কাশ্মীরিদের 'গাজা'

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০১৯

সমকাল ডেস্ক

কাশ্মীরিদের 'গাজা'

কাশ্মীরের শ্রীনগরে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে সব দোকানপাট। কেড়ে নেওয়া হয়েছে চলাফেরার স্বাধীনতা। ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের এ সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে একটি দোকানের শার্টারে লেখা হয়েছে 'উই ওয়ান্ট ফ্রিডম'। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত ছবি - এএফপি

কাশ্মীরের প্রধান শহর শ্রীনগরের উপকণ্ঠে সৌরা নামে এলাকাটির অবস্থান। বেশ কয়েকজন তরুণ সৌরায় ঢোকার একমাত্র প্রবেশ পথে পাথরের স্তূপের পাশে আগুন জ্বালিয়ে প্রতিদিন পাহারা দেন। নিরাপত্তা বাহিনী যাতে সেখানে ঢুকতে না পারে তার জন্যই এ পাহারা। একটি মসজিদের মাইক থেকে স্বাধীনতার পক্ষে স্লোগান প্রচারিত হচ্ছে। সৌরার বাসিন্দারা তাদের এলাকাকে বলেন 'কাশ্মীরি গাজা'। ফিলিস্তিনের গাজা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আন্দোলনের অন্যতম স্থান।

৫ আগস্ট কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা বাতিলের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নেয় ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। আগে থেকেই কাশ্মীরে থাকা নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে যুক্ত হয় অতিরিক্ত বাহিনী। ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করা হয় জনগণের চলাফেরায়। শুরু হয় ধরপাকড়। তখন থেকেই নিরাপত্তা বাহিনীর প্রবেশ ঠেকাতে সৌরায় ঢোকার পথে টিন, গাছের গুঁড়ি, তেলের লরি, কংক্রিটের পিলার ইত্যাদি দিয়ে ব্যারিকেড দেয় স্থানীয় জনতা। গত দুই সপ্তাহে টানা বিক্ষোভও করেছে সেখানকার মানুষ। রাতে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা মুফেদ নামের এক তরুণ বলেন, 'শুধু আমাদের লাশের ওপর দিয়েই নিরাপত্তা বাহিনী সৌরায় প্রবেশ করতে পারবে। আমাদের এক ইঞ্চি ভূমিও ভারতকে দেব না। গাজার বাসিন্দারা যেমন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে, সে রকম আমরাও আমাদের মাতৃভূমির জন্য সমস্ত শক্তি দিয়ে লড়াই করব।' এদিকে তিন দশক ধরে ভারত থেকে স্বাধীন হতে কাশ্মীরে সশস্ত্র লড়াই চলছে। হাজার হাজার মানুষ এতে নিহত হয়েছে। আগে থেকেই সেখানে আনুমানিক ৫ লাখ ভারতীয় সেনা অবস্থান করছে। ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের পরিপ্রেক্ষিতে আরও কয়েক হাজার সেনা সেখানে পাঠানো হয়। তারপরও সৌরার বাসিন্দারা কেন্দ্রীয় সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিদিনই বিক্ষোভ করেছে। সবচেয়ে বড় বিক্ষোভটি হয় ৯ আগস্ট রাতে এবং তাতে প্রায় ১৫ হাজার মানুষ অংশ নেয়। নিরাপত্তা বাহিনী তাদের ওপর গুলি, টিয়ার গ্যাস ও ছররা গুলি ছোড়ে। ২৪ জন বিক্ষোভকারী এতে আহত হন। তিন তরুণকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

সৌরায় ২ হাজারের বেশি ঘরবাড়ি রয়েছে। এই উপশহরটি তিন দিক থেকে ঘিরে রেখেছে নিরাপত্তা বাহিনী। জেনাব সায়েব মসজিদটিই সৌরার বাসিন্দাদের প্রতিরোধের কেন্দ্রস্থল। প্রতি রাতেই জনতা সেখানে জড়ো হয়ে মশাল হাতে মিছিল করে। দেয়ালে দেয়ালে লেখা হয় 'কাশ্মীরের জন্য মুক্তি', 'ভারত ফিরে যাও' ইত্যাদি স্লোগান। শহরে প্রবেশ মুখের তরুণ পাহারাদাররা পুলিশ আসার লক্ষণ পেলেই বিক্ষোভকারীদের খবর দেয়। তবে ড্রোন, হেলিকপ্টার ইত্যাদি মোতায়েন করেও তিনবারের চেষ্টাতেও সৌরায় ঢুকতে ব্যর্থ হয়েছে নিরাপত্তা বাহিনী। বিক্ষোভকারীদের পাথর নিক্ষেপের ফলে তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। নাহিদা নামের একজন জানান, 'ভারত আমাদের পরীক্ষা নিচ্ছে, তবে নিশ্চিতভাবে তারা এতে ব্যর্থ হবে।' সৌরায়

এমন পরিস্থিতি বিরাজ করার পরও ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বরাবর বলে আসছে, কাশ্মীরের পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ রয়েছে।

সৌরাতেই জন্ম নিয়েছিলেন জম্মু-কাশ্মীরের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ আবদুল্লাহ। ন্যাশনাল কনফারেন্সের এই নেতা জম্মু-কাশ্মীরের পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনের শর্তে ভারতীয় ইউনিয়নে যোগ দিয়েছিলেন। শেখ আবদুল্লাহর ছেলে ফারুক আবদুল্লাহ ও নাতি ওমর আবদুল্লাহ জম্মু-কাশ্মীরের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। ৪ আগস্ট রাতে অন্য অনেক রাজনীতিকের সঙ্গে ফারুক ও ওমর আবদুল্লাহকেও গ্রেফতার করা হয়।

সৌরার বাসিন্দা রফিক মনসুর শাহ মনে করেন, 'আবদুল্লাহ পরিবারের ক্ষমতার লোভের

কারণেই আজ আমরা ভারতের দাসে পরিণত হয়েছি। আমরা ৭০ বছর আগের সেই ঐতিহাসিক ভুল এখন শুদ্ধ করতে চাই। এ জন্য বাকি কাশ্মীরিদের আমরা অনুপ্রাণিত করতে চাচ্ছি।' সূত্র :এএফপি।