তিন বছরে দুই কোটি টাকা লোপাটের অভিযোগ

প্রকাশ: ০৯ অক্টোবর ২০১৭

নাটোর ও লালপুর প্রতিনিধি

লালপুরে নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে নানা অনুষ্ঠান দেখিয়ে তিন বছরে সোয়া দুই কোটি ১৭ লাখ টাকা লোপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এমন অভিযোগ ওঠায় চাষিরা মিলে আখ সরবরাহে অনীহা দেখাচ্ছেন বলে জানা গেছে। তবে মিল কর্তৃপক্ষ এমন অভিযোগকে ভিত্তিহীন দাবি করেছে।
চাহিদা অনুযায়ী আখ সরবরাহ না পাওয়াসহ চিনি বিক্রি না হওয়ায় নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলকে চার বছরে ১৬৮ কোটি ৪১ লাখ টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে। এর মাঝে মাথা ভারী প্রশাসনসহ অনিয়মের মাধ্যমে চাষি সমাবেশ, মতবিনিময়, সংবাদ সম্মেলনসহ নানা অজুহাতে বিভিন্ন খরচ দেখিয়ে প্রতি মৌসুমে লাখ লাখ টাকা অপচয় করা হচ্ছে। আখচাষিসহ স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের অভিযোগ, গত তিন বছরে চাষি সমাবেশ ও উঠান বৈঠকের নামে ২ কোটি ১৭ লাখ টাকা লোপাট করা হয়েছে। এ নিয়ে আখচাষিদের মাঝে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। এবার মিলে আখ সরবরাহ করা নিয়ে চাষিদের মধ্যে দেখা দিয়েছে সংশয়।
অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্য আবুল কালাম আজাদ বলেন, অনুষ্ঠানের অজুহাতে চিনি শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যানসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ঘন ঘন মিলে আসে। গাড়িবহর নিয়ে আসা এসব কর্মকর্তার পেছনে লাখ লাখ টাকা ব্যয় দেখানো হয়। এসব অর্থ অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে দৈনন্দিন শ্রমিকের মজুরি দেখিয়ে উত্তোলন করা হচ্ছে।
আড়বাব ইউপি চেয়ারম্যান ইছাহাক আলী জানান, প্রতি মৌসুমে তিনি নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলে কয়েক হাজার টন আখ সরবরাহ করেন। অথচ আখচাষিদের মতবিনিময় সভায় তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয় না। এসব সভায় চিনি শিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যানসহ অন্য মিলের ব্যবস্থাপকরা গাড়ি বহর নিয়ে আসেন। তাদের ব্যয়ভার বহনের নামে দৈনন্দিন শ্রমিকের মজুরির নামে লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করে লুটপাট করা হচ্ছে। তিনি জানান, চিনিকলকে লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানোর উদ্দেশ্যে গত মৌসুমে এই মিল জোনের সব চাষিকে অবৈধ পাওয়ার ক্রাশারে আখ মাড়াই বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়। এত কিছুর পরও এই মৌসুমে চিনিকল কর্তৃপক্ষ মিলকে প্রায় ৫০ কোটি টাকা লোকসান দেখায়। এ ছাড়া চাষিরা আখ সরবরাহ করার পরও তাদের বকেয়া পরিশোধ করা হয় না।
গোপালপুর এলাকার কৃষক আরশাদ হোসেন সাদি জানান, গত মৌসুমে আবুল কালাম আজাদ এমপির কথামতো তারা সব আখ মিলে সরবরাহ করেন। কিন্তু আখের টাকা পাওয়া যায়নি। তাই আর মিলে আখ সরবরাহ করবেন বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
মিলের সদ্য অবসরে যাওয়া কর্মচারী মাজদার রহমান জানান, ৪০ বছর চাকরি শেষে অবসর গ্রহণের পরও তিনিসহ ১৪৭ শ্রমিক-কর্মচারী পাওনা টাকা পাচ্ছেন না। অথচ সভার নামে যে টাকা লোপাট করা হয়েছে। শ্রমিক ইস্ট্রাফিল, হরেন, রবিঠাকুর ও তুহিন আলী জানান, ১৬ থেকে ২০ বছর ধরে কাজ করলেও তাদের পারিশ্রমিক বাড়ানো হয়নি।
নর্থ বেঙ্গল সুগার মিলের ব্যবস্থাপক প্রকৌশলী মিজানুর রহমান জানান, আখ স্বল্পতার জন্য গত কয়েক মৌসুম ধরে মিলকে লোকসান গুনতে হচ্ছে। তবে একে লাভজনক করতে ইতিমধ্যে চাষিদের সঙ্গে উঠান বৈঠকসহ উদ্বুদ্ধকরণ সভা করা হয়েছে। চাষিদের পাওনাও পরিশোধ করা হচ্ছে। এ ছাড়া সুগার মিলে শিল্প পার্ক করার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হতে যাচ্ছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে মিল লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে উঠবে। মিলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করেই শ্রমিক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা দেওয়া যাবে।
তিনি জানান, অনুষ্ঠানের নামে অর্থ অপচয় বা লোপাটের অভিযোগ কল্পনাপ্রসূত এবং বানোয়াট। প্রতি বছর এক্সটেনশন কাজের জন্য বরাদ্দ অর্থের মধ্যে শুধু গত মৌসুমে খরচ হয়েছে ১০ লাখ টাকা। এর আগের বছর খরচ হয়েছে ১৫ লাখ টাকা। চলতি মৌসুমের এ পর্যন্ত ৮৬ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সুরক্ষার অংশ হিসেবে প্রতি মৌসুমে সাশ্রয় নীতিমালার আওতায় সাশ্রয়ী সেটআপ দিয়েই মিল চালানো হচ্ছে।