনাল এডুকেশন ইউনিয়ন নতুন শিক্ষক ক্যাটাগরিতে বর্ষসেরার পুরস্কারে ভূষিত করে তাকে। স্বাভাবিক কথা বলতে সমস্যা হয় আবেদের। তবু সেই সমস্যাকে সাহস বানিয়ে আর অদম্য আগ্রহ বুকে চেপে অক্লান্ত পরিশ্রমে নিজেকে সেরা শিক্ষক হিসেবে গড়ে তুলেছেন তিনি। আবেদ আহমেদের গ্রামের বাড়ি সিলেট। তরুণ এই বাংলাদেশি তার শিক্ষকতা আর মানবিক উদ্যোগের কথা শুনিয়েছেন আলোর পথযাত্রীকে। শুনেছেন মুনতাসির রশিদ খান। চলুন, শুনি-

শিশুদের নানা শারীরিক প্রতিবন্ধকতার মধ্যে একটি তোতলামি বা কথা বলতে গিয়ে আটকে যাওয়া। সময়ের সঙ্গে আর চিকিৎসার ফলে ঠিক হয়েও যায় অনেক সময়। কিন্তু তোতলামির কারণে বাচ্চাদের স্বাভাবিক বিকাশ ব্যাহত হয়। তোতলামির কারণে হাসি-ঠাট্টার শিকার হতে পারে বলে নিজেরা সামাজিকতা এড়িয়ে চলে। এমন শারীরিক প্রতিবন্ধকতা নিয়ে জন্ম নিয়েছেন আবেদও। তবু নিজের প্রচণ্ড ইচ্ছাশক্তি আর মানবিকতার কারণে যুক্তরাজ্যের সেরা শিক্ষকের সম্মাননা জিতে নিয়েছেন বাংলাদেশি এই তরুণ। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করে পরের প্রজন্মের শিশুদের মধ্যে আশার আলো ছড়াচ্ছেন এখন তিনি।

শারীরিক সক্ষমতা সাফল্যের শেষ কথা নয়

শৈশবে বাচ্চাদের সহনক্ষমতা স্বভাবতই কম থাকে। যদি এর ওপর থাকে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তবে স্কুল-কলেজে মানিয়ে নিতে বেশ সমস্যা হয়। আর এমন বাচ্চাদের অভিভাবকদের চিন্তারও অন্ত থাকে না সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে। কিন্তু সঠিক কাউন্সিলিং আর সাহস জোগানোর মতো কেউ পাশে থাকলে এই বাচ্চারাও পারে সুস্থ স্বাভাবিক আনন্দময় শৈশবের স্মৃতি নিয়ে বড় হতে। এই সময়টাতে সুশিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে শেখা দরকার বাচ্চাদের। সেই সুশিক্ষা কারিগর আবেদ। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে তিনি বাচ্চাদের শিক্ষা দিচ্ছেন শারীরিক সক্ষমতাই সাফল্যের শেষ কথা নয়। যাদের শারীরিক অক্ষমতা রয়েছে তাদের জন্য, তোতলা শিশুদের জন্য একটা সাপোর্ট গ্রুপ গড়ে তুলেছেন। তার শিক্ষকতা আর মানবিক উদ্যোগের জন্য যুক্তরাজ্যের টিইএস-টাইমস এডুকেশন সাপ্লিমেন্ট অ্যাওয়ার্ডে ভূষিত হওয়ার পাশাপাশি ব্রিটেনের ন্যাশনাল এডুকেশন ইউনিয়নের আয়োজনে তিনি নতুন শিক্ষক ক্যাটাগরিতে বর্ষসেরার পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর আগেও দেশসেরা শিক্ষকের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন তিনি।

স্বপ্নের শুরু

মাত্র চার বছর বয়স থেকেই নিজের তোতলামির শুরু। স্কুল-কলেজে এই তোতলামির জন্য সহজেই খেপানোর পাত্রে পরিণত হতেন তিনি। সে সময়টায় পাশে পাননি তেমন কাউকে। তাই সেই ছোটবেলায় সিদ্ধান্ত নিয়ে নেন যে, বড় হয়ে পরবর্তী প্রজন্মের মন খারাপ আর অপ্রাপ্তি ঘোচাবেন। স্বপ্ন দেখেন, শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে নেবেন, ছাত্রদের শেখাবেন শিক্ষার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ। সেই চেষ্টায় অবশ্য এখন থেকে তিন-চার বছর আগেই সফল ২৪ বছর বয়সী আবেদ আহমেদ।

যেই স্কুলের ছাত্র সেই স্কুলের শিক্ষক

লন্ডনের নিউম্যান ইউনিভার্সিটি থেকে ক্রীড়ায় স্নাতক ডিগ্রি নিয়ে বার্মিংহাম ইউনিভার্সিটিতে টিচার্স ট্রেনিংয়ে পাস করে তিনি এখন বার্মিংহামে বাঙালি অধ্যুষিত লজেলস এলাকার ওয়াসউড হেলথ একাডেমিতে গণিতের শিক্ষক হিসেবে কাজ শুরু করেন। মজার ব্যাপার হচ্ছে, এই স্কুলেরই ছাত্র ছিলেন আবেদ। তোতলা হওয়ার কারণে এই স্কুলে নিজের বেশ বাজে অভিজ্ঞতাও আছে তার। তবে সেই বাজে অভিজ্ঞতাকে এখন ইতিবাচকভাবেই নেন তিনি। তার মতে, বাচ্চারা অনেক সময় না বুঝেই তাদের সহপাঠী বা বন্ধুদের মনে আঘাত দিয়ে ফেলে। তাই তাদের দরকার যথাযথ সচেতনতার। আর সেই সচেতনতার কাজটিই করে যাচ্ছেন তিনি।

বিবিসির ডকুমেন্টারি

২০১৮ সালে তাকে নিয়ে বিবিসি থ্রি একটি ছোট ডকুমেন্টারি করে। সেই ডকুমেন্টারি বিবিসি তাদের সিরিজ 'অ্যামেজিং হিউম্যান'-এর একটি পর্ব হিসেবে মুক্তি দেয়। যাতে সেখানে দেখানো হয় কীভাবে আবেদ বাচ্চাদের আগ্রহ নিয়ে শেখান। তিনি তার ছাত্রদের সবসময় বলেন, তোতলা হওয়া কোনো হীনম্মন্যতা নয়। বরং এখান থেকে শক্তি সঞ্চার করতে হবে মনে। আর সেই শক্তি নিয়েই এগিয়ে যেতে হবে। তিনি বাচ্চাদের বলেন, যত কষ্টই হোক, নিজের কথা বলতে হবে। ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যামার ডে বা বিশ্ব তোতলা দিবস উপলক্ষে বানানো সেই ভিডিও দারুণভাবে প্রশংসিত হয়। তার কাজ নিয়ে আগ্রহ দেখাতে থাকেন যুক্তরাজ্যের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িতরা। সেখান থেকেই পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হন আবেদ আহমেদ।

অনেকেই উত্ত্যক্ত করত তখন!

আবেদ বারবার নিজের ছোটবেলা আর আশপাশের ছোটদের দেখে ভাবেন। ভাবতে ভাবতে বলেন, 'এমন অনেক সময় এসেছে যখন জানা থাকা সত্ত্বেও আমি ক্লাসে হাত তুলিনি বা আলোচনায় অংশ নেইনি। আমি ভয় পেতাম যে, আমার তোতলামি নিয়ে সহপাঠীরা মজা করবে। অবশ্য অনেকে আসলেই আমাকে উত্ত্যক্ত করত সে সময়টায়।

সচেতনতার অভাব

আবেদ আহমেদ মনে করেন, ছোটবেলায় স্কুল বা পরিবার থেকে যথাযথ সাহায্য না পাওয়ার একটা বড় কারণ আসলে সচেতনতার অভাব। ১৯ বছরে আবেদ যখন প্রথম চিকিৎসা আর স্পিচ থেরাপি নিতে শুরু করেন তখন বুঝতে পারেন আসলে তোতলামিকে কমিয়ে আনা আর এর সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াটা সম্ভব। তাই তার সাপোর্ট গ্রুপের একটা প্রধান উদ্দেশ্য হলো তোতলাদের বা শারীরিক প্রতিবন্ধীদের মধ্যে প্রথমেই আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে তোলা এবং তাদের সহপাঠীদের এটা বোঝানো উচিত যে, তাদের মানসিক সাহায্য পারে শারীরিক অক্ষমতাকে কাটিয়ে ওঠার জন্য।

আমাদের দেশেও এমন উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। আসলে প্রতিবন্ধীদের প্রতি বিশেষ যত্নের প্রয়োজন রয়েছে। আর সেই প্রয়োজন মেটাতে শিক্ষকদেরই আবেদ আহমেদের দৃষ্টান্ত অনুসরণ করতে হবে। আবেদ আহমেদের মতো একজন শিক্ষক পারেন অনেক শিক্ষার্থীর জীবনকে আলো আর আনন্দের পথে নিয়ে আসতে।

পরবর্তী খবর পড়ুন : শিক্ষা সংবাদ

অন্যান্য