আলোর পথযাত্রী

আলোর পথযাত্রী


জেফারসন স্কলারশিপ পাওয়া শাফকাত

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০১৯     আপডেট: ০৭ জুলাই ২০১৯      
জেফারসন স্কলারশিপ পাওয়া শাফকাত

শাফকাত ওয়াহিদ প্রিতম - ছবি : রাজিব পাল

স্কলাস্টিকা স্কুলের শাফকাত ওয়াহিদ প্রিতম লাভ করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতামূলক মেধাবৃত্তি জেফারসন স্কলারশিপ। এতে তিনি ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পাচ্ছেন। ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার জেফারসন স্কলার্স ফাউন্ডেশন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাছাই করে ৩৮ জনকে এ বৃত্তির জন্য মনোনীত করে। আগামী ২৬ আগস্ট শুরু হচ্ছে তার ক্লাস। স্কলারশিপ দৌড়ের নানা অভিজ্ঞতার পাশাপাশি শাফকাত নিজের অজানা অনেক কথা শোনালেন আলোর পথযাত্রীকে। শুনেছেন আশিক মুস্তাফা

শাফকাতের অর্জনের কথা শোনার আগে ঘুরে আসি তার ছোটবেলার দিনগুলো থেকে। ছোট্ট শাফকাতের রঙিন দিনগুলো কেটেছে মায়ের আঁচল ধরে! মা ন্যাওটা বলতে যা বোঝায় তেমনি ছিলেন তিনি। স্কুলশিক্ষক মাও জানতেন কেমন করে ছেলের মন ভালো রাখতে হয়। স্কুল-বাসা সামলে ছেলেকে নিয়ে বসতেন পড়ার টেবিলে। ঘরের এখানে-ওখানে। ঘরটাই যেন তার পাঠশালা। তবে দিনমান ঘ্যানর-ঘ্যানর নয়; ছেলেকে যেটা শেখাতেন তার শিকড় ধরে টান দিতেন। নিজে না বুঝলে অনলাইনের সাহায্যও নিতেন। মুখস্থবিদ্যায় একেবারে রেড অ্যালার্ট মায়ের! ছোট্ট শাফকাতও তাই তার প্রশ্নের ভাণ্ডার তুলে ধরতেন মায়ের কাছে। মা খেলাধুলা আর হাসি-গল্প করে সেসব প্রশ্নের উত্তর দিতেন। নিয়ে যেতেন ঘুরতে। সরকারি চাকুরে বাবাও আস্থা রাখতেন শাফকাতের মায়ের ওপর। গল্পের বই এনে দিতেন ছেলেকে। রাউলিং আর হ্যারি পটারে মুগ্ধ শাফকাত হুমায়ূন আহমেদ পড়েও ভাবনার রাজ্যে হারিয়ে যেতেন।

গোল্ডফিশ দিন!

বাবা একবার অ্যাকুয়ারিয়াম কিনে দিয়েছিলেন। সঙ্গে গোল্ডফিশও। সেই গোল্ডফিশের মায়া এখনও বুকে নিয়ে বেড়ান শাফকাত। পাড়ার কিংবা ক্লাসের বন্ধুরা স্কুলে ভর্তি হয়েই হোম টিউটরের সামনে বসত। শাফকাতের মন নেই তাতে। মা-ই যে তার হোম টিউটর! বাবা-মায়ের কাছ থেকে যে সোনালি দিন পেয়েছেন তাই তাকে তার স্বপ্নের ভবিষ্যতের দিকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে বলে মনে করেন শাফকাত।

ক্লাস শুরুর আগের ২০ মিনিট

মিরপুর স্কলাস্টিকায় চতুর্থ শ্রেণিতে ভর্তি হন শাফকাত। ২০১০ সালে। তার আগে বাবার চাকরি ধরে পড়েছেন মৌলভীবাজারে। স্কলাস্টিকার গেট ধরে ভেতরে ঢুকতেই একটা ভালো লাগা কাজ করে মনে। তার চেয়েও বেশি ভালো লাগে ক্লাস শুরুর আগের ২০ মিনিট। যে সময়টায় শিক্ষক ক্লাসে এসে সরাসরি ছাত্রছাত্রীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। পাঠ্যবইয়ের বাইরের বিষয় কিংবা ব্যক্তিগত প্রশ্নও করা যায় স্যারদের। শাফকাতও মনের কোণে জমে থাকা প্রশ্ন করতে থাকেন স্যারদের। মায়ের মতো এখানেও স্যাররা হেসে-খেলে উত্তর দেন। অন্যরকম একটা সম্পর্ক গড়ে ওঠে স্যারদের সঙ্গে।

ডিবেটিং ক্লাব দিয়ে শুরু

চতুর্থ শ্রেণি শেষ না হতেই শাফকাত যুক্ত হন স্কলাস্টিকা ডিবেটিং ক্লাবের সঙ্গে। এই ক্লাব থেকে পান আত্মবিশ্বাসের নতুন মন্ত্র। যে কারও সামনে দাঁড়িয়ে বুক ফুলিয়ে কথা বলতে শিখে যান শাফকাত! তবে সেটা অবশ্যই ইতিবাচক দিক থেকে। পঞ্চম শ্রেণিতে উঠে যোগ দেন নাট্যদলে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'জুতা আবিস্কার'-এ অভিনয় করে তাক লাগিয়ে দেন শিক্ষক-অভিভাবক এবং ছাত্রছাত্রীদের। নাটক নিয়ে ঘুরে আসেন ভারত। বাইরের দেশের মঞ্চেও ঝড় তোলেন ছোট্ট শাফকাত! আর ডিবেট করতে যান মালয়েশিয়ায়। এরপর একে একে যুক্ত হতে থাকেন অন্যান্য কালচারাল ক্লাবের সঙ্গেও। তবে ক্লাসের রেজাল্টও তার ঈর্ষণীয়।

লিডারশিপ মন্ত্রণা

নবম শ্রেণিতে উঠে যোগ দেন স্কলাস্টিকা ইয়াং এন্টারপ্রিয়নার্স অ্যান্ড ইকোনমিস্ট ফোরামের প্রথম কম্পিটিশনে। হাইস্কুল লেভেলে এমন কম্পিটিশন হতে পারে তা ভাবনায়ও ছিল না শাফকাতের। এই সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তারা প্রথম বিজনেস সামিটও করেন। এক সময় স্কলাস্টিকা ইয়াং এন্টারপ্রিয়নার্স অ্যান্ড ইকোনমিস্ট ফোরামের প্রেসিডেন্ট হন শাফকাত। এই সংগঠনের সঙ্গে জড়ানোর মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে নিজের যোগ্যতার পাখায় পালক গোঁজা। এই সংগঠনের বাইরে কাছের বন্ধুদের নিয়ে গড়ে তোলেন স্কলাস্টিকা ম্যাগাজিন ক্লাব 'স্টালিয়ন'। কমিউনিটি সার্ভিস ক্লাব। এই কমিউনিটি সার্ভিস ক্লাবের হাত ধরে প্রথমে সমাজের অবহেলিত মানুষের সঙ্গে মেশার সুযোগ পান শাফকাত। আহছানিয়া মিশনের স্কুলে গিয়ে ক্লাবের সদস্যরা স্বেচ্ছাশ্রমে পড়াতে থাকেন আইসিটি ও ইংরেজি। এই ব্যতিক্রমী কাজ তার স্কলারশিপ পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে বলে মনে করেন শাফাকাত।

স্কলারশিপের লাইনে এগিয়ে

বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের জন্য প্রয়োজন রাজ্যের যোগ্যতা। শুধু রেজাল্ট গুরুত্বপূর্ণ নয়। শিক্ষক ও কাউন্সিলরও গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সঙ্গে রাখতে হয় ভালো সম্পর্ক। এই সম্পর্ক গড়ে ওঠে ভালো কাজের মাধ্যমেই। অনেকে মনে করে অন্যান্য কাজের অভিজ্ঞতা থাকলেই চলে। আসলে তা নয়। প্রতিযোগী কোন বিষয়ে পড়তে চায় সেই বিষয়ের সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞতা এখানে বেশি গুরুত্ব পায়। এ ছাড়া প্রতিযোগীর ইনিশিয়েটিভও গুরুত্বপূর্ণ। এসব ঠিকঠাক থাকলেই স্কলারশিপের লাইনে এগিয়ে থাকা যায়। আর এর সবই ভালো ছিল শাফকাতের।

ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক

দশম শ্রেণির গণ্ডি পেরুনোর আগেই বিদেশের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ নিয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখতে থাকেন শাফকাত। এই ক্ষেত্রে বড় অনুপ্রেরণা পান শিক্ষক তাহরিমা কামালের কাছ থেকে। স্যারদের অনুপ্রেরণা নিয়ে ও লেভেল এ লেভেল শেষ করে আবেদন করতে থাকেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে। পেয়ে যান জেফারসন স্কলারশিপ। এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিযোগিতামূলক মেধাবৃত্তিগুলোর অন্যতম। এই স্কলারশিপ পাওয়া মানে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ হাতের মুঠোয় আসা। ইউনিভার্সিটি অব ভার্জিনিয়ার জেফারসন স্কলার্স ফাউন্ডেশন বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বাছাই করে ৩৮ জনকে এ বৃত্তির জন্য মনোনীত করে। এর জন্য প্রার্থীদের মুখোমুখি হতে হয় রাজ্যের প্রতিযোগিতার। নানান যাচাই-বাচাইয়ের পর এই স্কলারশিপ প্রদান করা হয়। প্রাথমিকভাবে এ স্কলারশিপের জন্য বিভিন্ন দেশ থেকে দুই হাজারেরও অধিক ছাত্রছাত্রী আবেদন করেন। তাদের মধ্য থেকে ১১৮ জনকে ভার্জিনিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চারদিনের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার জন্য আমন্ত্রণ জানায়। সেখানে ম্যাথ টেস্ট, অনলাইনে রচনা লেখা, সেমিনার ডিসকাশনের পর বসে চূড়ান্ত হয় ভাইভায়। সব শেষ করে দেশে ফেরার আগেই দুবাই এয়ারপোর্টে মেইল পান স্কলারশিপ অর্জনের। এ স্কলারশিপের ফলে শাফকাত চার বছরের জন্য ভার্জিনিয়ার ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনার পূর্ণ খরচ লাভের পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ সফর, ক্যারিয়ার নেটওয়ার্কে অংশগ্রহণ ছাড়াও ফাউন্ডেশনের নানা ধরনের আয়োজনে যোগ দেওয়ার সুযোগ পাবেন। আগামী ২৬ আগস্ট শুরু হবে তার ক্লাস। দেশ থেকে উড়াল দেবেন ১৫ আগস্ট।

দেশের সম্ভাবনার শেষ নেই!

পড়াশোনা শেষে দেশ নিয়ে কী করতে চান এমন প্রশ্নের উত্তরে শাফকাত বলেন, 'যুক্তরাষ্ট্রে কিছুদিন চাকরি করে অভিজ্ঞতা নিয়ে দেশে ফিরতে চাই। আমাদের দেশের সমস্যা অনেক; কিন্তু সম্ভাবনারও শেষ নেই। তাই দেশে ফিরে নিজের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে দেশের জন্য কিছু করতে চাই।'

ভাবি, এমন তরুণদের নিয়েই তো আমরা  স্বপ্ন দেখি!