রফতানিতে এগোচ্ছে না চামড়া খাত

চলতি অর্থবছরে লক্ষ্যমাত্রা বিশেষ বাড়েনি , গত অর্থবছরে রফতানি কমেছে

প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০১৯     আপডেট: ১১ আগস্ট ২০১৯      

শেখ আবদুল্লাহ

বিশ্ববাজারের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগোতে পারছে না বাংলাদেশের চামড়া শিল্প। বিশ্বজুড়ে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা বাড়লেও এ খাতের রফতানিতে কয়েক বছর ধরে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি নেই। এমনকি ২০১৮-১৯ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি আগের অর্থবছরের তুলনায় ৬ শতাংশ কম হয়েছে। এ খাতের উদ্যোক্তারাও সাম্প্রতিক সময়ে খুব একটা আশাবাদী হতে পারছেন না। এমন পরিস্থিতিতে চলতি ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ খাত থেকে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা বিশেষ বাড়ায়নি সরকার। যদিও এ খাতের পণ্য দেশের প্রধান রফতানি  পণ্যের একটি।

চলতি অর্থবছরে সরকার চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রফতানি থেকে ১০৯ কোটি ডলার আয়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। গত বছরের আয়ের তুলনায় তা ৭ দশমিক ১৩ শতাংশ বেশি। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এ খাত থেকে ১০২ কেটি ডলার আয় হয়েছে। এ আয় আগের অর্থবছরের তুলনায় ৬ শতাংশ কম। নতুন অর্থবছরে এ খাত থেকে খুব বেশি আয় আসবে বলে আশাবাদী না হওয়ায় চামড়া ও চামড়াজাত পণ্যের রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ২০১৭-১৮ অর্থবছরের আগের অবস্থানে ফিরে গেছে।

দেশের চামড়া শিল্পের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে তুলে ধরতে গিয়ে বাংলাদেশ ফিনিশড লেদার, লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার এক্সপোর্টার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএলএলএফইএ) সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ মাহিন তার সাম্প্রতিক ইউরোপ সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সম্প্রতি তিনি ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশের ক্রেতাদের সঙ্গে চামড়া রফতানির বিষয়ে আলোচনা করে এসেছেন। তিনি সমকালকে বলেন, ইউরোপে চামড়ার বাজারের অবস্থা খারাপ। আমদানিকারক বড় ক্রেতাদের চাহিদা কমে যাওয়ায় অনেকটা হতাশা নিয়েই ফিরতে হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য যুদ্ধের কারণে চীনের বাজারও ভালো অবস্থায় নেই। তিনি আরও জানান, ট্যানারি স্থানান্তরসহ বিভিন্ন কারণে দেশে ব্যবসায়ীরাও অর্থ সংকটে রয়েছেন। তা ছাড়া গত বছরের ৬০ শতাংশ চামড়া এখনও অবিক্রীত রয়েছে। এসব বিবেচনায় চামড়া খাতে বড় ধরনের সংকট চলছে। এ থেকে উত্তরণে সরকারের আরও নীতি সহায়তাসহ সবার সমন্বিত চেষ্টা দরকার বলে তিনি উল্লেখ করেন।

বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত উল্লাহ সমকালকে বলেন, ট্যানারি স্থানান্তরের সময়ে দক্ষিণ কোরিয়া ও ইতালির বাজার হারানোয় এখন ক্রেতা কম। চীনকেন্দ্রিক রফতানিতেও সময় ভালো যাচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের প্রস্তুতিতে চাপে রয়েছেন এ খাত-সংশ্নিষ্ট সবাই। চামড়া সংগ্রহ নিয়ে দুঃশ্চিন্তায়  রয়েছেন তারা।

কয়েক বছর ধরে এ খাত থেকে আশানুরূপ রফতানি আয় না আসায় সরকার চামড়াজাত পণ্য রফতানি বাড়ানোর জন্য বেশ কিছু উদ্যোগও নিয়েছে। গত অর্থবছরে চামড়াজাত পণ্যকে অগ্রাধিকার দিয়ে 'প্রোডাক্ট অব দ্য ইয়ার' ঘোষণা করা হয়। নগদ সহায়তা ৫ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১০ শতাংশ করা হয়। সহজ করা হয়েছে ব্যাংক ঋণও। পরিবেশসম্মতভাবে চামড়া প্রক্রিয়াকরণের জন্য রাজধানী থেকে চামড়ার কারখানা সাভারে বিশেষায়িত শিল্প নগরীতে স্থানান্তর করা হয়। তবে এ শিল্প নগরী এখনও সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব না হওয়ায় ক্রেতাদের দিক থেকে চাপে রয়েছেন উদ্যোক্তারা। এটাই এখন দেশের চামড়া খাতের প্রধান সমস্যা বলে মনে করছেন এ খাতের সংশ্নিষ্টরা।

উদ্যোক্তারা বলছেন, বিশ্ববাজার বড় হচ্ছে এবং বাংলাদেশি পণ্যের চাহিদাও আছে। তবুও চামড়া প্রক্রিয়াকরণ পরিবেশসম্মত না হওয়ায় এ সুযোগ কাজে লাগানো যাচ্ছে না। তবে বেশ কিছু কাজ হচ্ছে। এগুলো শেষ হলে  বাংলাদেশ থেকে চামড়াজাত পণ্যের রফতানি বাড়বে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতভিত্তিক বাজার গবেষণা সংস্থা গ্রান্ড ভিউ রিসার্চের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ সালে বিশ্বে ৪১৪ বিলিয়ন ডলারের চামড়াপণ্যের বাজার ছিল। ২০১৮ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত এ বাজার ৫ দশমিক ১৪ শতাংশ হারে বাড়বে। ২০২৫  সালে চামড়াজাত পণ্যের বাজার হবে ৬২৯ বিলিয়ন ডলার।

মানুষের আয় ও জীবনযাপনে উন্নয়ন, ফ্যাশনে নতুনত্ব, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যটন বৃদ্ধির কারণে চামড়াজাত পণ্যের চাহিদা বাড়ছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। বিশেষ করে আরামদায়ক ও ট্রেন্ডি পাদুকার চাহিদা বাড়ছে সবচেয়ে বেশি। বাড়ছে নরম সোলের জুতার চাহিদাও।