দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কিত অধ্যায়ের অন্যতম ইন্দোনেশিয়ায় কমিউনিস্ট গণহত্যা। ১৯৬৫-৬৬ সালে কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্দোনেশিয়ার (পিকেআই) সঙ্গে যুক্ত পাঁচ লাখের বেশি (অনেক ইতিহাসবিদের মতে ৩০ লাখ) মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল। এই গণহত্যার নীলনকশা বাস্তবায়নে গোপন মদদ দিয়েছিল ব্রিটেন। ব্রিটিশ গোয়েন্দারা ইন্দোনেশিয়ার প্রভাবশালী এলিটদের এ কাজে উস্কানি দিতে প্রোপাগান্ডা চালিয়েছিল।

সম্প্রতি ব্রিটেনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত নথিপত্র বিশ্নেষণ করে ইন্দোনেশিয়ায় কমিউনিস্ট গণহত্যায় ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের এই কলঙ্কিত ভূমিকার কথা সামনে এসেছে। গতকাল রোববার এ নিয়ে বিশ্নেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে দ্য গার্ডিয়ান।

বিংশ শতাব্দীতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নতুন বিশ্ব বাস্তবতায় কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে পশ্চিমা দেশগুলোর গোপন অভিযানের মধ্যে ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের ইন্দোনেশিয়ায় চালানো প্রোপাগান্ডা এত দিন চাপাই ছিল। এখন দেখা যাচ্ছে, ওই গণহত্যায় ব্রিটেনই ছিল বড় খেলোয়াড়। ইন্দোনেশিয়ার বামপন্থিদের 'কমিউনিস্ট ক্যান্সার' হিসেবে ক্যাম্পেইন চালিয়ে তাদের নির্মূলে কঠোর থেকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে মমদ দিয়েছিল তারা। বিশেষ করে কমিউনিস্টবিরোধী আর্মি জেনারেলদের এই হত্যাকাণ্ডে উস্কে দিয়েছিল তারা।

ওই সময়ে কমিউনিস্ট নির্মূলে একের পর এক গণহত্যা চালানোর নীলনকশা করেছিল মূলত ইন্দোনেশিয়ার সামরিক বাহিনী। যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (সিআইএ) ১৯৬৫-৬৬ সালের ওই গণত্যাকে বিংশ শতাব্দীতে বিশ্বের অন্যতম বর্বর নরহত্যা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।

১৯৬৫ সালের অক্টোবরে ইন্দোনেশিয়ায় গণহত্যা শুরু হয়েছিল। তখন ব্রিটিশ কর্মকর্তারা দেশটির পিকেআই ও অন্য সব বামপন্থি দলকে নির্মূল করতে বলেছিল। ইন্দোনেশীয় জাতিকে সতর্ক করে ব্রিটেন বার্তা দিতে থাকে- কমিউনিস্ট নেতারা যতক্ষণ মুক্ত থাকবে এবং পদ-পদবিধারীদের বিচার না হবে, ততক্ষণ ইন্দোনেশিয়ার বিপদ কাটবে না।

ব্রিটেন কেন কমিউনিস্টদের গণহত্যায় মদদ দিয়েছিল, তাও বেরিয়ে এসেছে ব্রিটিশ ফরেন অফিসের নথিপত্রে। দ্য গার্ডিয়ানের বিশ্নেষণে বলা হয়েছে, ব্রিটেনের সাবেক উপনিবেশগুলোকে মালায়ান ফেডারেশনে যুক্ত করার যে চেষ্টা করছিল ব্রিটিশ প্রশাসন, তার ঘোর বিরোধী ছিলেন ইন্দোনেশিয়ার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সুকার্ন। এ নিয়ে ১৯৬৩ সাল থেকে প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্যে বিরোধ চলছিল এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সীমান্তে সামরিক অভিযান শুরু করেছিলেন সুকার্ন। এ ছাড়া সুকার্নের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ছিল বামপন্থিদের। মূলত সুকার্নের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে তাকে জনবিচ্ছিন্ন করতে এবং নিজেদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য অপ্রচার শুরু করেছিল ব্রিটিশ গোয়েন্দারা। এ কাজে চতুর প্রোপাগান্ডা বিশেষজ্ঞদের নিয়োগ দিয়েছিল ব্রিটেনের ফরেন অফিস। প্রোপাগান্ডা চালাতে মালয়েশিয়ানদের নিয়োগ দিয়ে কমিউনিস্টবিরোধী তথ্য দিয়েছিল ব্রিটেন। এসব তথ্য প্রচার করা হতো আর্মি জেনারেল ও এলিটদের উস্কানি দিতে, যাতে তারা নির্দি্বধায় কমিউনিস্টদের হত্যা করে।

মন্তব্য করুন